“বাবা আমার হাতে শ্বশুড়ের জালিয়াতির অনেক ডকুমেন্ট এসেছে। তা ফোনে সব বলা যাবে না। আমাকে যশোরে নিয়ে যাও তারপর সব বলবো।” কিন্তু শশুড়ের সেই জালিয়াতির তথ্য আর বলতে পারেননি ডা. শামারুখ মেহজাবিন। তার আগেই নিহত হন তিনি।

নিহতের স্বজনদের দাবি, মেহজাবিনের শশুড় সরকার দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতান বিষয়টি জানে যাওয়াই কাল হয়েছে। খুন করা হয়েছে মেহজাবিনকে।

১২ই নভেম্বর সকাল ১১টায় বাবা নুরুল ইসলামের সঙ্গে প্রায় ৩২ মিনিট কথা বলেন মেহজাবিন। তার পরের দিনই নিহত হন তিনি।

নিহত মেহজাবিনের পিতা বাবা প্রকৌশলী নূরুল ইসলামের দাবি, তার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি। মেহজাবিনকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, শশুড়ের দুর্নীতি বিষয়ে আমার সঙ্গে মেয়ের কথোপকথন টিপু সুলতান জানতে পেরে আমার মেয়েকে খুন করেছে। তবে কী সেই ডকুমেন্ট তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি। তবে তা খতিয়ে দেখার জন্য তিনি পুলিশী তদন্ত দাবি করেছেন।

গত ১৩ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমণ্ডির বাসার বাথরুম থেকে ডা. মেহজাবিনকে অবচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার মৃত্যু হয়।

মেহজাবিনের শ্বশুর যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতানের দাবি, মেহজাবিন আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে মেহজাবিনের বাবা দাবি করে আসছেন, তার মেয়েকে খুন করা হয়েছে।

শনিবার রাতে নুরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘‘বুধবার বেলা ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে মাহজাবিনের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। ফোনে কথা বলার সময় মেহজাবিন জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছে বলে আমাকে জানায়।

তিনি বলেন, মেহজাবিনকে শ্বশুর বাড়ির লোকজন নানাভাবে অত্যাচার করছে। লেখাপড়া করতে দিচ্ছে না। যে কোন সময় তাকে মেরে ফেলতে পারে এসব জানিয়ে মেহজাবিন আমাকে বলে, আব্বু, আমি খুব ভয় পাচ্ছি। আমার শ্বশুরের দুর্নীতির কিছু ডকুমেন্ট আমি দেখে ফেলেছি। বিষয়টি তিনি জানার পর আমার দিকে চোখ বড়বড় করে তাকিয়েছেন। নুরুল ইসলাম তখন মেহজাবিনের কাছে জানতে চেয়েছিলেন কিসের দুর্নীতি। কিন্তু ফোনে তা না জানিয়ে মেহজাবিন তখন বলে, আব্বু দেখা হলে বলবো। ফোনে বলা যাবে না।

নুরুল ইসলাম জানান, মেহজাবিন কিছু কাগজপত্র পেয়ে তার সুটকেসে সংরক্ষণ করেছিলেন। ওই কাগজ পড়েই তিনি জানতে পেরেছিলেন তার শ্বশুরের দুর্নীতিরকথা। পরে শ্বশুর খান টিপু সুলতান ওই কাগজগুলো যখন খুঁজে পাচ্ছিলেন না তখন মেহজাবিন কাগজগুলো খান টিপু সুলতানের হাতে তুলে দেন।

এঘটনার পর খান টিপু সুলতান তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি কাগজগুলো পড়েছো? আতঙ্কে মেহজাবিন তখন বলেছিল কাগজগুলো আমি পড়িনি। কিন্তু খান টিপু সুলতানের তা বিশ্বাস না করায় তার কন্যাকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, জালিয়াতির ডকুমেন্টগুলো আমার মেয়ের সুটকেসের মধ্যে থাকার কথা। অন্য কেউ সেগুলো হাতিয়ে নিয়েছে কিনা, আমি জানি না। পুলিশীতদন্তে সব বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেন তিনি।’

সরকার দলীয় একজন প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত কতটা এগুবে—এমনএক প্রশ্নের জবাবে নূরুল ইসলাম বলেন, ‘‘মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ধানমণ্ডি থানার এসআই কাজী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে কিছু সময় আগে আমার কথা হয়েছে।

তিনি বলেছেন, ‘এই মামলাটি ঠিকমতো তদন্ত করা আমার শেষ চ্যালেঞ্জ। আমি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করব।’ দেখি পুলিশ কতটা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে।’’

প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম বলেন, ‘খান টিপু সুলতান বহু অপকর্মের হোতা। ১৯৭১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি বহু খুন-খারাবির সঙ্গে যুক্ত। তার অপকর্ম শেষ হওয়া উচিত।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুনেছি ঘটনার দিন টিপু সুলতান হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বাসার উদ্দেশে গেছেন। এখন তিনি কোথায় আছেন জানি না।’

ডা. মেহজাবিনের বাবা নূরুল ইসলাম দাবি করেন, তার মেয়ের হত্যায় খান টিপু সুলতান, তার স্ত্রী ডা. জেসমিন আরা এবং তাদের ছেলে হুমায়ুন সুলতান জড়িত। তাই শুধু হুমায়ুনকে গ্রেফতার করলেই হবে না অপর দুই আসামিকেও গ্রেফতার করতে হবে। এই তিন জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব ঘটনাজানা যাবে বলে দাবি করেন তিনি।’

নূরুল ইসলামের দাবি, মেহজাবিনের শশুড় আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি হিসেবে নানা ভাবে প্রভাব খাটিয়ে মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন।

তবে মেহজাবিনকে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন- এ বিষয়েএখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। যদি তিনি আত্মহত্যা করে থাকেন তাহলে ঘটনার পরপর কেন আলামত নষ্ট করা হলো এ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এব্যাপারে ধানমন্ডি থানার ওসি আবুবকর সিদ্দিক টাইমনিউজ বিডিকে বলেন, শুক্রবার দুপুরে স্বামী হুমায়ুনকে বিশেষ আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। আদালত শুনানির জন্য রোববার দিন ধার্য্য করেছেন। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

মামলার ঘটনায় বাকি দুই আসামীকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেহজাবিন আত্মহত্যা করেছেন না হত্যার শিকার হয়েছেন তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আপাতত মেহজাবিনের নিহত হবার বিষয় নিশ্চিত হওয়ার উপর অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মামলার ঘটনায় মেহজাবিনের শশুড় টিপু সুলতান ও শাশুড়ি জেসমিন আরাকে গ্রেফতারের বিষয়টি আপাতত ভাবছে না পুলিশ। যেহেতু নিহতের স্বামী হুমায়ুন সুলতান ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন সে জন্য তাকেই আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।

তবে মেহজাবিন হত্যার বিষয়ে প্রমাণ মিললে মামলা অনুযায়ী বাকী আসামীদের গ্রেফতার করা হবে বলে জানান তিনি।

জেইউ/এএইচ