মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার শান্তি (পিস)কমিটির চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের নবম সাক্ষী আহমেদ মিয়া (৬০)।

সাক্ষ্য দানকালে তিনি বলেন-ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার তুষখালী বাজারে শান্তি কমিটির সভায় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস ও মোতালেব শরীফকে জীবিত অথবা মৃত ধরে আনার জন্য রাজাকারদের নির্দেশ দেন।

জব্বারের নির্দেশ পেয়ে ওইদিন বিকেলে রাজাকাররা ফুলঝুড়ি গ্রামে রাজ্জাক বিশ্বাস ও মোতালেবের বাড়ি ঘেরাও করে। মোতালেব পালাতে গিয়ে রাজাকারদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। রাজ্জাক বিশ্বাসকে ধরে এনে নাভির নিচে গুলি করে রাজাকাররা। তিনদিন পর মারা যান তিনি।

বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন আহমেদ মিয়া।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল হাসান।

বৃহস্পতিবার জব্বারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দশম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

সাক্ষ্যে আহমেদ বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছাত্র ছিলেন। বর্তমানে তিনি তুষখালী বাজারে ব্যবসা করেন।শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাসের বাড়ি ছিল তার বাড়ির উত্তরে এবং দক্ষিণে ছিল শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব শরীফের বাড়ি।

তিনি বলেন, ফুলঝুড়ি গ্রামের রাজ্জাক বিশ্বাস ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। সে বছর ফেব্রুয়ারি মাসে তিন মাসের ছুটিতে বাড়িতে আসেন। ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় চাকরিতে যোগ দিলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে বদলি করা হয় তাকে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রাজ্জাক বিশ্বাস দুলাল ওরফে দুলুকে নিয়ে গ্রামে চলে আসেন। একই সময় মোতালেব শরীফও কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে গ্রামে আসেন। এ দু’জন গ্রামে আসার পর মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়।

তখন তিনিসহ গ্রামের ২০-২৫ জন যুবক রাজ্জাক বিশ্বাস ও মোতালেব শরীফের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। সে সময় পিরোজপুর মহকুমায় শান্তি কমিটি গঠন করা হলে অভিযুক্ত জব্বার ইঞ্জিনিয়ার মঠবাড়িয়া থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হন।  

সাক্ষী আরো বলেন, পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ১৬ মে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার তুষখালী বাজারে শান্তি কমিটির সভা করেন। সেই সভা থেকে ফুলঝুড়ি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস এবং মোতালেব শরীফকে জীবিত অথবা মৃত ধরে আনার জন্য রাজাকারদের নির্দেশ দেন তিনি।

জব্বারের নির্দেশ পেয়ে ওইদিন বিকেলে রাজাকারা ফুলঝুড়ি গ্রামে রাজ্জাক বিশ্বাস এবং মোতালেব শরীফের বাড়ি ঘেরাও করে। মোতালেব শরীফ পালাতে গিয়ে রাজাকারদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন।

রাজ্জাক বিশ্বাসকে ধরে এনে নাভির নিচে গুলি করে রাজাকাররা। মৃত্যু হয়েছে ভেবে রাজ্জাককে ফেলে রেখে চলে যায় তারা। তিনদিন পর মারা যান তিনি।

সাক্ষী আহমেদ মিয়া বলেন, পরদিন অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ১৭ মে সকালে জব্বার ইঞ্জিনিয়ারের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের একটি দল পুনরায় ফুলঝুড়ি গ্রাম আক্রমণ করে। সেদিন ফুলঝুড়ি গ্রামের সারদা পাইককে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। এছাড়া আব্দুর রাজ্জাক এবং মোতালেব মোল্লার বাড়িসহ গ্রামের তিন শতাধিক বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

এ ঘটনার ১০-১২ দিন পর অভিযুক্ত জব্বারের নির্দেশে রাজাকাররা আবার ফুলঝুড়ি গ্রামের পাইক বাড়িতে এসে আনুমানিক ২০০ হিন্দু লোককে ধরে এনে জোরপূর্বক ধর্মান্তর করে। পাইক বাড়িতে রাজাকাররা মসজিদ বানায় এবং হিন্দু মেয়েদের জোর করে মুসলিম ছেলেদের সঙ্গে বিয়ে দেয়।

সাক্ষী উল্লেখ করেন, রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের কারণে তিনিসহ গ্রামের অধিকাংশ লোক গ্রাম ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। দেশ স্বাধীন হলে আরো অনেকের সঙ্গে দেশে ফিরে আসেন। আসামি জব্বার ইঞ্জিনিয়ারকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন।

গত ৭ সেপ্টেম্বর শুরুর পর থেকে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন আরও ৮ জন সাক্ষী। তারা হচ্ছেন শোয়েবুর রহমান গুলদার, আব্দুল কুদ্দুস মাতুব্বর, আবুল মেকার, সিদ্দিক মাতুব্বর, আবুল কালাম শরীফ, শহীদ পরিবারের সদস্য সন্তোষ কুমার মিত্র, শহীদজায়া নূরজাহান বেগম ও শহীদ পরিবারের সদস্য মোজাম্মেল হক শরীফ।

গত ১৪ আগস্ট আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

জব্বারের বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগে ৩৬ জনকে হত্যা, ২শ’ জনকে ধর্মান্তরিতকরণ এবং লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে ৫শ’ ৫৭টি বাড়ি-ঘর ধ্বংস করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এর আগে গত ২০ জুলাই জব্বারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ঋষিকেশ সাহা। অপরদিকে অভিযোগ গঠনের বিরোধিতা করে শুনানি করেন তার পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান।

গত ৮ জুলাই পলাতক অবস্থায় বিচার শুরু করার জন্য আসামি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের পক্ষে মোহাম্মদ আবুল হাসানকে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ১২ মে ইঞ্জিনিয়ার জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনীত ৫টি অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। তবে এখনো তাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করতে না পারায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার কাজ চলার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের শ্বশুর ছিলেন স্থানীয় মুসলীম লীগ নেতা। আর জব্বার ছিলেন থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।

ঢাকা, কেএ, ২৪ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ