পাসপোর্ট প্রস্তুত। তবুও দীর্ঘ অপেক্ষা। অর্থ ব্যয়। নানা চেষ্টা কাঙ্ক্ষিত দেশের ভিসার জন্য। দূতাবাসে যাওয়া-আসা। কারও ভিসা হয় সহজে, অল্প সময়ে। কারও দীর্ঘ সময়ে। আবার কারও ভাগ্যে ভিসা জোটে না।
কিন্তু এই শহরেই গড়ে উঠেছে শক্তিশালী কয়েকটি চক্র। কোনো অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। নেই কোনো নিয়ম, নীতি। মোটা অঙ্কের অর্থ দিলেই সম্ভব। তারা নিমিষেই দিতে পারে বিভিন্ন দেশের ভিসা। রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকায় এই চক্রের অবস্থান।
তবে তাদের নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী। এই চক্রের সঙ্গে প্রথম শ্রেণির কয়েক ব্যবসায়ী ও সরকারি কিছু দপ্তরের কর্মকর্তারা জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এ বিষয়ে যথাযথ প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে শিগগিরই জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
গত ৩রা ডিসেম্বর শাহজালাল (র.) বিমানবন্দর এলাকা থেকে জাল ভিসা প্রস্তুতকারী চক্রের অন্যতম হোতা দ্বীন মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। ভিসা জালিয়াতি সম্পর্কে সিআইডিকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে দ্বীন মোহাম্মদ।
এই চক্রে অন্তত ২০ জন সদস্য রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে জাল ভিসার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে মানুষকে পাঠাচ্ছে এই চক্র। নিখুঁতভাবে জাল ভিসার কাজ করায় আইন ইমিগ্রেশন পার পেয়ে যায় সহজেই।
তারা লিবিয়া, লেবানন, মালয়েশিয়া, মিশর, ইরাক, ইরান ও সৌদি আরবে শতাধিক লোক প্রেরণ করেছে জাল ভিসার মাধ্যমে। ইরাকের ইয়ামেনে রয়েছে এই চক্রের কিছু সদস্য। তারা সেখানইে জাল ভিসা প্রস্তুত করে ইমেইলে ঢাকায় প্রেরণ করে।
বাকি কাজ করা হয় রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকায়। এতে কয়েকটি পরিচিত ট্রাভেল এজেন্সির সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। বিষয়টি আরো নিশ্চিত হয়ে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
সূত্রমতে, ইরাকে অবস্থান করেই ইরাকের ভিসার হুবুহু কপি প্রেরণ করে এই চক্র। ফকিরাপুল এলাকায় ওই ভিসায় গ্রাফিক্সের নিখুঁত কাজের মাধ্যমে বিদেশ যাত্রীর নামসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংযুক্ত করা হয়। এই ভিসাটি লাগানো হয় পাসপোর্টে। তবে অনেকে জাল ভিসা নিয়ে বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন।
এ নিয়ে প্রতারণা ও মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছে। এরকম মামলা হয়েছে দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধেও। এই চক্রের দেয়া জাল ভিসা নিয়ে ইরাকে যাচ্ছিলেন ইমরান খান (২৮), কাদের (১৮), মঞ্জুর বেপারি (৩৭) ও আজিম মণ্ডল (৩৭)। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে চার লাখ করে টাকা নিয়েছে জালিয়াত চক্র।
গত ২৫শে অক্টোবর ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হয় এই চার ব্যক্তি। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া যায় দ্বীন ইসলামসহ এই চক্রের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এই চক্রের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
তা যাচাই-বাছাই করেই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে সূত্রে জানা গেছে।এ বিষয়ে বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছেন সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের উপপরিদর্শক নিউটন কুমার দত্ত। তিনি জানান, চক্রটি ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের ভিসা জাল করে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে আসছিল।
বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূরে আজম বলেন, সাধারণত জাল ভিসা চক্রের মূল হোতারা সরাসরি বিদেশ যেতে আগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না।
মূলত দালালদের মাধ্যমে সম্পূর্ণ কাজ করানো হয়। এই দালালরাও সরাসরি মূল হোতাদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ায় সুযোগ পায় না। নিজেদের আড়ালে রাখতেই দুই থেকে তিন স্তরের দালালদের মাধ্যমে জাল ভিসার কাজ করানো হয় বলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের নাম-পরিচয় উদঘাটক করা সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।
জাল ভিসা সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জাল ভিসা তৈরি হলেও কঠোর তল্লাশির কারণে এর সংখ্যা কম। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হওয়ায় জাল ভিসা এখন আগের চেয়ে কম তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়টি নিয়ে সিআইডি ছাড়া তৎপর রয়েছে র্যাব। র্যাব জানিয়েছে, রাজধানীতে কয়েকটি চক্র রয়েছে। এসব চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। চক্রটি লিবিয়া, লেবানন, মালয়েশিয়া এবং ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের জাল ভিসা প্রস্তুত করে তা পাসপোর্টে সংযুক্ত করে লাখ লাখ টাকা আদায় করে।
এসব জাল ভিসা সম্বলিত পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পর আইনগত জটিলতা এমনকি জেল জরিমানাসহ বিচারের সম্মুখীন হতে হয়।
এক বছরে মানবপাচারে জড়িত এসব চক্রের অর্ধশতাধিক সদস্যকে আটক করেছে র্যাব-৩।
গত বছরের ১০ই সেপ্টেম্বর জাল পাসপোর্ট ও ভিসা প্রস্তুতকারী নোয়াখালীর কবির হাটের সবতনপুরের জাহাঙ্গীর হোসেন, চাটখিলের কল্যাণপুরের খোকন, বেগমগঞ্জের কাদিরপুরের মনিরউল্লাহকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
তাদের কাছ থেকে ১৪৭টি পাসপোর্ট, বিভিন্ন দেশের ৩০৬টি ভিসা, ৩০টি স্টিকার জব্দ করা হয়। র্যাব-৩ এর এএসপি আবদুল করিম জানান, জাল ভিসা প্রস্তুতকারীদের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করতে র্যাবের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সূত্র মানবজমিন
মাহমুদ





