সংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে আবার ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)।
র্যাব ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ৭টি নতুন কৌশলে জেএমবির সদস্যরা সংগঠিত হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের তিনটি জেলায়। ১৩ টি সংগঠন এবং বিভিন্ন নামে অন্তত ২৯ টি সংগঠনের সাথে সম্পৃত্ততা রয়েছে জেএমবির।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নতুন তথ্য হলো, নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবির সাংগঠনিক আদল বদলেছে। পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান ও আফগানিস্তান ভিত্তিক আল কায়েদার অনুসরণ করছে জেএমবি।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, পার্বত্য অঞ্চলে তেহরিক-ই-তালেবান ও আল কায়েদা সদস্যরা নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, অস্ত্র এবং অর্থায়নও আসছে তাদের কাছ থেকেই।
র্যাব সদর দফতর বাহিনীটির বিভিন্ন ইউনিটের পাঠানো তথ্য থেকে জানা যায়, জেএমবি সদস্যরা ৭টি নতুন কৌশল অবলম্বন করে সংগঠিত হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে তারা নতুন সদস্য সংগ্রহে নেমেছে। এছাড়া, পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপদে তাদের প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ শেষে সমতলে নানা ধরণের ছোটখাট নাশকতা চালিয়ে আবার পাহাড়ে ফিরে যাওয়া, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের সংগঠিত করা, বিদেশি বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা, দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় এবং গোয়েন্দা তথ্য বা কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর কাজ করছে তারা।
পুলিশ জানায়, ‘চার ব্যবসায়ীর অর্থায়নে বান্দরবানের থানচির দুর্গম পাহাড়ে ১০ একর জমির ওপর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ক্যাম্প গড়ে তুলেছে জেএমবি। সেখানে করা পরিকল্পনা অনুযায়ী ঈদুল ফিতরে ফাঁকা রাজধানীতে নাশকতার পরিকল্পনা ছিল তাদের।’
৩১ জুলাই গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া শামীন মাহফুজ, জাহিদুর রহমান ও ইসমাইল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এর আগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ১৯ জানুয়ারি তেহরিক-ই-তালেবানের তিন পাকিস্তানি সদস্যকে আটক করে। তারা হলো মেহমুদ (২৬), ওসমান (২৩) ও ফকরুল হাসান (৫০)। তারা প্রত্যেকেই গাড়িবোমাসহ ১২ ধরনের বোমা তৈরিতে পারদর্শী।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিমুহূর্তে তাদের অভিযান চলছে। বিচ্ছিন্নভাবে জেএমবি মাথাচাড়া দিলেও উদ্বেগের কিছু নেই।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরে জেএমবি একাধিকবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পর মাওলানা সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে প্রথমে তারা চেষ্টা চালায়। এরপরে ভাগ্নে শহীদ ও রমজানের নেতৃত্বেও আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে রুহুল আমিনের নেতৃত্বে চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়।’
‘চলতি বছরের শুরুতে গাজীপুরে পুলিশ ভ্যানে বোমা মেরে জেএমবি আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার পর আলাদা করে জঙ্গি তৎপরতার ব্যাপারে পুলিশ সজাগ আছে।’
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ‘জঙ্গিদের বিরুদ্ধে র্যাব শুরু থেকেই তৎপর। কোনো জঙ্গি জামিন পাওয়ার পরও তার ওপর নজরদারি রাখা হয়।’
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ জানান, বিচ্ছিন্নভাবে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ (হুজি), আনসারউল্লাহ বাংলা টিমসহ সব জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম বিষয়ে আগে থেকেই খোঁজখবর নিচ্ছে র্যাব।
তবে র্যাবের তৎপরতায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো এখনও শক্তভাবে সংগঠিত হতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘তারা এখন বিচ্ছিন্নভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। মাঠপর্যায়ে র্যাবের গোয়েন্দারা জঙ্গিদের নির্মূলে জোরালোভাবে কাজ করছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে।’
র্যাব সূত্রে জানা যায়, বাহিনীটির হাতে নানা সময় গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের এক হাজার ৯২ জন কারাবন্দি রয়েছেন। এর বাইরে পুলিশও কয়েক শতাধিক জঙ্গি গ্রেফতার করে। সব মিলিয়ে দেড় সহস্রাধিক জঙ্গি কারাবন্দি।
এ ক ন জ রে
জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)
১৯৯৮: শায়খ আবদুর রহমান জেএমবি প্রতিষ্ঠা করেন
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০১: সাতক্ষীরায় সিনেমা হল ও সার্কাস প্যান্ডেলে প্রথম নাশকতা চালায়
১ এপ্রিল, ২০০৪: ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ নামে রাজশাহীর তিন উপজেলায় কথিত চরমপন্থী নিধন অভিযানে নামে সংগঠনটি
১৭ আগস্ট, ২০০৫: ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা ফাটিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়
২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০০৫: সরকার জেএমবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে
১৪ নভেম্বর, ২০০৫: ঝালকাঠিতে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে দুই বিচারককে হত্যা
২ মার্চ, ২০০৬: জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান গ্রেফতার
৩ মার্চ, ২০০৭: জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ ছয় জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর
২৫ মে, ২০১০: বর্তমান আমির মাওলানা সাইদুর রহমানকে গ্রেফতার
ঢাকা, ১৬ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ





