বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরী ২০১৩ সালে দেশে ফিরে আসে। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে গোয়েন্দারা তামিমের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়। অনেকেরই প্রশ্ন, কীভাবে দীর্ঘদিন কানাডায় বসবাসের পর দেশে ফিরে তামিম নব্য জেএমবির মূল সমন্বয়ক হয়ে উঠল?

অনুসন্ধানে জানা যায়, তামিম মূলত কানাডায় থাকার সময় উগ্রবাদে জড়ায়। সিরিয়ায় আইএসের হয়ে যুদ্ধ করেছে, এমন কয়েকজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। 'খিলাফত' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তামিম দেশে ফিরে আসে। এরপর সে মাওলানা আবুল কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

 জেএমবির একাংশের আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের অনুপস্থিতিতে কাশেম ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পালন করে আসছিল। সর্বশেষ দিনাজপুরের ওখড়াবাড়ি মাদ্রাসার শিক্ষক ছিল কাশেম। জেএমবি সদস্যদের কাছে কাশেম 'বড় হুজুর' হিসেবে পরিচিত। মূলত 'বড় হুজুরের' সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জেএমবিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে তামিম। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় জেএমবির আরেক শীর্ষ নেতা রিপন। মূলত এ তিনজন একত্রিত হয়েই জেএমবির নতুন অপারেশন কৌশল নির্ধারণ করে।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) আদলে প্রথমে টার্গেট কিলিংয়ের জন্য সদস্য নির্বাচন করে তারা। এরপর একাধিক গোপন আস্তানায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নব্য জেএমবি ঢাকায় একটি অপারেশন চালালেও মূলত তামিমের পরিকল্পনায় তাদের বড় অপারেশন রংপুরে জাপানের নাগরিক হোশি কোনিও হত্যাকাণ্ড। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় তামিম ও তার দুই সহযোগী নিহত হওয়ার পর জেএমবির 'বড় হুজুর' মাওলানা কাশেম, রিপন, সামরিক কমান্ডার জাহাঙ্গীরসহ কয়েকজনকে খুঁজছেন গোয়েন্দারা। তবে মাওলানা কাশেমের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হচ্ছে। তার এক ভাই জামা'আতুল মুসলেমিনের নেতা।


সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের জুলাইয়ে দিনাজপুরে যায় কানাডা ফেরত তামিম। সেখানে মাওলানা কাশেমের সঙ্গে তার একাধিক বৈঠক হয়। তামিমের সাংগঠনিক নাম দেওয়া হয় আবু বকর আল হানিফ। মূলত জঙ্গিদের উদ্দেশে মোটিভেশনাল বক্তব্য রাখত সে। এ ছাড়া অর্থ সরবরাহ করত তামিম। এমনকি টার্গেট করা ব্যক্তিকে হত্যার পর কয়েকটি স্তর পার হয়ে তামিমের কাছে নিহতদের ছবি পাঠাত উগ্রপন্থিরা। তার মাধ্যমে সে ছবি দাবিকসহ অন্যান্য সাইটে পাঠানো হয়। এরপর আইএসের কাজ বলে তা প্রচার করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় তাদের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মারজানও সম্পৃক্ত ছিল।

দায়িত্বশীল এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তামিম জেএমবির সমন্বয়কের দায়িত্ব নেওয়ার পর সে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বাইরেও শিক্ষিত তরুণ ছেলেদের সংগঠনে নেওয়ার চেষ্টা করে। কয়েকটি ধাপে টার্গেট করা তরুণদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তামিম তাদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করত ও দলে অন্তর্ভুক্ত করত। এ প্রক্রিয়ায় জেএমবির নতুন ধারার সঙ্গে তাওসিফ হোসেন, নিবরাস ইসলাম, সেজাদ রউফ অর্কের মতো মেধাবী ছাত্ররা যুক্ত হয়।

সূত্র বলছে, হোশি কোনিও হত্যা মামলার তদন্তে তামিমের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে এখন নিশ্চিত গোয়েন্দারা। এ মামলার সম্পূরক চার্জশিটে তাকে আসামি করা যেতে পারে। তামিম নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে জেএমবি আপাতত 'কিছুটা নিষ্ক্রিয়' হলেও তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে আরও সময় লাগবে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জেএমবির আরও কিছু আস্তানা রয়েছে। সর্বশেষ রোববার রাতেও রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর ও নারায়ণগঞ্জের জামতলায় দুটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। তবে সেখান থেকে বড় ধরনের কোনো আলামত উদ্ধার বা কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।

সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জে নিহত তামিমসহ তিন জঙ্গি আইএস মেডিসিন হিসেবে পরিচিত 'ক্যাপটাগন' সেবন করেছিল কি-না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে তাদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হবে। এ ছাড়া জঙ্গিদের আস্তানা থেকে উদ্ধার আলামতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

এসএ