মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধেরদায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭তম সাক্ষীশহীদপুত্র (রুস্তম শেখ) আলী রানা শেখ। সাক্ষী বলেন, মসজিদের সামনে আমার চাচা জব্বার শেখ সোবহানের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়লে এক পর্যায়ে সোবহানের নির্দেশে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এরচেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চে সাক্ষ্য দেন আলী রানা শেখ।সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন সোবহানের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম।
আলী রানা শেখ আদালতে বলেন, মাওলানা সোবহানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা আমাদের বাড়িতে ঢুকে বাবা রুস্তম শেখ,চাচা জব্বার শেখ,নুরুল শেখ,সিরাজ শেখ,আব্দুল মজিদ শেখ ও তালেব শেখকে ধরে ভাড়ারা শাহী মসজিদের সামনে নিয়ে যায়। এছাড়াও গ্রামের দিলবার শেখ,গেদম সরদার,খোকন শেখ ও তার ছেলে কাদের শেখ,হাকিম সরদার,কেতা সরদার,আকবর শেখ,হারুন অর রশিদ শেখসহ আরও অনেককে ধরে এনে মসজিদের সামনে জড়ো করে।
মসজিদের সামনে আমার চাচা জব্বার শেখ সোবহানের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়লে এক পর্যায়ে সুবহানের নির্দেশে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী আলী রানার বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা গ্রামে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১২/১৩ বছর। তিনি তার সাক্ষ্যে স্বচক্ষে দেখাছেন দাবি করেবাবা-চাচাকে হত্যাসহ সোবহানের বিরুদ্ধে অপরাধের বর্ণনা দেনন।
আলী রানা বলেন,১৯৭১ সালের ৫ জ্যৈষ্ঠ সকাল আটটার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের গ্রাম ঘেরাও করে। মাওলানা সুবহানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা তাদের বাড়িতে ঢুকে বাবা রুস্তম শেখ,চাচা জব্বার শেখ,নুরুল শেখ,সিরাজ শেখ,আব্দুল মজিদ শেখ,তালেব শেখকে ধরে ভাড়ারা শাহী মসজিদের সামনে নিয়ে যায়।
এছাড়াও গ্রামের দিলবার শেখ,গেদম সরদার,খোকন শেখ ও তার ছেলে কাদের শেখ,হাকিম সরদার,কেতা সরদার,আকবর শেখ,হারুন অর রশিদ শেখসহ আরো অনেককে পাকিস্তানি সেনারা ধরে এনে মসজিদের সামনে জড়ো করে।
ভাড়ারা শাহী মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে এসব দেখেছেন দাবি করে সাক্ষী বলেন, মসজিদের সামনে আমার চাচা জব্বার শেখ সোবহানের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়লে এক পর্যায়ে সোবহানের নির্দেশে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।বাবা-চাচাদের ধরে আনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম।
এছাড়া সোবহানের নির্দেশে এদিন পাকিস্তানি সেনারা গ্রামের কালি কোমল পালকেও হত্যা করে বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন সাক্ষী।
তিনি বলেন,ভাড়ারা শাহী মসজিদের সামনে থেকে চাচা জব্বার শেখকে হত্যা করার পর আটক ১০/১২ জনকে সেখান থেকে পাকিস্তানি সেনারা গাড়িতে করে নূরপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে রাতভর তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়। পরদিন সেখান থেকে আটকদের আটঘরিয়া থানার দেবোত্তর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে নির্যাতনের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়া সিরাজকে (অন্য একজন) ছেড়ে দেওয়া হয় এবং বাকিদের বাঁশবাগানের কাছে নিয়ে এলোপাথাড়ি গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে ৬ জনের মৃত্যু হয়।
সাক্ষী বলেন,সোবহানের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনারা ঘটনাস্থল ছেড়ে গেলে স্থানীয় লোকজন আমার বাবাকে (রুস্তম শেখ) একদন্ত গ্রামে নিয়ে যান। বাবা বাড়িতে আসার ৫/৬ দিন পর মারা যান। এছাড়া নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে ছাড়া পাওয়া সিরাজ শেখ বাড়িতে আসার এক দেড় মাস পর মারা যান।
নূরপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ে আটকদের ওপর নির্যাতন ও পরবর্তীতে আটঘড়িয়ার দেবোত্তর গ্রামের বাঁশবাগানের পাশে নিয়ে গুলি করে হত্যার ঘটনা সাক্ষী বাবা রুস্তম শেখ ও গ্রামের সিরাজ শেখের কাছে শুনেছেন বলেও সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন রানা।
সাক্ষ্য দেয়ার শেষ পর্যায়ে সাক্ষী আলী রানা অভিযুক্ত আব্দুস সোবহানের আসামির কাঠগড়ায় শনাক্ত করেন।
গত ১ এপ্রিল সুবহানের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন।
গত ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-১ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করেন।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর গণহত্যা,হত্যা,অপহরণ,আটক, নির্যাতন,লুটপাট,অগ্নিসংযোগ ও ষড়যন্ত্রসহ ৮ ধরনের ৯টি মানবতাবিরোধী অপরাধে সুবহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার সোবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৮তম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেনট্রাইব্যুনাল।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সকালে টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে সুবহানকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সোমবার সোবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৮তম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেনট্রাইব্যুনাল।
ঢাকা, কেএ, ২৯ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ





