মা, মাগো, আমারে ছেড়ে কোথায় গেলি’রে মা! আমারে তো তুই ছেড়ে চলে যেতে পারিস না মা। আমিও যে এখন একা হয়ে গেলাম রে মা! তুই আত্মহত্যা করতে পারিস না, তোরে খান টিপু সুলতান মেরে ফেলেছে। আমি যদি সব কথা বলে দেই, তাহলে তো টিপু আমারে বাঁচতে দেবে না রে মা, আমারে মেরে ফেলবে।
এভাবেই রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কেবিন ট্রলিতে পড়ে থাকা নিজের মেয়ের নিথর-স্তব্ধ লাশের পাশে দাড়িয়ে আহাজারি করছিলেন বাবা নুরুল ইসলাম।
বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতানের পুত্র হুমায়ুন সুলতানের স্ত্রী শামারুখ মেহজাবিনের (২৬) লাশ উদ্ধার করে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে স্বামী হুমায়ুন সুলতানের দেওয়া খবরে সেখানে গিয়ে মেহজাবিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
মেহজাবিনের মৃত্যুর ঘটনায় স্বামীপক্ষের লোকজনের দাবি, মেহজাবিন আত্মহত্যা করেছেন। তবে মেহজাবিনের গলায়, পিঠে ও হাতে মারধরের দাগ রয়েছে উল্লেখ করে নিহতের পরিবার দাবি করেছে, 'মেহজাবিন আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে হত্যা করা হয়েছে'।
মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে মেহজাবিনের বাবা পিডিপি’র সাবেক ইঞ্জিনিয়ার নুরুল ইসলাম যশোর সদরের বাসা থেকে বিমান ফ্লাইটে করে ছুটে আসেন। হাসপাতালে এসেই মেয়ের লাশ দেখতে চান তিনি। নিজের মেয়ের মৃত মুখ দেখে আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি করে তোলেন নুরুল ইসলাম।
তিনি যখন বলছিলেন খান টিপু সুলতান (মেয়ের শশুড়) মেয়েরে মেরে ফেলেছে। সব কথা বলে দিলে টিপু সুলতান বাঁচতে দেবে না তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন টিপু সুলতান। এ কথা শোনার পর তিনি চেচিয়ে উঠে বলেন, নুরুল ইসলাম আপনি কি উন্মাদ হয়ে গেলেন, আপনি একথা বলতে পারেন না। আপনার মেয়ের মৃত্যুর খবর দিয়ে আমিই তো আপনাকে ডেকে এনেছি।
তবে মেহজাবিন সত্যিই আত্মহত্যা করেছেন, না কী তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে কিছুই বলতে নারাজ ধানমন্ডি থানা পুলিশ। এমনকি লাশ উদ্ধারের পর প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত্যুর আলামত বা কী কারণ তাও জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিহতের পিতা নুরুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় বাদী হয়ে একটি হত্যা্ মামলা দায়ের করতে যান। কিন্তু দিবগাত রাত ১ টার খবর অনুযায়ী তখন পর্যন্ত মামলা গ্রহণ করেনি ধানমন্ডি থানা পুলিশ। এমনকি তখন পর্যন্ত লাশ ধানমন্ডি থানাতেই পড়েছিল।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ধানমন্ডি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু-বকর টাইমনিউজবিডিকে বলেন, 'নিহতের পিতা ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশ ময়না তদন্ত করতে চান। কিন্তু সেটা করার এখতিয়ার আমার নেই। তাই সব বিষয় বিবেচনা করে মামলা গ্রহণ ও ময়না তদন্তের জন্য লাশ ডিএমসি মর্গে পাঠাতে দেরি হচ্ছে।'
ধানমন্ডি থানা পুলিশ ও নিহতের আত্মীয়-স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে মেহজাবিনের লাশ ধানমন্ডি-৬-এর ১৪ নং ফ্লাটের ৪র্থ তলার বি-এর ১ নাম্বার বাসা থেকে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তবে নিহতের বিষয়টি পুলিশ সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে। মেহজাবিন আত্মহত্যা করে থাকলে বিষয়টি কেন দুই ঘণ্টা পর পুলিশকে জানানো হলো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মেহজাবিনের আত্মীয়-স্বজন।
ঘটনার দিন শেষ বিকেলে ধানমন্ডি থানার এসআই সাজ্জাদ জানান, আত্মহত্যার খবর পেয়ে পুলিশ সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে মেহজাবিনের লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনা হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা ময়না তদন্তের পূর্বে সঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে নিহত মেহজাবিনের স্বামী হুমায়ুনকে আটক করে ধানমন্ডি থানায় নেওয়া হয়েছে। সেসময় মৃত্যুর ঘটনাটি রহস্যময় বলে উল্লেখ করেন এসআই সাজ্জাদ।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মেহজাবিন ও তার স্বামী হুমায়ুন, দুজনের বাড়িই যশোরে। স্বামীর বাড়ি মনিরামপুরে। আর মেহজাবিনের বাবার বাড়ি যশোর সদরের আমিফপুর মোড়ে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে নিহতের মামা যমুনা গ্রুপের ইঞ্জিনিয়ার কাজী ফিরোজ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, 'মেহজাবিনের বাবা আমাকে ফোন করে বলেন, আমার মেয়ে মনে হয় বেঁচে নেই। সে খবরে আমি সেন্ট্রাল হাসপাতালে ছুটে এসেছি।'
এর আগেও মেয়ের খোঁজ নিতে বলেছিলেন। ওর বাবা আমাকে জানিয়েছিলেন মেহজাবিনের উপর মানুষিক টর্চার চলছে। কিন্তু আমি ব্যস্ত থাকায় আসতে পারিনি।
তিনি আরো জানান, মেহজাবিনের গলার দুপাশে কালো দাগ দেখতে পেয়েছি। এটি ফাঁসের দাগ নয়। এটি সম্ভবত দুহাতে গলা চেপে ধরার দাগ। তাছাড়া লাশের দেহ দেখে মনে হয়েছে আজ তার মৃত্যু হয়নি। একদিন আগে মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। কারণ লাশের শরীর নরম হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, 'ঘটনা যাই হোক এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই। যদি আত্মহত্যা করে থাকে তবে এর কারণ কী বা কারা তাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দিয়েছে তা খুজে বের করতে হবে।' আর যদি হত্যা করা হয় তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।

মেহজাবিনের ঘনিষ্ট বান্ধবি ডালিয়া টাইমনিউজবিডিকে বলেন, “আমরা হলিফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হসপিটালের ৯ম ব্যাচের ছাত্রী। মেহজাবিন আমাদের সাথেই ২০১৩ সালে ডাক্তারি পাশ করে। মেহজাবিন ইন্টার্নি শেষ করে যখন এফসিপিএস ও বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন বিপত্তি করে বসে স্বামীর পরিবার। মেহজাবিন এর আগে কয়েকবার আমাকে জানিয়েছিল তার শাশুড়ি ও শশুড় চায় না ও বিসিএস পরীক্ষা ও এফসিপিএস (Fellow of the College of Physicians and Surgeons) পরীক্ষা দিক।
মেহজাবিনের সহপাঠীরা দাবি করেছে, বিয়ের পর থেকে মেহজাবিনের ব্যক্তিগত কাজে হস্তক্ষেপ করা হতো। মেহজাবিন ভালো কিছু করুক এটা স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন চাইতো না। এমনকি তাকে বাইরের কারো সাথে মোবাইলে কথা বলতে দেওয়া হতো না। মেহজাবিনের ব্যক্তিগত কোন জীবন ছিল না। বিয়ের পর থেকে ফেসবুক এ্যাকাউন্টটিও রিমোভ করে দেওয়া হয়।
সহপাঠী আবিদা সুলতানা বলেন, ‘ইন্টার্নির সময় রাতে দায়িত্ব থাকলে আমরা সহপাঠীরা সেই দায়িত্ব পালন করে দিতাম।’
মেহজাবিনের দু:সম্পর্কের খালা তুরানী বলেন, ‘দেড় বছর আগে মেহজাবিনের বিয়ে হয়। মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিয়ে দেওয়ার পর থেকেই মেহজাবিন যেন ছেলে হুমায়ূনের চেয়ে ভালো কিছু করতে না পারে সেই চেষ্টা করে আসছে পরিবার। শেষ পর্যন্ত মেয়েটাকে হত্যাই করলো ওরা।’
মেহজাবিনের মামী নাহিদা মমতাজের দাবি, মেহজাবিনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে দাগ রয়েছে। গলায় দাগ থাকার পাশাপাশি তিনি পিঠে এবং হাতে জখম দেখেছেন।
এদিকে মেহজাবিনের শ্বশুর টিপু সুলতান তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘মেহজাবিন আমার মেয়ের মতো ছিল। আমি অত্যন্ত ব্যথিত সে আত্মহত্যা করেছে। আর বিষয়টি তদন্ত হলে সঠিক ঘটনা বেরিয়ে আসবে। আমার ছেলেও যদি অপরাধী হয় আমি তার বিচার চাই।’
মেয়ের মৃত্যুর খবরে যশোর থেকে প্লেনযোগে রাত ৯টার দিকে ঢাকায় আসেন নিহতের বাবা নূরুল ইসলাম। মেয়ের লাশ দেখে বাইরে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বলেন, “সর্বশেষ আমার মেয়ের সাথে গতকাল (বুধবার) সকাল ১১টার দিকে ৩২ মিনিট কথা হয়েছে।
এর আগে গত ১১ নভেম্বর আমার মেয়ে ফোন করে বলেছিল, “বাবা ওরা আমাকে দিয়ে গৃহকর্মের কাজ করায়। থালাবাটি পরিষ্কার করায়। পড়তে দেয় না। বলে, এতো পড়ে কী হবে? আমাকে এফসিপিএস পরীক্ষা দিতে নিষেধ করেছে। বিসিএসের ফরম পূরণ করতে দেয়নি।”
মেয়ে আমাকে বলেছে বাবা আমি কি করবো। উত্তরে আমি বলেছি “মাগো, তুমি কিছুদিন কষ্ট করে থাকো, বিয়ে হলে শশুড় বাড়ির লোকজন একটু এরকম করেই। তোমার এফসিপিএসের ভর্তি পরীক্ষাটা হয়ে যাক, এরপর আমি একটা কিছু করবো।”
তিনি বলেন, “সবগুলো চেনা আমার। বিয়ের আগে ছেলে (জামাই হুমায়ুন) ব্যারিস্টার বললেও আদতে সে কেবল ‘ল’ পাশ করেছে। সে বেকার, সম্পূর্ণ পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। যশোরের সবাই ওদের চেনে। ওনি (টিপু) মিথ্যে কথা বলে ছেলেকে ব্যারিস্টার বানিয়ে আমার মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছে।”
স্বামীর কোনো প্ররোচনা ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেহজাবিনের জামাই এক টাকা আয় করে না। সংসারে তার কোনো দাম নাই। বাপ-মা যা বলে এর বাইরে কিছুই করার স্বামর্থ্য তার নেই।
তিনি জানান, বেয়াই খান টিপু সুলতানের ফোনে দেয়া খবরে তিনি এসেছেন। “টিপু আমাকে দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে ফোন দিয়ে বলে, বউমাকে আনকনসাস (অবচেতন) অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে, আপনি একটু আসেন।”
টিপুর পরিবারের সদস্যরাই মেয়েকে হত্যা করেছে দাবি করে তিনি বলেন, 'দুই হাতি (শ্বশুর-শাশুড়ি) চাপে পড়ে মেয়েটা আমার মারা পড়লো।'
তিনি বলেন, মেহজাবিনের শাশুড়ি ডাক্তার। শ্বশুর সাবেক এমপি, সরকারি পলিটিক্স করে। তাই আমার সন্দেহ, ওরা আমার মেয়ে হত্যার তদন্ত কাজ ব্যাহত করবে। সে কারণে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মেয়ের লাশ ময়না তদন্তে পাঠাবেন বলে জানান তিনি। রাতেই তিনি ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করবেন বলে জানান।
অন্যদিকে, সাংবাদিকরা নিহতের শ্বশুর-শাশুড়ির বক্তব্য নিতে ধানমন্ডিতে গেলে বাসার দারোয়ান কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি।
এ ব্যাপারে ধানমন্ডি থানায় যোগাযোগ করা হলে ওসি বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায় টাইমনিউজবিডিকে বলেন, নিহতের বাবা নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে শাশুড়ি, শ্বশুর ও মেয়ে জামাইকে আসামী করে মামরা করতে এসেছেন। মামলা প্রক্রিয়াধীন।
তবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টাতেও থানায় মামলা রুজু হয়নি বলে জানা গেছে।
জেইউ, জেএ





