বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বনের যে কোন প্রাণীর চামড়া ও হাড় ক্রয় এবং বিক্রয়- দুটোই সমান অপরাধ। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে এসব জাতীয় সম্পদ নষ্ট করে আসছে।
এই বাঘ, হরিণ, সাপসহ যেসব বন্য প্রাণীর চামড়া এবং হাড় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আসবাব পত্র তৈরী করা যায়। সেগুলোর চামড়া এবং হাড় সংগ্রহের জন্যে দেশে তিনটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে।
এদের মধ্যে দু'টি বাগেরহাটের মংলা ও সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জে এবং অন্যটি নোয়াখালির হাতিয়ায় কাজ করে। এরা মূলত ওই এলাকা থেকে বাঘ এবং হরিণসহ অন্যান্য প্রাণী হত্যার পর সেগুলোর চামড়া ও হাড় সংগ্রহ করে।
সংগৃহীত এসব চামড়া ও হাড় তারা অন্য আরেকটি সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করে। ওই সিন্ডিকেট আবার সেগুলো বিভিন্ন ভাবে ঢাকায় এনে কিছু অসাধু লেদার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে।
পরে সেই চামড়া ও হাড় দিয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ, জুতা ও বেল্টসহ বিভিন্ন মূল্যবান আসবাব পত্র তৈরী করা হয়। যেগুলো তারা দেশি-বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছে কোটি কোটি টাকায় বিক্রি করে থাকে।
দীর্ঘ দিন প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এ ধরণের ব্যবসা চললেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ছিল চক্রটি। তবে গত ৪ সেপ্টেম্বর এমনই একটি সিন্ডিকেটের দুই সদস্যকে আটক করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
রাজধানীর শাহবাগের পরিবাগ সুপার মার্কেটের একটি দোকান থেকে তাদের আটক করা হয়। তারা হলেন, স্বপন মিয়া (৫৪) এবং মো. সজল (২৫)। এসময় তাদের কাছ থেকে বাঘ, হরিণ ও সাপের চামড়ার তৈরী বিভিন্ন দ্রব্য এবং একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয়।
তাদের কাছ থেকে জব্দকৃত দ্রব্যগুলো হলো- হরিণের চামড়া ২টি, ছোট বাঘের চামড়া একটি, হরিণ ও বাঘের লেজ, মাথা, পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশের মোট ২৭টি চামড়ার টুকরা এবং অজগর ও গোখরা সাপের ১১টি চামড়া।
এছাড়াও বাঘের চামড়ার একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, হরিণের চামড়ার ১৫টি ভ্যানিটি ব্যাগ, সাপের চামড়ার ১০টি ভ্যানিটি ব্যাগ, গোখরা সাপের চামড়ার একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, হরিণের চামড়ার তৈরী ৫টি হ্যান্ড ব্যাগ, সাপের চামড়ার তৈরী ২০টি মানিব্যাগ এবং ২টি হরিণের চামড়ার তৈরী মানিব্যাগ।
পরে ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২ অনুযায়ী একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরে তাদেরকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চাইলে দু'দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহমেদুল কবির রোববার রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদেরকে গ্রেফতারের পর দু'দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। ওই তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২ ডিসিসি মার্কেটের দ্বিতীয় তলার লেদার বুটিক নামক দোকানে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে বাঘের চামড়া দিয়ে তৈরি ৫টি ভ্যানিটি ব্যাগ, সাপের চামড়ার তৈরী ৫টি ভ্যানিটি ব্যাগ, একটি বাঘের পূর্ণাঙ্গ চামড়া, ১০টি গুই সাপের চামড়া, হরিণের চামড়ার অংশ ২টি, দু'টি সাপের চামড়ার তৈরী বেল্ট এবং ১৭টি বিভিন্ন প্রাণির মাথার খুলি ও হাড়ের অংশ উদ্ধার করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরো বলেন, অভিযানের বিষয়টি বুঝতে পেরে এসবের সঙ্গে জড়িতরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা যায়নি। তবে এ বিষয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। আসামিদের ধরার চেষ্টাও চলছে।
সিআইডির বিশেষ অভিযানে আসামিরা কীভাবে পালিয়ে গেল- এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, হয়তো আগেই অভিযুক্তরা খবর পেয়েছিল। তবে তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
উদ্ধার করা বিভিন্ন প্রাণীর চামড়া ও হাড় তারা কোথা থেকে আনতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। বিস্তারিত তদন্ত শেষে বলা যাবে।
এসব পণ্য দেশী না বিদেশীরা ক্রয় করতেন এব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ সব বিষয়েও তদন্ত হচ্ছে। তবে উদ্ধার করা এ সব পণ্যের মূল্য কোটি টাকার উপরে বলেও জানান তিনি।
তবে অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আহমেদুল কবির সাংবাদিক সম্মেলনে কিছু না বললেও নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযানে অংশ নেয়া সিআইডির একজন এসআই টাইমনিউজবিডিকে জানান, তারা আমাদের কাছে স্বীকার করেছে যে, তারা এগুলো নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে একটি চক্রের কাছ থেকে সংগ্রহ করতো।
তিনি আরো বলেন, অভিযুক্তরা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা থেকেও সরাসরি বাঘের চামড়া নিয়ে আসত বলেও আমরা ধারণা করছি। এসব পণ্য বিদেশীরাই বেশি ক্রয় করতেন।
তবে সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশা প্রকাশ করে বলেন, এখন থেকে আমাদের এ ধরণের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে এ সব মালামাল ও দ্রব্যাদি এই প্রথম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ধরতে সক্ষম হয়েছে।
এমআর/ এআর





