'ইমনই ছিল আমার শেষ ভরসা। খুব মেধাবী ছিল ইমন। চিন্তা করেছিলাম ওকে ডাক্তার বানাবো। আমার এই পক্ষাঘাত জীবন অভিশাপ। তাই ছেলেকে ডাক্তার বানিয়ে সাধ পূরণ করার বড় ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বখাটেরা সে স্বপ্ন পূরণ হতে দিল না। ইমনকে হারিয়ে আমার স্বপ্নও আজ পক্ষাঘাতগ্রস্থ।'
কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন মিরপুরে বখাটে কিশোরদের ছুরিকাঘাতে নিহত ১৪ বছরের কিশোর ইমন সরকারের বাবা নজরুল ইসলাম।
বাবার জন্য বিস্কুট কেনার জন্য রোববার রাতে বাসা থেকে বের হয় ইমন। কিন্তু বিস্কুট কিনে ফিরতে পারেনি। তার আগেই বখাটে একদল কিশোরের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায় ইমন।
ইমনের বাবা নজরুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ। ছেলেই দেখভাল করত। বাসা থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে ইমন রিকশা ডেকে দিতো। একই এলাকার মিরাজের সঙ্গে পরিচয় থাকায় ছেলেকে যে প্রাণ দিতে হবে তা কখনো ভাবনায় আসেনি।
২৩ সেপ্টেম্বর ইমনের ১৫ বছর পূর্ণ হবে। এবার খুব ইচ্ছে ছিল ঘটা করে ইমনের জন্মদিন পালন করবো। কিন্তু তার আগেই সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। আগে যদি জানতাম, গলির ছেলেগুলো খারাপ তাহলে ছেলেকে মিশতে দিতাম না।
নজরুল ইসলাম পেশায় একজন ব্যবসায়ী। রমনা ভবন মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। দুই মেয়ে আর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সুখের সংসারই ছিল তার। একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে নজরুল ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন পাগলপ্রায়।
নজরুলের পরিবারই শুধু নয়, মিরপুরের এ ব্লকের বাসিন্দারাও এখন চিন্তিত নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে। ছেলে হত্যার ঘটনায় সোমবার বাবা নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে মিরপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।
মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের এ ব্লকের ২৪/১ নম্বর বাসার নিচতলায় পরিবারের সঙ্গে থাকতো ইমন। সোমবার দুপুরে বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা। লাশ নেয়া হয়েছে ব্লকের ৬ নম্বর গলির ৬ নম্বরের নানিবাড়ির বাসায়।
রাতে আবারো কথা হয় ইমনের বাবা নজরুলের সাথে। তিনি জানান, মিরপুরেই তাদের পারিবারিক গোরস্থান আছে। জানাজা শেষে সেখানেই দাফন সম্পন্ন করে বাসায় ফিরছেন তিনি।
তিন বলেন, ইমন হত্যায় মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। সে মামলায় প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানান তিনি।
পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই মিরপুরের ১০ নম্বরে কিশোর পিয়াস ও মিরাজ গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। মিরাজদের পাশেই ইমনদের বাসা। প্রতিবেশী হওয়ায় মাঝে মধ্যে মিরাজের সঙ্গে মিশতো ইমন। পিয়াস গ্রুপের ৩০ কিশোর মিরাজকে হত্যার টার্গেট করে। এ জন্য রোববার ৬ নম্বর সেকশনে যায়। মিরাজকে না পেয়ে রাস্তায় ইমনকে দেখেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ওরা। এর পর ইমনকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে খুন করে পালিয়ে যায় পিয়াস গ্রুপের কিশোররা।
আর ঘটনার পর কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ রক্তাক্ত ছুরিসহ সুজন নামের এক কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেয়। সর্বশেষ পুলিশ গত সোমবার পিয়াসকেও আটক করে পুলিশ।
মিরপুর মডেল থানা সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর ৬ নম্বর সেকশন এলাকায় কিশোরদের মধ্যে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে নিহত ইমন মিরপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীতে পড়তো। মিরপুরের বাংলা স্কুলে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে মিরাজ। এর পর আর পড়াশোনা করা হয়নি।
মিরাজ জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, পিয়াস ও তার দলবল সমঝোতা করতে রোববার সন্ধ্যায় মিরপুর আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের মাঠে বসেছিল। সেখানে সুরাহা না হওয়ায় উভয় গ্রুপই ক্ষিপ্ত ছিল বলে জানায় মেরাজ। সেকারণে এই হামলার ঘটনা ঘটে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আতাউর রহমান জানান, উঠতি বয়সী ছেলেদের মধ্যে এক ধরনের গ্রুপ তৈরি আছে এখানে। একেক গ্রুপের সঙ্গে একেক গ্রুপের দ্বন্দ্বও তৈরি হয়। আর এই দ্বন্দ্বের কারণে মূলত ইমন হত্যার শিকার হয়েছে। সিনিয়র-জুনিয়র নিয়েই মূলত এই দ্বন্দ্ব জানান এসআই আতাউর।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে হত্যার পরিকল্পনাকারী পিয়াসসহ (১৯) এজাহারভুক্ত দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অপর আসামি সুজনকে (২০) তিনদিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাউদ্দীন আহমেদ বলেন, এখন পর্যন্ত ইমন হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামিসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। টিনএজ দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে মিরপুর আদর্শ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ইমন বলি হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন কিশোর অপরাধীদের তালিকা তৈরি করতে। প্রক্রিয়া চলছে।
ওসি জানান, গত রমজানেও 'সিনিয়র-জুনিয়র' নিয়ে মিরাজ গ্রুপের সাথে পিয়াস গ্রুপের দ্বন্দ্ব হয়। সম্ভবত এ নিয়েই তাদের মধ্যে মনোমালিন্য চলে আসছিল।
ঢাকা, জেইউ, ১৬ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, কেএইচ





