ভিনদেশী অপরাধীদের দেশে আশ্রয় দিতে বিভিন্ন কলা-কৌশলে কাজ করছে ১৫টি সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটগুলো এসব অপরাধীদের দেশে অবস্থানের জন্য তৈরি পোশাক শিল্প, বায়িংহাউস, আইটি ও টেলিকম সেক্টর, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, রেস্টুরেন্ট, প্রিন্টিং প্রেস এবং ফুটবল ক্লাব, ট্রাভেল এজেন্সি ও এনজিওসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করানোর ক্ষেত্রে সর্বত্র সহযোগীতা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এ কাজে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের কতিপয় কর্মকর্তারও সহযোগিতা করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত অবৈধ নাগরিকদের খোঁজখবর নেয়ার ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি রয়েছে। বর্তমানে কত জন বিদেশি নাগরিক দেশে অবস্থান করছে এ বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্যও তাদের হাতে নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনায় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের শেষ নাগাদ বিদেশীদের বাংলাদেশে আগমনে কড়া নজরদারি রাখতে এ বছরের শুরুতেই নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কথা ছিল। ওই নীতিমালার লক্ষ্য ছিল জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদমূলক অপতৎপরতা মোকাবেলা করা।
নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশে আগমনকারী বিদেশী নাগরিকরা গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকবেন। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সাজাও দেয়া যাবে। কিন্তু আদতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সে নীতিমালা প্রণয়ণের বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রতি নানা অপরাধকর্মে বিদেশী নাগরিকদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর আবারও নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অপরাধপ্রবণ বিদেশী নাগরিকদের তালিকা হাতে রাজধানীর বাড়ি বাড়ি অভিযানে নেমেছে র্যা ব-পুলিশ ও এসবি। যেসব দেশের নাগরিক বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাস করছে ইতোমধ্যে সেসব দেশের দূতাবাসগুলোকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশকে মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছেন অবৈধভাবে বসবাসকারী এ বিদেশীরা। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসে কর্মকর্তাদের সহায়তায় অবৈধভাবে থেকে যাচ্ছেন তারা। আর করে যাচ্ছেন একের পর এক অপরাধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকায় কমপক্ষে ১৫টি দেশের সিন্ডিকেট রয়েছে। যারা বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের নিয়ে আসা ও অবৈধভাবে থাকার কাজ করে থাকেন। সিন্ডিকেটগুলো মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অপরাধপ্রবণ বিদেশী নাগরিকদের রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে দিচ্ছেন।
আর এই অভিজাত এলাকায় নিরাপদে থেকে বিদেশী অপরাধীরা প্রতারণা, জাল টাকা তৈরি, মানি লন্ডারিং, মাদক চোরাচালান, মানবপাচার ও দেহ ব্যবসার মতো নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), পুলিশের অপারেশন্স ইউনিট ডিবি ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এ ধরনের সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতারেও অভিযানে নেমেছে।
র্যাব সূত্র জানায়, বিগত কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা এ দেশে প্রবেশ করে মাদকের চালান বিদেশে পাঠিয়ে থাকেন। বিভিন্ন কৌশলে বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে তারা। বিদেশীদের অবৈধ অবস্থানের বিষয়ে প্রশ্রয় দাতাদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে পাকিস্তান ও ভারতের কিছু নাগরিকও আছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। বিশেষ করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও লস্কর-ই-তৈয়বার কয়েকজন জঙ্গি বাংলাদেশে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (ডিবি) শেখ নাজমুল আলম বলেন, অবৈধ বিদেশীদের অনেকেই রাজধানীর বিভিন্ন বাড়িতে ভাড়া থেকে মাদকের ব্যবসা চালান। তারা ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করেন। এরকম প্রায় ২০০ বাড়ির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এরইমধ্যে অনেক বিদেশীকে বাড়ির মালিকরা বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়ে দিয়েছেন। তবে যাদের এ দেশে থাকার বৈধ কাগজপত্র আছে তাদের কোনোভাবে হয়রানি করা হবে না।
র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, অবৈধ বিদেশীদের অবস্থান শুধু গুলশান, বনানী, বারিধারা, রামপুরা বা উত্তরায় নয়, তারা এখন কৌশল হিসেবে রাজধানীর অন্যান্য এলাকায়ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছেন। এসব অবৈধ বিদেশী কাজের নামে এ দেশে এসে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, অনেক বিদেশী অবৈধভাবেই বাংলাদেশে এসেছেন আবার বৈধভাবে এসেও অনেকে অবৈধ হয়ে গেছেন। কারণ কেউ কেউ ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে আর ফিরে যাননি। কেউ আবার ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এসে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বছরের পর বছর অবস্থান করছেন।
তিনি বলেন, র্যাব ভিওআইপি সামগ্রী ও মাদকসহ অসংখ্য বিদেশী নাগরিককে গ্রেফতার করেছে। এদেশে অবৈধভাবে থাকা বিদেশীরা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, যা বিদেশী নাগরিক আইন-১৯৪৬ এর পরিপন্থী।
সম্প্রতি র্যাব-ডিবি পুলিশ ৩১ বিদেশী নাগরিককে অবৈধভাবে অবস্থানের অভিযোগে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে চোরাচালান ও নানা অপরাধের অভিযোগ ছিল। গত মাসের শেষ দিকে ২৫ বিদেশী নাগরিককে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
১২ দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ: ১২টি দেশের অসংখ্য নাগরিকের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে রয়েছে অনেক অভিযোগ। তার মধ্যে নাইজেরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিপাইন, আলজেরিয়া, সুদান, তাঞ্জানিয়া, উগান্ডা, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন অন্যতম। এসব দেশের নাগরিকদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশে প্রতারণার কাজে নিয়োজিত।
অভিজাত এলাকায় বড় বড় অফিস খুলে তারা পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের ভিসা এবং নাগরিকত্ব করিয়ে দেয়ার কথা বলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশী কিছু এজেন্টে এসব বিদেশী নাগরিককে সামনে রেখে অভিনব প্রতারণার জাল বিস্তার করেছে। অসংখ্য প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
বিদেশীদের জন্য ৯টি তথ্য রাখা বাধ্যতামূলক হচ্ছে : নতুন নীতিমালায় কিছু শর্ত জড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। বিদেশীদের সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউজ এবং পুলিশ ও র্যা বকে ৯ ধরণের তথ্য রাখতে হবে।
এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে- হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউসে আগমনকারী বিদেশীর নাম, বাবার নাম, ঠিকানা (পার্সনাল, বিজনেস এবং আবাসিক), নিজ দেশের স্থায়ী ঠিকানা, চাকরি করলে তার বিস্তারিত তথ্য, ই-মেইল ঠিকানা ও ফোন নম্বর, জন্ম তারিখ, পাসপোর্টের ফটোকপি, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, স্থানীয় গাইড বা কন্ট্রাক ব্যক্তির নাম, ঠিকানা এবং স্থানীয় আমন্ত্রণকারীর পূর্ণ পরিচয় ও পাসপোর্ট নম্বর রাখতে হবে। কেউ এসব তথ্য না রাখলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনাসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলো ভ্রমণরত বিদেশীদের তথ্যগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে বলা হবে। কোনো বিদেশী অপরাধে জড়িত থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
জেইউ/ এআর





