তনু হত্যাকাণ্ডতনু হত্যাকাণ্ডকুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে কে বা কারা খুন করেছে, কেন খুন করেছে—গত পাঁচ মাসেও তা উদ্ঘাটন করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি। তনুর পোশাক থেকে ধর্ষণের আলামতসহ যে তিন ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা পাওয়া গেছে, তা-ও গত সাড়ে তিন মাসে সন্দেহভাজন কারও সঙ্গে মেলাতে পারেনি সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। এরই মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম অসুস্থতার কথা বলে এ মামলার তদন্ত থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। সম্প্রতি মামলার নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ১১ জুলাই তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. নাজমুল করিম খানকে রাজশাহীর বদলি করা হয়।
তনুর মা আনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তের ধীরগতি দেখে তাঁরা হতাশ। পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে, এখন পর্যন্ত
আসামিদের শনাক্ত করতে পারেনি সিআইডি। তিনি বলেন, সন্দেহভাজন হিসেবে তিনি যাঁদের নাম বলেছেন, যাঁদের নাম গণমাধ্যমে এসেছে, অবিলম্বে তাঁদের ডিএনএ পরীক্ষা করে তনুর মরদেহে ও পোশাকে পাওয়া ডিএনএ নমুনা মেলানো হোক।
এ বিষয়ে মামলার নতুন তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. শাহরিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিএনএ প্রোফাইল মেলানোর জন্য আলোচনা চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য কাজ চলছে। ডিএনএ প্রোফাইল মেলানোর জন্য প্রস্তাব দেওয়া হবে। সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব।’
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহরিয়ার রহমান বলেন, ‘এখনো কিছু কিছু ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে ডিএনএ মেলানোর কাজ চলছে। আমরা সেই চেষ্টা করছি। সিআইডির আগের কর্মকর্তা অসুস্থ থাকার কারণে ১০ দিন তদন্তের গতি কম ছিল। এখন গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’
এর আগে গত ১৬ মে রাতে মামলার তৎকালীন তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. নাজমুল করিম খান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তনুর ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তনুর পরনে থাকা পোশাক পরীক্ষা করে পৃথক তিন ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা পাওয়া গেছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডিএনএ পরীক্ষা করে এসব নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে।
এরপর সাড়ে তিন মাস পার হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য দায়িত্ব পাওয়া তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলার ধারাবাহিক তদন্ত চলছে। আমরা আসামিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। সংশ্লিষ্টতা পেলেই ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। এখনো আমরা আসামি শনাক্ত করতে পারিনি।’
মামলা বাদী তনুর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহকারী ইয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই। কোনো গড়িমসি দেখতে চাই না।’
গত ২০ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু খুন হন। ওই দিন রাতে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের ভেতরের একটি ঝোপ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন লাশের প্রথম ময়নাতদন্ত হয়। ওই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা যায়নি। ওই প্রতিবেদন নিয়ে তখন ব্যাপক বিতর্ক হয়। তনুর মাথার পেছনের জখম, গলার নিচের আঁচড়ের দাগের কথা গোপন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত হয়। লম্বা সময় ক্ষেপণ করার পর যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়, সেটা আগের প্রতিবেদনেরই আদলে। তা নিয়েও বিতর্ক ওঠে।
তনুর হত্যার বিচারের দাবিতে ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করে।
দীর্ঘ পাঁচ মাসেও তনুর খুনি শনাক্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণজাগরণ মঞ্চ কুমিল্লার অন্যতম সংগঠক খায়রুল আনাম রায়হান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তনু ও তনুর পরিবারের দুর্ভাগ্য যে মেয়েটার লাশের ঠিকমতো সুরতহাল হলো না। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও ছিল সাজানো। ফলে এ মামলা নিয়ে আমরা খুব দুশ্চিন্তায় আছি। বিচারের অপেক্ষায় আছি।’





