গতকাল বিকাল থেকে মধ্যরাত পযন্ত ঢাকার বনানী, মতিঝিল, ফকিরাপুল ও গুলিস্তানের ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। অভিযান পরিচালনা করে র‍্যাবের মোট পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেট। বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্যাসিনোতে অভিযান এবারই প্রথম।

ঢাকায় যতগুলো আধুনিক বৈদ্যুতিক ক্যাসিনো জুয়ার বোর্ড আছে, সেগুলো অপারেট করতে চীন ও নেপাল থেকে অভিজ্ঞ লোক আনা হয়েছে। তারাই এই বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করে। বিনিময়ে প্রতি মাসে বেতন পায় তারা। বুধবারের অভিযানের পর এরকম কয়েকজন নাগরিকের পাসপোর্ট ও নাম ঠিকানা পাওয়া গেছে।

র‍্যাব জানায়, বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত ঢাকার মোট চারটি ক্যাসিনোতে একযোগে অভিযান চালানো হয়েছে। এতে গ্রেফতার হয়েছে মোট ২০১ জন। এর মধ্যে মতিঝিলের ইয়াংমেন্স ক্লাব থেকে ২৪ লাখ ২৯ হাজার নগদ টাকাসহ ১৪২ জনকে আটক করা হয়। বনানীর আহম্মেদ টাওয়ারে অবস্থিত গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামক ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‍্যাব। কাউকে না পেয়ে ক্যাসিনোটি সিলগালা করা হয়।

র‍্যাব আরও জানায়, মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ১০ লাখ ২৭ হাজার টাকা, ২০ হাজার ৫০০ জাল টাকাসহ ক্যাসিনোটি গুড়িয়ে দেয়া হয়। গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬০০ টাকাসহ ক্যাসিনো পরিচালনা ও খেলার অভিযোগে মোট ৪০ জনকে আটক করা হয়। এছাড়া এ অভিযানে বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেফতার মোট ২০১ জনের মধ্যে ৩১ জনকে ১ বছর করে এবং বাকিদের ৬ মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন র‍্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট।

বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকাল থেকে মধ্যরাত পযন্ত ঢাকার বনানী, মতিঝিল, ফকিরাপুল ও গুলিস্তানের ক্যাসিনোতে অভিযান অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব-৩ ও ১। ক্রীড়া সংগঠনের নামের আড়ালে এসব ক্যাসিনোর ভেতরের রঙিন আলো ও আধুনিক সাজসজ্জা দেখলে যেকারও চোখ ঝলসে যাবে। এসি রুমের এসব ক্যাসিনোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনভাবে করা, যাতে সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতেই ভয় পায়।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, “আমরা ক্যাসিনোতে চীন ও নেপালি নাগরিকদের পেয়েছি। এখানে তারা চাকরি করেন বলে জানিয়েছে। তবে সত্যি তাদের ওয়ার্ক পারমিট আছে কিনা, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।”

এর আগে, বুধবার বেলা ৩টার দিকে প্রথমেই মতিঝিল থানার পেছনে ফকিরাপুল এলাকার ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযান চালায় র‌্যাব। সেসময় কয়েকজন চীনা ও নেপালি নাগরিককে সেখানে পাওয়া যায়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তাদের তথ্য রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে নেপালের ২জনার নাম হলো ভূপেস ও সঞ্জয়। তারা ক্যাসিনোতে কাজ করেন।

অভিযানে র‌্যাবের হাতে মেঘা ও লিজা নামের দুই তরুণী আটক হলেও তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ক্যাসিনোতে তারা ‘ডিলার’পদে চাকরি করেন বলে জনিয়েছেন।

লিজা বলেন, “ক্যাসিনোতে দুই সিফটে জুয়া খেলা হয়। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা এবং রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা। জুয়ার বোর্ডগুলো চীনা নাগরিকরা চালু করে। নেপালিরা বোর্ড পরিচালনা করে। তারা এগুলো অপারেট করতে দক্ষ।” লিজা আরও বলেন, “আমরা মাসিক ও দিন হিসেবে এখানে চাকরি করি। আমরা কখনও রিসিপশনে, কখনও বোর্ডে দায়িত্ব পালন করি।”

মেঘা বলেন, “প্রতি শিফটে ৭০-৮০ জন মানুষ খেলে। কখনও বেশিও আসে। তবে রাতের বেলায় বেশি মানুষ থাকে।”সেখানে অনেকে মাদক সেবন করে বলেও তারা জানিয়েছে।

 

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রে ক্যাসিনো

 

এই ক্লাবটি থেকে ৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জন স্টাফ। সবাইকে ছয় মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম।

 

ক্লাবটি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নগদ টাকা, মদ, বিয়ার ও হেরোইনের মতো দেখতে পাউডার, কষ্টি পাথর। এই ক্লাবের ভেতরে ৭টি জুয়ার বোর্ড পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ২টি কক্ষে রয়েছে ভিআইপিদের জন্য আলাদা ২টি বোর্ড।

 

গুলিস্তানের এই ক্লাবটির প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই নামাজের ঘর। তারপর ক্যাসিনোর কক্ষ। ক্যাসিনোর কক্ষের পর রয়েছে যুবলীগ নেতার ইসমাঈল হোসেন সম্রাটের কক্ষ। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ছবি টাঙানো রয়েছে। ছোট ছোট কক্ষের ভেতরে বিছানা পাতানো দেখা গেছে। সিন্দুকের লকার ভেঙে র‌্যাব উদ্ধার করেছে নগদ টাকা।

 

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, “ক্রীড়া সংগঠনের আড়ালে এসব ক্লাবে গড়ে তোলা হয়েছে ক্যাসিনো এবং মাদকের আখড়া।”

 

এমবি