ঘটনার দশ বছর পর চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র আটক সংক্রান্ত দু’টি মামলার রায় অবশেষে ঘোষণা হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এসএম মুজিবুর রহমান আজ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করবেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাত ১২টায়।
নগর পুলিশের তৎকালীন উপ-কমিশনার (বন্দর) আবদুল্লাহ হেল বাকী বেতার মারফত সংবাদ পান সিইউএফএল জেটিঘাটে কিছু অবৈধ মালামাল ট্রলার থেকে ট্রাকে উত্তোলন করা হচ্ছে।
ওই দিনই রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে কর্ণফুলী থানার ওসি আহাদুর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দু’টি মাছ ধরা ট্রলার জেটিতে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান।
ওইসময় একটি ক্রেনের সাহায্যে কয়েকজন লোক ট্রলার দু’টি থেকে মালামাল নামিয়ে অবস্থানরত পাঁচটি ট্রাকে বোঝাই করছিলেন। নানা নাটকীয়তার পর পুলিশ অস্ত্র ও গোলাবারুদগুলো আটক করে পরদিন দুপুরে দামপাড়া পুলিশ লাইনে নিয়ে আসে।
অস্ত্র আটকের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সার্জেণ্ট হেলাল উদ্দিনের সাক্ষ্যে পাওয়া গেছে ঘটনার বর্ণণা।
২০১২ সালের ৩০ জুলাই আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে হেলাল জানান, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে ডিসি (পোর্ট) আবদুল্লাহ হেল বাকীর নির্দেশে সার্জেন্ট আলাউদ্দিনকে সহযোগিতা করতে তিনি সিইউএফএল জেটিতে যান।
সেখানে আলাউদ্দিন তাকে জানান, অস্ত্র খালাসকারী দু’জন লোকের একজন নিজেকে হাফিজুর রহমান এবং অপরজন উলফা নেতা আবুল হোসেন বলে পরিচয় দিয়েছে।
মালামালগুলো অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং সরকারের সকল এজেন্সি (গোয়েন্দা সংস্থা) এ মালামালের বিষয়ে অবগত আছে বলে তিনি শুনেছেন বলেও হেলালকে জানান।
হেলাল ঘটনাস্থলে গিয়েই মালামালের দাবিদারের সহযোগী ৫ জনকে আটক করে বন্দর পুলিশ ফাঁড়িতে পাঠিয়ে দেন। ডিসি (পোর্ট) আবদুল্লাহ হেল বাকি ঘটনাস্থলে গেলে আবুল হোসনকে তার কাছে নিয়ে যান সার্জেণ্ট হেলাল ও আলাউদ্দিন। এসময় বাকি ও আবুল হোসেন দূরে গিয়ে কথা বলতে থাকেন। পরে আবুল হোসেনকে আর ঘটনাস্থলে দেখতে পাইনি।
মামলার তদন্ত চলাকালীন সময়ে ওই আবুল হোসেনকে পরে টিআই প্যারেডে এনএসআই’র উপ-পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর লিয়াকত হোসেন হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন হেলাল উদ্দিন।
সাক্ষ্যে হেলাল জানায়, ঘটনাস্থল থেকে তিনি যে পাঁচজনকে আটক করেছিলেন তাদের পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে ছেড়ে দেয়া হয় বলে শুনেছেন।
আবুল হোসেন নামধারী লিয়াকতকেও বাবরের নির্দেশে ছেড়ে দেয়া হয় বলে আদালতে যুক্তি উপস্থাপনকালে বলেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
পুলিশের জব্দ তালিকা অনুযায়ী দশ ট্রাক অস্ত্রের মধ্যে ছিল ৬৯০টি এসএমজি (৫৬-১) ও ২৭৯২টি ম্যাগজিন, ৬০০টি এসএমজি (৫৬-১) ও ৪০০টি ম্যাগজিন, ১৫০টি রকেট লাঞ্চার, ৪০০টি নাইন এম এম সেমি অটোমেটিক স্পার্টিং রাইফেল ও ৮০০টি ম্যাগজিন, ১০০টি টমিগান ও ৪০০ ম্যাগজিন, ২০০০ লাঞ্চিং গ্রেনেড টিউব, ১৫০টি সাইড ফর রকেট লাঞ্চার, ৫১২টি ৭.৬২ বোরের এসএমজি ও ৩৯ হাজার ৬৮০ রাউণ্ড গুলি, ১৭৬টি ৭.৬২ বোরের পিস্তল ও চার লক্ষ টমিগানের গুলি, ২৪ হাজার ৯৯৬টি হ্যাণ্ড গ্রেনেড, ৮৪০টি ৪০ এম এম রকেট, এলিনকো ওয়াকিটকি সেট এবং অস্ত্র সংরক্ষণের বিভিন্ন সরঞ্জাম।[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1391055902.jpg[/img]
এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ট্রাক, এমভি খাজার দান ও এমভি শাহ আমানত নামে দু’টি মাছ ধরার ট্রলার, ২০ কেজি ওজনের ৮৭টি লবণের বস্তা, ৩০টি ধানের তুষের বস্তা, ২০টি ১০ কেজি ওজনের চাউলের বস্তা।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) জেটিঘাটে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি খালাসের সময় ধরা পড়ে। এমভি শাহ আমান ও এমভি খাজার দান নামে দু’টি ফিশিং ট্রলার থেকে অস্ত্রগুলো খালাসের সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ গিয়ে সেগুলো আটক করে।
এ ঘটনায় কর্ণফুলী থানার তৎকালীন ওসি আহাদুর রহমান বাদি হয়ে অস্ত্র আইনের ১৯ (ক) ধারায় ৪৩ জনকে এবং চোরাচালানের অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ (বি) ধারায় ৪৫ জনকে আসামী করে পৃথক দু’টি মামলা মামলা দায়ের করেন।
এতবড় অস্ত্রের চালান খালাসের ঘটনায় বিস্ময়করভাবে আসামী করা হয় ট্রলার মালিক, ঘাট শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, ট্রলারের সারেং, স্থানীয় ইউপি সদস্য, এলাকার সাধারণ মানুষকে। দায়েরের পর দু’টি মামলা তদন্তের দায়িত্ব নিজেই নেন ওসি আহাদুর রহমান।
পরবর্তীতে বাদি ও তদন্তকারী কর্মকর্তা একই ব্যক্তি নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হলে তদন্তভার ন্যস্ত হয় সিআইডির কাছে। ২৬ এপ্রিল তদন্তভার নেন সিআইডির এএসপি কবির উদ্দিন।
দু’মাস তদন্তের পর ২০০৪ সালের ১১ জুন সিআইডির এএসপি কবির উদ্দিন অস্ত্র আটক মামলায় ৪৩ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন।
একই বছরের ৯ নভেম্বর সিআইডির এএসপি নওশের আলী খান চোরচালান মামলায় ৪৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন।
কিন্তু তৎকালীন মহানগর পিপি ও বিএনপি নেতা আব্দুস সাত্তার অস্ত্র আটক মামলার অভিযোগপত্রের উপর নারাজি দেন। তার যুক্তি, ট্রাকগুলো যে পরিবহন কোম্পানি থেকে ভাড়া করা হয়েছিল তার মালিককে আসামী কিংবা সাক্ষী করা হয়নি। এছাড়া অস্ত্র খালাসের সঙ্গে আবুল হোসেন নামে একজনের সম্পৃক্ততার বিষয় প্রকাশ পেয়েছিল। তার বিষয়েও কোন তদন্ত হয়নি।
আব্দুস সাত্তারের আবেদনের প্রেক্ষিতে সিআইডির এএসপি নওশের আলী খান পুন:তদন্ত করে অস্ত্র আটক মামলায় ২০০৪ সালের ২৫ আগস্ট আরও এক দফা অভিযোগপত্র দেন। কিন্তু তাতে আসামীর সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয়নি।
শুধুমাত্র ট্রাকের মালিক প্রতিষ্ঠান গ্রীণওয়েজ ট্রান্সপোর্টের মালিক হাবিবুর রহমানকে সাক্ষী করা হয়।
এরপর ২০০৫ সালের ২৩ এপ্রিল অস্ত্র আটক মামলায় এবং ২০০৪ সালের ৩০ নভেম্বর চোরাচালান মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
২০০৫ সালের ৬ জুলাই দু’মামলায় বাদি আহাদুর রহমান প্রথম সাক্ষ্য দেন।[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1391055970.jpg[/img]
২০০৭ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ চলে। তখন পর্যন্ত অস্ত্র আটক মামলায় ৩১ জন এবং চোরাচালান মামলায় ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
সেনাসমর্থিত তত্তাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের তৎকালীন কৌসুলী ও অতিরিক্ত মহানগর পিপি হুমায়ন কবির রাসেল মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবেদন করেন।
সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত অস্ত্রের উৎস, গন্তব্য, অস্ত্রের ধরণ, চালান থেকে অস্ত্র খোয়া গিয়েছিল কিনা, কাদের জন্য অস্ত্র আনা হয়েছিল, কোন জলযানে অস্ত্র ঢুকেছিল-এ ধরনের সাতটি পর্যবেক্ষণসহ অধিকতর তদন্তেরে আদেশ দেন।
সিআইডির এএসপি ইসমাইল হোসেন প্রথম দফা অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পেলেও তিনি তদন্ত শেষের আগেই বিদায় নেন। পরে সিআইডি’র চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিনিয়র এএসপি মনিরুজ্জামান চৌধুরী ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি তদন্তভার গ্রহণ করেন।
মনিরুজ্জামানের তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নাম, উলফার প্রসঙ্গ, একের পর এক স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর বিষয়।
অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২৬ জুন দু’টি মামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান।এতে দু’ মামলায় নতুনভাবে ১১ জনকে আসামী হিসেবে অর্ন্তভুক্ত করা হয়।
সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের পর নতুন ১১ জনসহ অস্ত্র আইনের মামলায় আসামীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪ জনে এবং চোরাচালান মামলায় আসামী হয় ৫২ জন। কিন্তু উভয় মামলায় আসামী হিসেবে থাকা চারজনের ইতোমধ্যে মৃত্যু হয়।
মৃত্যুবরণ করা চার আসামী হলেন, ইয়াকুব আলী, মুনির আহমেদ, আতাউর রহমান ও আবুল কাশেম মধু।
২০১১ সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান দু’টি মামলার আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। ২৯ নভেম্বর থেকে দুই মামলায় একযোগে পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
টানা দুই বছর ধরে সাক্ষ্যগ্রহণের পর ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর তদন্তকারী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের জেরা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করেন আদালত।
অস্ত্র মামলায় মোট ৫৬ জন এবং চোরচালান মামলায় মোট ৫৩ সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। এর মধ্যে অধিকতর তদন্তের আগে অস্ত্র মামলায় সাক্ষ্য দেন ৩১ জন এবং চোরাচালান মামলায় সাক্ষ্য দেন ২৮ জন। দুটি মামলায় পাঁচজন দুই দফা সাক্ষ্য দেন। উভয় অভিযোগ পত্রে পৃথকভাবে ২৬৫ জন সাক্ষী হিসেবে ছিলেন।
[b]ঢাকা, জানুয়ারি ৩০ (টাইমনিউজবিডি.কম) // জিই
[/b]
অপরাধ
দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার ধারাবাহিকতা
ঘটনার দশ বছর পর চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র আটক সংক্রান্ত দু’টি মামলার রায় অবশেষে ঘোষণা হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এসএম মুজিবুর রহমান আজ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করবেন।





