রাজধানীতে পশুর হাট এখনো শুরু হয়নি। হাট জমে ওঠার আগেই সক্রিয় হয়ে ওঠছে জালটাকা কারবারিচক্র। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে এ চক্রের কয়েকজনকে গ্রেফতার ও কয়েক লাখ টাকার জাল নোট উদ্ধার করেছে। ভাটারা এলাকা থেকে ৪৩ লাখ জাল টাকাসহ গ্রেফতার এক দম্পতিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এর আগে একটি চক্র গ্রেফতার হওয়ার পর র‌্যাব জানিয়েছিল ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে বাজারে কোটি টাকার বেশি জাল নোট ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

এদিকে রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে কোরবানির পশুর হাট। দক্ষিণ সিটিতে একটা স্থায়ী হাট এবং ১০টি অস্থায়ী অন্যদিকে উত্তর সিটি এলাকায় ১টি স্থায়ী ও ৮টি অস্থায়ীসহ মোট নয়টি পশুর হাট বসবে। দুই সিটি কর্পোরেশনেই ২১ জুলাই অর্থাৎ ঈদের দিন পর্যন্ত হাট চলবে পশু কেনাবেচাঁ।
অন্যদিকে ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তের মেশিন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া মুদ্রা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতরা বেশ ‘অভিজ্ঞ’ এবং তারা গ্রেপ্তার হলে আইনের ফাঁক-ফোকরে জামিন নিয়ে বেরিয়ে একই কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ জানিয়েছে, আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কয়েক কোটি টাকার জাল নোট তৈরী করে বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি চলছিল রাজধানীর ভাটারায় নুরের চালার একটি বাড়িতে। দীর্ঘ দশ বছর ধরে এমন জাল টাকা তৈরি করে সারাদেশে ছড়িয়ে দিত আব্দুর রহিম ও ফাতেমা দম্পতি। কয়েক হাত ঘুরে ভোক্তা পর্যায়ে এসব জাল নোট ছড়িয়ে দিতে দেশজুড়ে ছিল ডিলার। পুরো এক লাখ টাকার জাল নোট তৈরিতে খরচ হতো চার হাজার টাকা।

এরমধ্যে একহাজার টাকার এক লাখের বান্ডিল ১৫ হাজার টাকা এবং পাঁচশ টাকার একলাখের বান্ডিল ১২ হাজার টাকা বিক্রি করা হতো। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত সোমবার নুরেরচালা সাঈদ নগর এলাকার ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। অভিযানে এই চক্রের হোতা আব্দুর রহিম শেখ ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার বাকিরা হলেন- গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হেলাল খান, আনোয়ার হোসেন ও ইসরাফিল আমিন। ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, নুরের চালা সাঈদ নগরের একটি সাততলা বাড়ির ষষ্ঠ তলায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা তৈরির একটি ঘরোয়া কারখানা সন্ধান পাওয়া যায়। এ সময় জাল টাকা তৈরি এবং বিপণনে জড়িত এক নারীসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কারখানাটি থেকে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা মূল্যমানের ১ হাজার ও ৫০০ টাকার নোট এবং বিপুল পরিমাণ জাল টাকা তৈরির উপকরণ জব্দ করা হয়। তিনি আরও বলেন, মূলত আব্দুর রহিম শেখ ও তার স্ত্রী ফাতেমা কারখানাটি পরিচালনা করত।

বাকিরা তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করত। ডিবি পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, ফাতেমা বেগম ২০১৯ সালে হাতিরঝিল এলাকার একটি বাসায় জাল টাকা তৈরির সময় অন্য এক সহযোগীসহ পুলিশের কাছে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তবে সেবার তার স্বামী রহিম পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এর আগেও বেশ কয়েকবার জাল টাকা এবং মাদক কেনা-বেচায় জড়িত থাকার অভিযোগে তারা গ্রেফতার হয়েছিলেন। এই দম্পতি বর্তমানে দুই দিনের পুলিশ রিমান্ডে আছেন। বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে হাজির করা হতে পারে।

এদিকে গতকাল বুধবার র‌্যাব-২ এর অধিনায়ক খন্দকার সাইফুল আলম কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, মোহাম্মদপুর থেকে হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে তৈরি একটি দালাল চক্রের চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরা হলেন- চক্রের হোতা সাহাদৎ হোসেন মামুন (৪৬), মহিন উদ্দিন মামুন (৪৬), রহমত উল্লাহ (৩২) ও আকরাম হোসেন (৫২)। মঙ্গলবার রাতে মোহাম্মদপুর থানাধীন ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় সাহাদতের কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার জাল নোট ও ৫৫০ ইয়াবাও জব্দ করা হয়।

এরআগে গত ২২ জুন র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মাহফুজুর রহমান সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান, ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে কোটি টাকার বেশি জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাকারী একটি চক্রকের অন্যতম সদস্য নাইমুর হাসান তৌফিককে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। র‌্যাব বলছে, এই চক্রটি কোটি টাকারও বেশি জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছে। ঈদুল আযহা সামনে রেখে আরও জাল টাকা ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। চক্রটি এক লাখ জাল টাকার বান্ডিল ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করত বলে জানা গেছে।

র‌্যাব সিও বলেন, বাড্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা ও সরঞ্জামসহ তৌফিককে গ্রেপ্তার করে। তৌফিক রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। তৌফিকের কাছ থেকে ৫০ লাখ ২৮ হাজার টাকা সমমূল্যের জাল নোট ও জাল টাকা তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। সরঞ্জামের মধ্যে একটি ল্যাপটপ, প্রিন্টার এবং একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। তৌফিক বাড্ডা এলাকায় একটি অভিজাত বাসা ভাড়া নিয়ে জাল নোট তৈরি করতেন।

এর আগে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেছেন, জালনোট কারবারীদের স্বপ্ন রাতারাতি বিশাল বিত্ত বৈভবের মালিক হওয়া। তারা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বের হয়ে পুনরায় একই কাজের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। অতীতেও যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বেলায় একই ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও তারা বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছে। জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজে সম্পৃক্ত হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এখন যাদের আমরা গ্রেপ্তার করছি, তাদের অতীত ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে আগেও বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হয়েছে, তারপর জামিনে রেবিয়ে তারা পুনরায় একই কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছে।

এদের মধ্যে যারা এখন জামিনে আছে তাদেরকে আমরা একটু বেশি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মুদ্রা জালকরণ, প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয়সহ সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও দণ্ডবিধি কয়েকটি ধারায় মামলা করা হলেও পুরোনো আইনের ‘দুর্বল ধারার’ কারণে অপরাধীরা বেরিয়ে যায় বলে এই বিষয়ে নতুন একটি আইনে দাবি উঠে বিভিন্ন মহল থেকে।

এদিকে পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তের মেশিন বসানোর নির্দেশ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়, ব্যাংকগুলোকে কোভিড সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নোট কাউন্টিং মেশিনের মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতাদের পশু বিক্রির টাকা গণনার সুবিধা প্রদান করতে হবে। আরও বলা হয়, সারা দেশের অনুমোদিত কোরবানি পশুর হাটগুলোতে (উপজেলা সদর পর্যন্ত) জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপন করতে হবে। হাট শুরুর দিন হতে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত পশু ব্যবসায়ীদেরকে বিনামূল্যে এ সেবা প্রদান করবে ব্যাংকগুলো। এর আগে ৮ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একই বিভাগ থেকে ইস্যু করা সার্কুলারে বলা হয়, ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অনুমোদিত পশুর হাটগুলোতে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিনের সহায়তায় থাকবে ২১টি ব্যাংকের বুথ।