বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ছিলেন ওসি সালাউদ্দিন। জঙ্গি দমন, সন্ত্রাসী চিহ্নিতকরণ, মাদকবিরোধী অভিযান, চিরুনি অভিযান ও কথিত সাঁড়াসী অভিযানে বিরোধী নেতা-কর্মী দমনে তিনি সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। এছাড়া গোপালগঞ্জ বাড়ি হওয়ায় দাপটের সঙ্গে কাজ করতেন তিনি।

 ভাল-মন্দ মিলিয়ে সবসময় আলোচনায় ছিলেন ওসি সালাউদ্দিন। কখনো বিরোধীদল দমনে আগ্রাসী ভূমিকা, আবার কখনো চাঁদাবাজি, থানায় এনে মারধর, ক্রসফায়ারে হত্যাসহ বিভিন্নভাবে আলোচনায় ছিলেন  গোপালগঞ্জের এই দাপুটে পুলিশ অফিসার।

দাপুটে ও আগ্রাসী হওয়ায় বিরোধী দলের নেতা কর্মী থেকে শুরু করে সবসময় আধিপত্যবাদী পুলিশ অফিসার হিসেবে তার পরিচিতিও ছিলো বেশ ভালোই। আগ্রাসী মনোভাবের জন্য বেশ কয়েকবার বিভিন্ন অভিযোগেও অভিযুক্ত হয়েছিলেন ওসি সালাউদ্দিন।

২০১০ সালের সেপ্টেম্বেরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়রে এক অভিযোগে বলা হয়, সালাউদ্দনি খানের শেয়ারবাজারে এক কোটিরও বেশি টাকা বিনিয়োগ ছাড়াও নামে-বেনামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ র্অথ আয়ের তদন্ত নথি দুদক থেকে গায়েব হয়ে যায় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। অথচ এর আগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে চিঠি দিয়েছিল দুদক।

এছাড়া ২০১২ সালের ২৯ মে আদালত চত্বরে এক তরুণীর শ্লীলতাহানী এবং সাংবাদিক-আইনজীবীদের বেধড়ক পেটোনোর ঘটনায় ওসি সালাউদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এমনকি ওই তরুণীকে দিনভর কোতোয়ালী থানায় আটকে রেখে ব্যাপক সমালোচিত হন তিনি।

ওই ঘটনায় ওসি সালাউদ্দিনকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।তবে গোপালগঞ্জের প্রভাব ও সরকারের প্রতি আনুগত্যের সুবাদে বার বারই পার পেয়ে যান এই কর্মকর্তা।

ইসলামপুরে দেশীয় নিম্ন মানের কাপড়ে অবৈধভাবে বিদেশী সিল লাগানোর সুযোগ দিয়ে কারখানার মালিক বাবুল ওরফে জাপানি বাবুলের কাছ থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা ঘুষ নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে ওসি সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে।

আগস্ট ২০১২, তার নির্দেশে জগন্নাথ বিশ্বিবিদ্যালয়ের মার্স্টাসের ছাত্র আযহারুল ইসলামকে থানায় নিয়ে হাত পা ভেঙ্গে নখ তুলে উপড়ে ফেলে পুলিশএবং পরেবারের কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবিকরে।

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ছেলে শিক্ষানবিশ আইনজীবী আসিফ মোহাম্মদ জুনায়েদকে মিরপুর থানায় অন্যায়ভাবে আটক করা হলে থানায় যান বাবা অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম। ওসি  দুইজনকেই গ্রেপ্তার করেন।

১৭ র্মাচ ২০১৩, বাবলু নামের এক যুবকের পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেন ওসি সালাউদ্দিন।

১০ এপ্রিল ২০১৩, রাতে কাজীপাড়া থেকে মিল্টন ও শিপন নামে দুই যুবদল কর্মীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেয়ার আধাঘণ্টা পর হাতে পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

২১ অক্টোবর ২০১৩, মিরপুর ন্যাশনাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২২ জন শিক্ষককে একসঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার ভয় দেখিয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নেন।

২৫ অক্টোবর ২০১৩, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং মনিপুর স্কুলের শিক্ষককে পেট্রোলবোমা মারার মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার এবং ব্যাপক হয়রানি করা হয়।

২৬ ডিসেম্বর ২০১৩, ওসি সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ মনিপুরের যুবদল নেতা মামুন ও তার ভাইয়ের বাসা লণ্ডভণ্ড করা হয়। আটক করা হয় মামুনের ভাইয়ের স্ত্রী ও কলেজপড়ুয়া মেয়েসহ কয়েক জনকে। মামুনের প্যারালাইজড ভাইকে লাথি মেরে শিশুপুত্রসহ ঘরে আটকে রাখেন।

২ মে ২০১৪, ব্যবসায়ী শীষ মনোয়ারকে থানায় ডেকে নিয়ে অকথ্য নির্যাতনের পর অপহরণ মামলা দেন তার বিরুদ্ধে।

১২ জুলাই ২০১৪, প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ঝুট ব্যবসায়ী সুজনকে ধানমণ্ডির শংকরের বাসা থেকে আটক করে মরিপুর থানায় বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করে ওসি সালাউদ্দিন। ওই ঘটনায় সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে সুজনের পরিবার হত্যা মামলা দায়ের করেছিল।

২ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ঢাকা বারের সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল ওয়াহিদকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয়।

৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, মেডিকেল কলেজের ছাত্র আব্দুল্লাহ হোসাইনকে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়। খোঁজ নিতে থানায় গেলে ভাই হাসানকেও গ্রেপ্তার করেন ওসি সালাউদ্দিন। তাদের দুইজনকে নিয়ে বাসায় অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেন এবং তাদের অসুস্থ বাবা এনায়েত উল্লাহকে থানায় ধরে নিয়ে যান।

প্রসঙ্গত, ওসি সালাউদ্দিনের বাড়ি গোপালগঞ্জ। ১৯৯০ সালে এসআই হিসেবে পুলিশে যোগ দেন। ২০০৬ সালে পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পান।

২০০৭ সালে হাজারীবাগ থানায় ওসি হিসেবে যোগ দেন। এক-এগারো সরকারের সময় তাকে বদলি করা হয়েছিল রাজশাহী রেঞ্জে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই বদলি হয়ে আসেন ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জ।

২০০৯ সালের ২৯ র্মাচ কোতোয়ালী থানায় যোগ দেন। ২০১২ সালের ১১ আগস্ট বদলি হোন মিরপুর থানায়। চাকরি জীবনে একাধিকবার সাসপেন্ডও হয়েছেন তিনি। সবশেষ তিনি বনানী থানার ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এসএম