‘আমি বন্ধুদের সঙ্গে স্যুপ খাচ্ছি মা। ১০ মিনিটের মধ্যে বাসায় ফিরব।’ নিখোঁজের আগে ১ ডিসেম্বর রাত ৮টা ২০ মিনিটে মা রেহেনা হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে সাফায়েত হোসেন এ কথা বলেছিলেন। 

এর কিছুক্ষণ পর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

শনিবার সাফায়েতের বাবা আলী হোসেন এসব কথা জানান। ঘটনার দিন বনানীর নর্দান ক্যাফেতে সাফায়েতের সঙ্গে তার বন্ধু জায়েন হোসেন পাভেল, সুজন ও মেহেদী হাওলাদারও ছিল।

তারা একইভাবে রহস্যজনক নিখোঁজ। ওই ক্যাফের সিসিটিভির ফুটেজেও এই চার তরুণকে একসঙ্গে দেখা গেছে। তারা এক টেবিলে বসে একসঙ্গে খেয়েছে এবং আড্ডা দিয়েছে।

এ ঘটনার চার দিন পর ৫ ডিসেম্বর বনানী থেকে নিখোঁজ হন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী সাঈদ আনোয়ার খান। এর আগে ২৯ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টের মাটিকাটা এলাকা থেকে ইমরান ফরহাদ নামে এক মেডিকেল শিক্ষার্থী নিখোঁজেরও তথ্য পাওয়া যায়।

এই ছয় তরুণের নিখোঁজের বিষয়ে থানা পুলিশের পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে। তবে এখনও তাদের নিখোঁজের বিষয়ে অন্ধকারে গোয়েন্দারা।

তাদের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে দেখা গেছে, তাদের মোবাইল ক্যাফের কাছের একটি মার্কেটের পাশে থেকে একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে। নিখোঁজদের নিয়ে তাদের পরিবার শংকায় রয়েছে।

এ বিষয়ে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, নিখোঁজ তরুণদের বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। তাদের নিখোঁজের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ তরুণরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ঘর ছেড়েছে নাকি তাদের কেউ অপহরণ করেছে তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নিখোঁজ তরুণদের কেউ কেউ উগ্রবাদে জড়িয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।

সাফায়েতের বাবা আলী হোসেন জানান, নিখোঁজের দিন সোয়া ৭টার দিকে এশার নামাজ আদায় করতে বনানী মসজিদের উদ্দেশে বের হয় সাফায়েত। তার বন্ধু জায়েন হোসেন পাভেল তার সঙ্গে ছিল। ক্লাস সেভেন থেকেই তারা বন্ধু। নামাজ পড়ে তারা নর্দান ক্যাফেতে যায়।

ওই ক্যাফেতে তারা প্রায়ই যায়। নামাজের পরপরই তার বাসায় ফেরার কথা ছিল। ফিরতে দেরি হওয়ায় রাত ৮টা ২০ মিনিটে তার মা মোবাইলে ফোন দেন। তখন সে সাড়ে ৮টায় ফেরার কথা বলে। পরে পৌনে ৯টার দিকে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

ওই সময় পাভেলের পরিবারও তাকে মোবাইল ফোনে পাচ্ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যে পাভেলের মা সাফায়েতের মাকে ফোন দেন। তিনি জানান, একই সঙ্গে দুই বন্ধুর মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে দুই পরিবার। রাতেই তারা বনানী থানাসহ আশপাশের এলাকায় খোঁজ করে।

রাতে তাদের না পেয়ে ভোরে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে যান দুই পরিবারের সদস্যরা। সেখান থেকে তাদের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেয়া হয়। থানায় জিডি করতে গিয়ে দেখেন, তাদের সঙ্গে আরও দুই তরুণ নিখোঁজ।

এদিকে নিখোঁজ পাভেলের বাবা ইসমাইল হোসেন বলেন, ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে তিনি কোনো কিছুই ধারণা করতে পারছেন না। কোনো সংস্থা পাভেল ও তার বন্ধুদের হেফাজতে নিয়েছে কিনা এ বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন।

নিখোঁজ সুজনের স্ত্রী শারমিন আক্তার রিংকি বলেন, নিখোঁজের দিন বিকালে ফোন দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলে সুজন। তার কোনো শত্রু ছিল বলে শুনিনি। তাকে কারা তুলে নিয়ে গেছে কিছুই বুঝতে পারছি না।

মাটিকাটা থেকে নিখোঁজ তরুণ ইমরান ফরহাদের মা সাবিনা ইয়াছমিন বলেন, তার ছেলে ধানমণ্ডির কেয়ার মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। সে মেডিকেলে পড়তে চায় না। এ কারণে রাগ করে বাসা ছেড়েছে বলে তার ধারণা।

মাহমুদ