রাজনীতিকদের পর এবার দুদকের জালে আটকে যাচ্ছেন সরকারের প্রভাবশালী সাবেক ও বর্তমান অর্ধশতাধিক আমলা। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অবাক হওয়ার মতো অভিযোগ।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের আমলাদের নানা অপকর্ম, দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করেছে । এর পরই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেতে থাকে দুদক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর গুলশানে ফ্ল্যাটের তথ্য গোপন করে রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ'র (রাজউক) প্লট জালিয়াতির ৩ মামলার আসামি (সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত) বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ পর্যায়ে এসেছে।
গত ২২ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা দায়ের করে দুদক। তদন্তকালে সচিব ড. খোন্দকার শওকতের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পায় দুদক। দুদকের উপ পরিচালক যতন কুমার রায় মামলাটি তদন্ত করছেন।
মামলার তদন্তকালে আরও বেশ কয়েকজন আমলার সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক (অতিরিক্ত সচিব) আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আকতার হোসেন ভূঁইয়া, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মাহবুব উল আলম, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মুসা এবং অতিরিক্ত সচিব খিজির আহমেদ।
তারা এক সময় রাজউকে দায়িত্ব পালনকালে ড. শওকত হোসেনের প্লট জালিয়াতিতে সহায়তা করেন।
সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপ-পরিচালক মীর মোঃ জয়নুল আবেদীন শিবলী।
সূত মতে, মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সার্টিফিকেটে চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কে.এইচ. মাসুদ সিদ্দিকী, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিব একেএম আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ও বর্তমান বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, স্বাস্থ্য সচিব নিয়াজ উদ্দিন মিঞা, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (সদ্য ওএসডি) আবুল কাসেম তালুকদারের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপ-পরিচালক মোঃ জুলফিকার আলী।
সমুদ্র পরিবহণে জ্বালানি (ওশান লস) কম-বেশি দেখিয়ে বাংলাদেশ পেট্টোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)’র ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় আমলাদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব (বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান) আবু বকর সিদ্দিক, বিপিসির সাবেক সচিব আনোয়ারুল করিম, সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব একেএম জাফরউল্লাহর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের সুপারিশ বিবেচনাধীন রয়েছে। কমিশনের অনুমোদনের পরই ১৫০’ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ৩ আমলাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল হবে।
সূত্র মতে, মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী বিদেশী বন্ধুদের সম্মাননা ক্রেস্টে সোনা জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত বেশ কয়েকজন আমলা। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মোঃ মিজানুর রহমান, বর্তমান সচিব কে.এইচ. মাসুদ সিদ্দিকী, অতিরিক্ত সচিব (ওএসডি) গোলাম মোস্তফা, যুগ্ম সচিব (ওএসডি) আবুল কাসেম তালুকদার, যুগ্ম-সচিব (ওএসডি) মজিবুর রহমান মামুন, সিনিয়র সহকারি সচিব (ওএসডি) মোঃ বাবুল মিঞার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। দুদকের উপ পরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম এবং সহকারী পরিচালক শেখ আবদুস সালাম এ অনুসন্ধান করছেন ।
জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার পর প্রথম অভিযোগটি আসে আমলাদের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন প্রকল্পের ৪০০ গাড়ির হদিস নেই। কিন্তু আমলাদেও শক্ত হস্তক্ষেপের ফলে দুদকের অনুসন্ধান তখন থেমে যায়।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সরকারি ১৮ বাড়ি বরাদ্দে অনিয়ম এবং দুর্নীতির ঘটনায় তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব এস.এম. জাফর উল্লাহ ও শহীদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের পর গ্রেফতার হন ওই ২ সচিব। আর মহাজোট সরকারের আমলে ২০১৩ সারে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হন সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তবে দুদকের শক্ত অবস্থা বজায় থাকলে আরও বেশ কয়জন আমলার বিরুদ্ধে মামলা হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকা, একে, ১৩ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ





