ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ৭ ছাত্রসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নিবারণ চন্দ্র বর্মণ মঙ্গলবার ৫টার দিকে ঢাকার সিএমএম আদালতে অভিযোগপত্রের মূল নথি দাখিল করেন।
মামলায় ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭জন গ্রেফতার ও একজন পলাতক রয়েছেন।
ঢাকার সিএমএম আদালতের ডেসপাচ শাখার উপ-পুলিশ পরিদর্শক মনিরুল হক ডাবলু চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
চার্জশিটে অভিযুক্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা হলেন,ঢাকার খিলক্ষেত চৌধুরীপাড়ার মো. ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ (২২),ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার পোড়াপাড়া গ্রামের মো. এহসান রেজা ওরফে রুম্মান (২৩),ঢাকার কেরাণীগঞ্জ থানার ধলেশ্বর গ্রামের মাকসুদুল হাসান অনিক (২৩),ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কলেজপাড়ার নাঈম ইরাদ (১৯),চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার হারামিয়া গ্রামের নাফিজ ইমতিয়াজ (২২),ঢাকার কলাবাগান থানার ভুতেরগলির সাদমান ইয়াছির মাহমুদ (২০) ও ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার জয়লস্করের রেদোয়ানুল আজাদ ওরফে রানা(৩০)।
তারা নর্থ সাউথের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি তাদের বহিষ্কার করে।
এ ছাড়াও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন রাহমানির বিরুদ্ধেও চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। রাহমানিকে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
সাদমান ইয়াছির মাহমুদকে গত বছরের ২০ আগস্ট ও বাকিদের ১০ মার্চ গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।
আসামিদের মধ্যে রেদোয়ানুল আজাদ ওরফে রানা ছাড়া বাকি সবাই কারগারে আটক আছেন। রানা পলাতক আছেন। চার্জশিটে তাকে মূল পরিকল্পনাকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।
গ্রেফতার হওয়ার পর গত বছরের ১০ মার্চ রাজীব হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ৫ ছাত্র ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ,এহসান রেজা ওরফে রুম্মান, মাকসুদুল হাসান অনিক,নাঈম ইরাদ,নাফিজ ইমতিয়াজ ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
স্বীকারোক্তিতে আসামিরা রাজীর হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসাবে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রানার নাম প্রকাশ করেন। তারা জানান,রানাই তাদের ব্লগার রাজীবকে হত্যার জন্য মোটিভেট করেন।
এ জন্য তারা দুটি গ্রুপ তৈরি করেন। একটি 'ইনটেল' গ্রুপ ও অন্যটি 'এক্সিকিউশন' গ্রুপ। প্রত্যেক গ্রুপে তিনজন করে ছয়জন সদস্য ছিলেন।  
আসামিরা রাজীবের ব্লগে এবং ফেসবুকে ঢুকে থাবা বাবা ওরফে রাজীবের সংক্রান্ত তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ফেসবুকেই তারা জানতে পারেন,শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে রাজিব আসবেন।
রাজীব শাহবাগে আসলে 'ইনটেল গ্রুপ' তাকে শনাক্ত করেন। এরপর গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা রাজীবকে রেকি করা শুরু করেন।
রাজীবকে চেনার পর ওইদিন ইনটেল গ্রুপের দুই সদস্য রাজীবের সঙ্গে বাসে ওঠেন এবং একজন সাইকেলযোগে বাসে ওঠা রাজীবকে অনুসরণ করে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত যান। তারা রাজীবের বাসা চিনে আসেন।
রাজীবের বাসা চিহ্নিত করার পর ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে নিয়মিত রেকি করা শুরু করেন। এ সময় তারা রাজীবকে হত্যার জন্য ঢাকার নদ্দা থেকে চাপাতি-ছুরি ও নতুন মোবাইলের সিম ও সেট কেনেন।
প্রস্তুতি শেষে ঘটনার দিন এক্সিকিউশন গ্রুপের সদস্যরা বিকাল ৪টার দিকে পল্লবীর পলাশনগরে অবস্থিত রাজীবদের বাসার গলিতে অবস্থান নেন এবং স্কুলব্যাগ,ক্রিকেটের ব্যাট ও বল ইত্যাদি সঙ্গে রাখেন। ক্রিকেট খেলার নামে তারা বল ইচ্ছাকৃতভাবে রাজীবদের বাসায় ফেলে দেন এবং বল আনার নাম করে পুনরায় নিশ্চিত হন সেটি রাজীবের বাসা কিনা।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পৌনে আটটার দিকে রাজীব যখন পল্লবীর বাসার দিকে যাচ্ছিলেন তখন ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে অনুসরণ করেন এবং বাসার গেটের কাছাকাছি পৌঁছার পর এক্সিকিউশন গ্রুপের রানা তাকে রিকশা থেকে ধাক্কা দেন। এরপর ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ চাপাতি দিয়ে রাজীবের দেহ থেকে মস্তক আলাদা করার জন্য কোপ দেন।
এতে আহত হয়ে রাজীব চিৎকার করে দেয়ালের ওপর পড়ে যান। তারপর ফয়সাল রাজীবকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। আসামি অনিকও তার হাতে থাকা ছোরা দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন।
এ সময় কেউ একজন খুন খুন বলে চিৎকার করলে আসামিরা দ্রুত পালিয়ে যান।
রাজীবকে হত্যা করার সময় আসামি দীপের এলোপাতাড়ি কোপের একটি কোপ অনিকের পায়ের জুতোয় লাগে। এতে তার পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের কিছু অংশ কেটে যায়। পরে অনিক রুম্মানের সঙ্গে কাকরাইল এলাকায় জুতা জোড়া খুলে জাতীয় চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদফতরের পুকুর পাড়ে ফেলে যান।
পুলিশ আসামিদের গ্রেফতারের পর সেই জুতা জোড়া ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতি ও চারটি ছোরা শেরেবাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রাস্তার পাশে ড্রেনের মধ্যে থেকে উদ্ধার করে।
ডিবির পুলিশ পরিদর্শক নিবারণ চন্দ্র বর্মণ ছাড়া আরও দুই পুলিশ কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন। তারা হলেন,ডিবির পুলিশ পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম ও পল্লবী থানার এসআই শেখ মতিয়ার রহমান।
রাজীব হত্যাকাণ্ডের ১১ মাসের মাথায় আলোচিত এ মামলার চার্জশিট দাখিল করা হলো। চার্জশিটে ৫৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন,মামলার বাদী ও নিহতের বাবা ডা. নাজিমউদ্দিন,হত্যাকাণ্ডস্থলের আশপাশের লোকজন,পুলিশ ও চিকিৎসক।
চার্জশিটে বলা হয়,জসীমউদ্দীন রাহমানির বই পড়ে এবং সরাসরি তার বয়ান ও খুতবায় অংশ নিয়ে ‘নাস্তিক ব্লগার’দের খুন করতে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হন আধুনিক শিক্ষার এই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ব্লগার রাজীব খুন হন।
রাহমানিকে রাজিব হত্যাকাণ্ডে উৎসাহদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাহবাগ আন্দোলন শুরুর ১০ দিনের মাথায়  গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে ব্লগার রাজীবকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় তার বাবা ডা. নাজিম উদ্দিন বাদী হয়ে পরের দিন ঢাকার পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
[b]ঢাকা, জানুয়ারি ২৮ ( টাইমনিউজবিডি.কম ) // কেএইচ[/b]