নারায়নগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত হত্যা (সেভেন মার্ডার) মামলার প্রধান আসামী নুর হোসেনের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করেনি পুলিশ। তার বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদনের সুযোগ নেই বলে জানান নারায়নগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মাহিদ উদ্দিন।
শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে নুর হোসেনকে আদালতে তোলা হয়। পুলিশ নুর হোসেনের বিরুদ্ধে কোন রিমান্ড আবেদন না করায় আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে, নুর হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব মামলার তদন্ত এরইমধ্যে সম্পন্ন হওয়ায় নতুন করে তার বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করার সুযোগ নেই বলে জানান নারায়নগঞ্জের পুলিশ সুপার।
তিনি বলেন, যেহেতু নুর হোসেনের বিরুদ্ধে কোন মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন নেই এবং তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হয়ে যাওয়ায় এখন রিমান্ড আবেদনের সুযোগ নেই।
পুলিশের এই বক্তব্যে হতাশা প্রকাশ করেছেন নৃশংস হত্যার শিকার সাতজনের অন্যতম নারায়নগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ও শশুরি শহীদুল ইসলাম।
সেলিনা ইসলাম বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা কারা, অর্থের যোগানদাতা কারা তাদের চিহ্নিত করতে নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
তিনি বলেন, প্রধান আসামীকে কোন ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই পুলিশের করা তদন্ত প্রতিবেদন বাতিল করে প্রয়োজনে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করে আবারও চার্জশীট দেয়া হোক।
সেলিনা ইসলামের মতো একই দাবি করেছেন নিহত মনিরুজ্জামানের ভাই মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, নূর হোসেনের সঙ্গে র্যাবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পর্ক এক দিনে গড়ে ওঠেনি। তাই নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেই হত্যার পরিকল্পনাকারী ও খুনিরা শনাক্ত হবে।
এদিকে, কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শশুর শহীদুল ইসলাম বলেন, এই মামলার সুবিচারের স্বার্থেই এতদিন ধরে ভারতে পালিয়ে থাকা নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।
নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রীর আইনজীবী বলেন, ৫৪ ধারায় নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়। এত বড় একটি ঘটনায় আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা না হলে অনেক কিছুই অগোচরে থেকে যেতে পারে বলেও জানান সেলিনার আইনজীবী।
উল্লেখ্য, গত বছরের (২০১৪) ২৭ এপ্রিল সাত খুনের পরে ভারতে পালিয়ে যান নূর হোসেন। ওই বছরের ১৪ জুন কলকাতার বাগুইআটিতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভারতে অবস্থানের মামলা হয়। গত মাসে (অক্টোবর ২০১৫) ভারত সরকার সেই মামলা প্রত্যাহার করে নিলে নূর হোসেনের দেশে ফেরার পথ সুগম হয়।
পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর ২০১৫) ভারতের স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কলকাতার দমদম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নূর হোসেনকে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা তাঁর নামে একটি পারমিট ইস্যু করে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্যে কঠোর নিরাপত্তায় নূর হোসেনকে যশোরের বেনাপোলে নিয়ে যান।
নূর হোসেনের বিরুদ্ধে সাত খুনসহ ১৩টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এর মধ্যে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে এক বছরের কারাদণ্ডও হয়েছে তাঁর।
গত বছরের (২০১৪) ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে দুটি গাড়িতে থাকা সাতজনকে অপহরণ করা হয়। এর মধ্যে একটি গাড়িতে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগীরা। অন্য একটি গাড়িতে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক। তিন দিন পরে অপহৃত ব্যক্তিদের লাশ ভেসে ওঠে নারায়ণগঞ্জের উপকণ্ঠে শীতলক্ষ্যা নদীতে। এ ঘটনা সারা দেশে হইচই ফেলে দেয়।
অপহরণের পরদিন অপহৃত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ফতুল্লা থানায় নূর হোসেনসহ ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে ‘র্যাবকে দিয়ে’ অপহরণের অভিযোগ করা হয়। তিন দিন পরে লাশ উদ্ধার হলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। পরে আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে আরেকটি হত্যা মামলা করেন।
কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম প্রথমে র্যাবের বিরুদ্ধে ‘ছয় কোটি টাকা নিয়ে’ অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ করেন। অর্থায়নকারী হিসেবে তিনি নূর হোসেনকে অভিযুক্ত করেন। পরে তদন্তে এ ঘটনার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে র্যাব-১১-এর কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা বের হয়ে আসে।
র্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার এম এম রানাসহ অন্য সদস্যরা মিলে ওই সাতজনকে অপহরণের পর হত্যা করে পেট চিরে লাশ নদীতে ফেলে দেন বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। প্রায় এক বছর তদন্তের পরে গত এপ্রিলে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এতে র্যাবের ওই তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
নূর হোসেন হলেন অভিযোগপত্রভুক্ত ১ নম্বর আসামি। অভিযুক্ত ৩৫ জনের মধ্যে বর্তমানে র্যাবের তিন কর্মকর্তাসহ ২২ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। ২২ জনই ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। পলাতক আসামিদের মধ্যে র্যাবের আট সদস্য রয়েছেন।
ট্রাকচালকের সহকারী হিসেবে জীবন শুরু করা নূর হোসেন ১৯৯২ সালে বিএনপির সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে যোগ দেন বিএনপিতে। সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বাংলাদেশ ট্রাকচালক শ্রমিক ইউনিয়ন কাঁচপুর শাখার সভাপতি হন। তাঁর বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা হয়।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁকে ধরিয়ে দিতে ইন্টারপোলে রেড নোটিশও পাঠানো হয়। ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের পর তিনি এলাকায় ফেরেন। পরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে তিনি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা, উচ্ছেদে বাধা, পরিবহনে চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে বারবার আলোচনায় আসেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানায় ছয়টি হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলা রয়েছে।
কেবি





