ফেসবুকে সংসদ সদস্যকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মোবাইল কোর্টে এক শিক্ষার্থীকে দুই বছরের দণ্ড দেওয়ার ঘটনায় হাইকোর্টে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন টাঙ্গাইলের সখিপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।

তথ্য প্রযুক্তি আইনে জিডি করার পর স্কুল শিক্ষার্থীকে কারাদণ্ড দেয়ার ঘটনার বিষয়ে হাইকোর্টে মঙ্গলবার পূর্ণাঙ্গ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষার্থী সাব্বির শিকদার হাইকোর্টে নির্যাতনের বর্ণনা দেয়। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ শুনানি শেষে আগামী ১৮ অক্টোবর এই বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য করে।

ইউএনও ও ওসির ব্যাখ্যার পর আদালত শিক্ষার্থী সাব্বিরের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চায়। এসময় সাব্বির বলে, 'গত ১৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাত ৯টার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম। এমন সময় বাইরে থেকে কেউ আমাকে ডাক দেয়, সাব্বির বাড়িতে আছ? তারপর আমি বাইরে এসে দেখি সিভিল ড্রেসে একজন এবং আরেকজন পুলিশ। ওই পুলিশ আমাকে বলেন, তোমাকে থানায় যেতে হবে।

পরে আমাকে থানায় ওসির রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ওসি আমাকে মোবাইল ফোন দেখিয়ে বলেন, এগুলো কি লিখেছিস। আমি বলেছি, এগুলো আমি লিখি নাই। এরপর বারবার আমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে আমি আবারও বলি লিখি নাই। পরে আমাকে এমপির বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

আমি এমপির বাসায় গিয়ে দেখি তিনি সোফায় বসে আছেন। আমাকে তার সামনে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি আমাকে বলেন, তুই আমার বিরুদ্ধে কি লিখেছিস? এরপর এমপি আমাকে দুটি বাড়ি মারেন (আঘাত করেন)। কিন্তু এতে আমি কিছু মনে করি নাই।

এ সময় এমপি ওসিকে বলেন, ওকে থানায় নিয়ে যাও। তারপর আমাকে থানায় নিয়ে এসে চোখ বেঁধে বেধম নির্যাতন করা হয়। (ওসি) আমাকে বলেন, তোকে ক্রসফায়ারে দিব। ক্রসফায়ারের ভয় এবং নির্যাতনের মুখে স্বীকার করি, আমি লিখেছি। তারপর আমাকে বলে, এ ধরনের লেখা আর লিখবি না।
এ ঘটনার তিনদিন পর আমাকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ইউএনও আমাকে বুকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। তখন আমার হুশ ছিল না। কে যেন আমাকে ওইখান থেকে উঠিয়ে নেয়। আমাকে থানায় নিলে ওসি বলে তোমাকে দুই বছরের দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে যেয়ে এ সময় সাব্বির আদালতে কেঁদে ফেলেন। কাঁদতে কাঁদতে সাব্বির বলেন, স্যার আমি এই ঘটনার বিচার চাই। সরকারের কাছে বিচার চাই। আমি সঠিক বিচার চাই।

আদালত সাব্বিরকে বলেন, কেউ কি তোমাকে এই বক্তব্য শিখিয়ে দিয়েছে। তখন সাব্বির বলেন, কেউ শিখিয়ে দেয়নি।

আদালত ছাত্রের বক্তব্য হলফনামা করে আদালতে দাখিল করতে আইনজীবী খুরশীদ আলম খানকে নির্দেশ দেন। ইউএনও-ওসিকে আদালতে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতিও দেয় আদালত। এ ছাড়া ঘটনার বিষয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন হলফনামা করে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
আদালতে ইউএনও ও ওসির পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন ও অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম। অপর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান।

আজ আদালতের নির্ধারিত কার্যক্রম শুরুর পর এ মামলাটি উত্থাপিত হলে আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে থাকেন ইউএনও এবং ওসি। এরপর ওসির আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন শুনানি শুরু করেন। তিনি বলেন, পত্রিকায় যে রিপোর্ট হয়েছে তা সঠিক নয়। পত্রিকায় বলা হয়েছে যে আইসিটি আইনে সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ কথা সত্য নয়। গাজা পাওয়ায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ কথা পত্রিকায় লেখা হয়নি। সংসদ সদস্যকে হেয় করার জন্যই এ রিপোর্ট করা হয়েছে।

সঠিক নথিপত্র না দেখেই রিপোর্ট লেখা হয়েছে। আদালতকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এরপর তিনি থানায় করা সংসদ সদস্যের জিডিটি পাঠ করেন। তিনি বলেন, অভিযোগ গুরুতর। এই ছেলের আইডি থেকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

এসময় আদালত বলেন, নথিপত্র দেখে প্রশ্ন জাগছে মোবাইল কোর্ট কম্পিউটার নিয়ে দৌড়ায় কিনা। এ পর্যায়ে ইউএনও’র আইনজীবী অ্যঅডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, না তা নয়। একটি নির্ধারিত ছক থাকে। তাই এরকম মনে হতে পারে।

এসময় আদালত বলেন, পুলিশ কনস্টেবল দেলোয়ার কিভাবে ঘটনাস্থলে কম্পিউটার নিয়ে গেলেন এবং অভিযোগ টাইপ করা হলো তা দেখতে হবে।

এসময় নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, গুলশানের হলি আটিজানে হামলার জন্য যারা ধরা পড়েছে তাদের বয়স কত তা দেখুন। যারা অসত্য রিপোর্ট করেছে তাদের আদালতে ডাকুন। তিনি বলেন, যারা অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যস্ত তারাই এমপিদের হেয় করার জন্য রিপোর্ট লিখেছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে ‘বয় জেলড ফর এফবি কমেন্ট অ্যাবাউট এমপি’ শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে ফেসবুক আইডিতে হুমকি দেয়ার অভিযোগে সাব্বির শিকদারকে দুই বছরের কারাদন্ড দেয় আদালত।

ওই পত্রিকার কপি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান আদালতের নজরে আনেন। এরপর হাইকোর্টের একই বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাদের ২৭ সেপ্টেম্বর আদালতে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেন। ওইদিনই কারাদণ্ডপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষার্থীকে আদালত জামিনে মুক্তির নির্দেশও দেয় আদালত।
এছাড়া ওই শিক্ষার্থীকে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে সখিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাকসুদুল আলমকে মঙ্গলবার সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেছিলেন হাইকোর্ট।

সে অনুযায়ী ইউএনও ও ওসি আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। তাদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন ও অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম আদালতকে বলেন, এই সাজা দেওয়ার সঙ্গে এমপির করা জিডির কোনো সম্পর্ক নেই। গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় ওই স্কুল শিক্ষার্থীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুই বছর সাজা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ওই ছেলে অপ্রাপ্তবয়স্ক নয় উল্লেখ করে ওই শিক্ষার্থীর ১০ মে ১৯৯৫ সালে জন্ম তারিখ সম্বলিত পাসপোর্ট দেখান তারা।

অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, ১০০ গ্রাম গাজাসহ ধরা পড়ায় ঐ স্কুল শিক্ষার্থীকে কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। কিন্তু ওই প্রতিবেদনটিতে গাজার বিষয়টি উল্লেখই ছিল না। এছাড়া স্কুলশিক্ষার্থীকে নাবালক বলা হয়েছে সেটিও সত্য নয়।

অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, প্রসিডিউরাল ভুল হতেই পারে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে ঘটনাস্থলেই ম্যাজিস্ট্রটকে বিচার শেষ করতে হয়। মোবাইল কোর্টের আদেশে ভুল হলে আপিল করার সুযোগ আছে।

আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান বলেন, আমি কাউকে ডিফেন্ড করার জন্য আসিনি। একজন আইনজীবী ও নাগরিক হিসেবে পত্রিকার প্রতিবেদনটি আদালতের দৃষ্টিতে এনেছি। তিনি বলেন, জাটকা নিধন প্রতিরোধে মোবাইল কোর্টের ভূমিকা রয়েছে। তাই বলে তারা যা খুশি তাই করতে পারে না। মোবাইল কোর্ট যথাযথভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে কি-না বিষয়টি আদালতের দেখা উচিত।

টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখিপুর) আসনের সংসদ সদস্য অনুপম শাজাহান জয় গত ১৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এতে বলা হয়, ফেসবুকে একটি আইডি থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই জিডির পরিপ্রেক্ষিতে সখিপুর থানার পুলিশ উপজেলার প্রতিমা বঙ্কি পাবলিক হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাব্বির সিকদারকে আটক করে। শনিবার তাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন। কারাদণ্ডের পর সোমবার সকালে ওই কিশোরকে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেন সখিপুরের ওসি মাকসুদুল আলম।
সাব্বির টাঙ্গাইলের সখীপুরের প্রতিমা বঙ্কি গ্রামের বাসিন্দা শাহিনুর আলমের ছেলে।

এসএ