রাজধানীর বেশ কয়েকটি রেল ক্রসিং এলাকা দুর্ঘটনাকবলিত বলে রেলওয়ে মন্ত্রণালয় কর্তৃক চিহ্নিত করা হলেও সঠিক নজরদারির অভাবে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। সরানো যাচ্ছে না রেল লাইনে বা রেল ক্রসিং সংলগ্ন এলাকায় ভ্রাম্যমান বাজার ও দোকানপাট।

তবে রেলওয়ের উর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষের দাবি, দুর্ঘটনাকবলিত রেল ক্রসিং এলাকাগুলোতে নজরদারি রয়েছে। প্রায়ই অভিযান চালানো হয়। তবে পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে সঠিক সময়ে বা সবসময়েই চিহ্নিত স্থানগুলোতে নজরদারি রাখা সম্ভব হয় না বলে সুযোগ পেলেই ভ্রাম্যমান দোকানপাট বসে পড়ে।

কারওয়ান বাজারের রেললাইনে বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৯টার এক দুর্ঘটনায় ট্রেনে কাটা পড়ে তিন যুবক নিহত ও নারীসহ ছয়জন আহত হয়েছেন। সে সময় দুই দিক থেকে দু’টি ট্রেন কারওয়ানবাজার রেল ক্রসিং এলাকা অতিক্রম করছিল। হতাহতরা দুই ট্রেনের মাঝে আটকা পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। আহতদের অবস্থাও আশঙ্খাজনক বলে জানা গেছে।

কারওয়ানবাজারে রেললাইনের ওপর মাছের বাজার আর পাশের জায়গা দখল করে দোকান গড়ে তোলার কারণেই বার বার রেল দুর্ঘটনা ঘটছে সেখানে। বৃহস্পতিবার সকালে কারওয়ানবাজারে রেললাইনে দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও গেটম্যান এবং রেলওয়ের উর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল দশটা পর্যন্ত পুরো রেললাইনের ওপর বসে মাছের আড়ৎ আর রেললাইনের দুই পাশে দোকান থাকার কারণে ট্রেন আসা যাওয়ার মুহুর্তে লোকজন নিরাপদ দূরত্বে যেতে পারেন না। যার ফলে বার বার দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় সাধারণ লোকজনকে।

জিআরপি পুলিশ বলছে, বার বার রেললাইন ও পাশের জায়গায় বাজার-দোকানের বিষয়ে তাগিদ দেওয়ার পরও ব্যবসায়ীরা কোনো কথা শোনেন না। তারা রেললাইনের ওপর নির্দ্বিধায় করছেন মাছের ব্যবসা।

প্রত্যক্ষদর্শি স্থানীয় বাসিন্দা এখলাস উদ্দিন বলেন, রেললাইনের ওপর ভোর থেকে মাছের আড়ৎ বসে। সেজন্য লোকজনের আনাগোনা বাড়ে সেখানে। হঠাৎ যখন ট্রেন এসে যায় বিপত্তিটা ঘটে তখনই। তবে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে যখন দুই দিক থেকে একই সাথে দুটি ট্রেন চলে আসে। অল্প সময়ে ব্যবধানে মানুষ নিরাপদ দূরত্বে যেতে পারে না। বা যাবার জায়গাও থাকে না। কারণ দুই পাশের ফুটপাত জুড়ে অসংখ্য দোকান। এ কারণে প্রায় প্রতিনিয়তই এখানে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে।

আবু বকর অভিযোগ করেন, এ বিষয়ে বার বার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো কাজ হয় নি। বরং রেল পুলিশকে মাছ বাজারের পক্ষ থেকে বড় সুবিধা দেওয়া হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

প্রত্যক্ষদর্শি আবু বকর বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে ঢাকা থেকে কর্ণফুলী এক্সপ্রেস চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাচ্ছিল এবং ময়মনসিংহের তারাকান্দি থেকে যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেন ঢাকায় আসছিল। যখন দুই ট্রেন পাশাপাশি আসা-যাওয়া করছিল, তখন মানুষ দুই দিকে ছোটাছুটি করতে থাকেন। কিন্তু তাদের সরে যাওয়ার মতো রাস্তা ছিল না। যার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

রেলক্রসিংয়ে দুই শিফটে মোট ৮ জন গেটম্যান দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বৃহস্পতিবার সকালে দায়িত্ব পালন করছিলেন মতিউর রহমান, রুবেল হোসেন, আবু আহমেদ ও রবিউল ইসলাম।

রবিউল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আমরা ভাই গার্ডের দায়িত্ব পালন করি। আমাদের কথা সব সময় সবাই শোনে না। তাই চাইলেও জোর করেও কাউকে এই এলাকা থেকে উঠিয়ে দিতে পারি না। মাছের দোকান ঘিরে এখানে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। কিন্তু ট্রেন চলে আসলে দৌড় দিয়েও এক সাথে সবাই নিরাপদ স্থানে পৌছতে পারেন না। যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা রোধকল্পে রেললাইনের ওপর থেকে মাছের বাজার উঠিয়ে দেবার দাবি করেন তিনি।

দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শণে আসেন কমলাপুর জিআরপি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল মজিদ, তেজগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাজাহারুল ইসলাম ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাহ উদ্দীন আহমেদ।

জিআরপি থানার ওসি আব্দুল মজিদ বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছিল ট্রেন কর্ণফুলী এক্সপ্রেস এবং তারাকান্দি থেকে ঢাকায় আসছিল যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেন। দু’টি ট্রেন ক্রস করার সময় এ ঘটনা ঘটে। বার বার রেললাইনের ওপর মাছের বাজার সরানোর কথা বলেও কাজ হয় নি। শিগগিরই রেললাইনের পাশের যেসব জায়গা দখল করে দোকান গড়া হয়েছে, সেগুলো দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হবে।

তেজগাঁও থানার ওসি মাজাহারুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, এটি রেলের জায়গা, প্রধানত দায়িত্ব তাদের। মূলত এখানে বাজার বসার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আসলে এ বিষয়ে সচেতনতার প্রয়োজন। কেউ কথা শুনতে চান না। সবাই যদি সচেতন হয় তাহলে এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

ঢাকা, জেইউ, ১১ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ