আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার বিষয়ে ব্যক্তিগত ব্লগে আপত্তিকর মন্তব্য করায় আদালত অবমাননার অভিযোগে ব্রিটিশ নাগরিক সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে শুনানি পিছিয়ে ২১ আগস্ট র্নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।

আজ ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না- সে বিষয়ে তার দেওয়া ব্যাখ্যার শুনানির দিন ধার্য ছিল।

আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী মিজান সাঈদ অসুস্থ থাকায় অপর আইনজীবী মোকছেদুল ইসলাম সময়ের আবেদন জানান।

ডেভিড বার্গম্যানের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান সাংবাদিকদের জানান, তারা শুনানির জন্য প্রস্তুত ছিলো।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কতো জন শহীদ হয়েছিলেন এমন প্রশ্ন তুলে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন বিষয়ে ব্যক্তিগত ব্লগে আপত্তিকর মন্তব্যের মাধ্যমে আদালত অবমাননার অভিযোগে ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শাও (শো’কজ) নোটিশ জারি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তিনি এর জবাবে ব্যাখ্যা দিলেও সন্তুষ্ট হননি ট্রাইব্যুনাল। সে কারণে কেন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না- বার্গম্যানের কাছে তার ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ১৭ এপ্রিল ওই ব্যাখ্যা চাওয়া হলে ১৫ জুন আইনজীবীর মাধ্যমে ব্যাখ্যা দেন বার্গম্যান। এ ব্যাখ্যার শুনানি শেষে চূড়ান্ত আদেশ দেবেন ট্রাইব্যুনাল।

ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদের দায়ের করা আদালত অবমাননার অভিযোগের শুনানি শেষে গত ২০ ফেব্রুয়ারির আদেশে ৬ মার্চ হাজির হয়ে তার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে বার্গম্যানকে তলব করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তাকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে তার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে বলেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ১৮ মার্চ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে শো’কজ নোটিশের লিখিত জবাব দেন ডেভিড বার্গম্যান। তার পক্ষে তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান ট্রাইব্যুনালে নোটিশের লিখিত জবাব দেন।

৩১ মার্চ ডেভিড বার্গম্যানের পক্ষে শুনানি করেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান। বাদী হাইকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদের পক্ষে শুনানি করেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাঈদ মিজান।

শুনানি শেষে ১৭ এপ্রিল ডেভিড বার্গম্যানের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন জানিয়ে কেন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তার ব্যাখ্যা চান ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে ১৫ দিনের মধ্যে এর জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন,না হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বর্তমানে ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউএজের বিশেষ প্রতিনিধি। তিনি সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের মেয়ের জামাতা।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের দফতরে ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের আবেদনটি জমা দেন। আবেদনকারী আইনজীবী ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া এবং রায় সম্পর্কে ব্লগে মন্তব্য করায় কেন বার্গম্যানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর (শো’কজ) নোটিশ জারি করা হবে না তা জানতে চাওয়ারও আবেদন করেন।

আবেদনকারী আইনজীবী আবেদনে বলেন,সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে (bangladeshwarcrimes.blogspot.com)আজাদ জাজমেন্ট অ্যানালাইসিস-১;ইন অ্যাবসেন্সিয়া ট্রায়াল অ্যান্ড ডিফেন্স ইনডিকোয়েন্সি এবং আজাদ জাজমেন্ট অ্যানালাইসিস-২; ট্রাইব্যুনাল অ্যাজাম্পশন শীর্ষক বিতর্কিত লেখা প্রকাশ করেন।

এসব লেখায় ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের রায় নিয়ে করা মন্তব্যে ট্রাইব্যুনালের মর্যাদাহানি হয়েছে বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই আইনজীবী তার আবেদনে ডেভিড বার্গম্যানের ব্লগে অপর ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় নিয়ে করা মন্তব্যেও আদালত অবমাননা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার আগে থেকেই এই ব্রিটিশ সাংবাদিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে কাজ শুরু করেন। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে গবেষণা,বিভিন্ন লেখালেখি ও কয়েকটি ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করেছেন ডেভিড বার্গম্যান।

ব্লগে ট্রাইব্যুনাল এবং ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে বিতর্কিত লেখা ছাড়াও বিভিন্ন মহলে তার বিরুদ্ধে জামায়াতের পেইড এজেন্ট হিসেবে কাজ কারার অভিযোগ রয়েছে। ২০১১ সালে আদালত অবমাননার অভিযোগের পর ভারতের তেহেলকাডটকমের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের জামায়াত সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার এবং বিষয়টি দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন,ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার বিষয়ে এ আবেদনের আগেও একবার তাকে সতর্ক করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

২০১১ সালের ২ অক্টোবর জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগ গঠন বিষয়ে ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউএজের সম্পাদকীয় পাতায় বার্গম্যানের ‘আ ক্রুশিয়াল পিরিয়ড ফর আইসিটি’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়।

৩ অক্টোবর আদালত অবমাননার অভিযোগে প্রতিবেদক ডেভিড বার্গম্যান, নিউএজের সম্পাদক নুরুল কবির এবং প্রকাশক আ স ম শহীদুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে এর কারণ দর্শাতে রুল জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। শুনানি শেষে ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল তার আদেশে প্রতিবেদক ডেভিড বার্গম্যানকে সর্বোচ্চ সতর্ক করেন।

সে সময় আদালত অবমাননা হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল শুধুমাত্র ভাবমূর্তির বিবেচনায় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।

ঢাকা, কেএ, ৮ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস