আশুলিয়ায় কাজলী (৪০) নামে এক হিজড়া সর্দারের অগ্নিদগ্ধ লাশ তার নিজ বাড়ির একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। কাজলী আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করেছে এ নিয়ে মাঠে নেমেছে পুলিশ। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সিআইডি ক্রাইম-এর সদস্যরা। এ রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে হিজড়া, এলাকাবাসী ও পুলিশের পৃথক পৃথক ধারণা রয়েছে।
রোববার সকাল ৮টায় আশুলিয়ার ফ্যান্টাসি কিংডমের দক্ষিণ পাশে চিত্রশাইল কান্দাইল নয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ির একটি নির্মাণাধীন ৩য় তলা ভবনের নিচতলায় তার বসবাসরত কক্ষ থেকে কাজলীর দগ্ধকৃত লাশটি উদ্ধার করে বাড়িটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে ঢাকা জেলা এডিশনাল এসপি ক্রাইম সাইদুর রহমান পরিদর্শন করেছেন।
কে এই কাজলী?
কাজলীর আসল নাম মোহর আলী। মোহর আলী ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর থানাধীন সামন্ত পটিয়াপাড়া এলাকার মৃত হুজুর আলীর ছেলে। তার স্ত্রীর নাম কুটি বেগম, মেয়ের নাম মরিয়ম (২২)। তার আপন ভাগনী মধুমালা (২০)। মধুমালা আশুলিয়ার বেরন এলাকার একটি পোশাক কারখানায় অপারেটর পদে চাকরি করে। সে দক্ষিণ গাজীরচট রশিদ মার্কেট সংলগ্ন একটি বাড়িতে ভাড়া থেকে চাকুরি করে। কাজলীর অগ্নিদগ্ধ লাশ উদ্ধারের পর সে তার মামার খোঁজে চিত্রশাইল নয়াপাড়া এলাকার কাজলীর নির্মাণাধীন বাড়িতে গিয়েছিল। পরে আশুলিয়া থানায় এসে একটি ইউডি মামলার বাদি হন মধুমালা।
এ ব্যাপারে মধুমালা জানান। প্রায় ১৭ বছর পূর্বে মোহর আলী ঢাকায় আসে। এরপর থেকে সে আস্তে আস্তে নারীদের রূপ ধারণ করা শুরু করে। একপর্যায়ে নারীদের পোশাক পড়া শুরু করেন। এরপরও মোহর আলী তাদের বাড়ির এবং স্বজনদের নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন। পরে হিজড়া হিসেবে পরিচয় ধারণ করে নাম রাখেন কাজলী। আর কাজলী হিসেবেই আশুলিয়া এবং তার নিজ এলাকায় পরিচিতি লাভ করেন তিনি। তবে আশুলিয়ায় জমি কিনে বাড়ি করার পর সে একাকী ওই বাড়িতে থাকতেন। তার সাথে শুধু হিজড়া সদস্যরা দেখাশুনা করতো। তবে তার সাথে মামার ভালো সম্পর্ক ছিল এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখত। মৃত্যুর আগেরদিনও তার সাথে কথা হয়েছে। প্রায় এক বছর আগে ঝিনাইদহ মহেশপুর পটিয়াপাড়া এলাকার ডাঃ রশিদের সাথে তার বিয়ে হয়। এরপর তারা একত্রে থাকতো। মাস খানেক আগে তাদের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে বিরোধ ঘটে। এ নিয়ে আদালতে মামলা রয়েছে বলেও মধুমালা জানান।
মৃত্যুর আগের দিন রাত সাড়ে ৯টায় হিজড়াদের সাথে থাকাকালীন ফ্যান্টাসী কিংডমের সামনে অবস্থানকালে রশিদ তাকে মোবাইল করে জানায় সে এসেছে। এরপর হিজড়া সদস্যদের বিদায় করে জানায় তোরা চলে যা, রশিদ এসেছে। তোদের দেখলে সে কাছে আসবে না। ওকে নিয়ে নয়াপাড়া বাসায় সে যাবে বলেও জানায়। এরপর সকালে শুনতে পান সে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। বিষয়টি রহস্যজনক বলেও সে জানায়।
সে আশুলিয়ার কান্দাইল নয়াপাড়া এলাকায় ৪ শতাংশ জমি ক্রয় করে একটি ৩য় তলা ভবন নির্মাণ করে বসবাস করতেন। সেখানে তার পরিবারের কোন সদস্য তার সাথে থাকতো না। তবে ওই এলাকার ২০/২৫ জন হিজড়ার সর্দার হিসেবে সে দায়িত্ব পালন করতো বলে হিজড়াদের আশুলিয়া থানা সর্দার আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে হিজড়া সদস্য প্রীতি জানায়, আমাদের এ এলাকার নেতা ছিল কাজলী হিজড়া। সকালে তারা এলাকায় কালেকশনে গিয়েছিল। সেখান থেকে এসে সকাল ৮টায় কাজলীর বাড়িতে যায় সে। সেখানে নির্মাণাধীন ভবনটির সামনে রাজমিস্ত্রি আল আমিন সহ হেলাপাররা উপস্থিত ছিলেন। তারা বাইরে থেকে ডাকাডাকি করলে কোন সাড়া শব্দ না পেলে তাকে বিষয়টি তারা জানায় এবং রুম থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখতে পান তারা। এরপর একজনকে বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে পাশদিয়ে উঠে ৪ তলা ছাদের ওপর দিয়ে সিঁড়ির দরজা খোলা দেখতে পায় এবং প্রবেশ করে নিচতলায় গিয়ে কাজলীর শরীরে আগুন জ্বলতে দেখতে পান। চিৎকার দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলে তারা ভিতরে ঢুকে দগ্ধ লাশটি দেখতে পান। এসময় লাশটির চেহারা বিকৃত আকার ধারণ করেছে বলে তারা দেখতে পান। এরপর বিষয়টি থানা পুলিশকে জানালে পুলিশের ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাভেদ মাসুদের নেতৃত্বে পুলিশের সদস্যরা ভবনটির মধ্যে প্রবেশ করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা জেলা এডিশনাল এসপি সাইদুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
হিজড়া সদস্য কলি জানায়, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টায় কাজলীর সাথে তার দেখা হয়। প্রতিদিনের ন্যায় সেখানে তাকে ওইদিনের কালেশনের টাকা বুঝিয়ে দেয়া হয়। সে আরো জানায়, কাজলীর সাথে আব্দুর রশিদ নামে এক ডাক্তারের দীর্ঘদিনের প্রেম ও ভালোবাসা ছিল। তার সাথে একত্রে থাকা, চলাফেরা এবং বিভিন্ন স্থানে বেড়াতেও যেত কাজলী। ইদানিং ডাক্তার রশিদের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিল না। এ নিয়ে প্রায়ই কাজলীকে মন খারাপ অবস্থায় থাকতে দেখা যেত। তারমতে এ সংক্রান্ত কারণেই কাজলী আগুনে দগ্ধ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, হিজড়া সদস্য কাজলী ৪ শতাংশ জমি ক্রয় করে ৩য় তলা একটি ভবনের নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ওই বাড়িতে কাজলী একাই থাকতো। সাথে হিজড়া সদস্যরা প্রায়ই দল বেঁধে এসে আনন্দ ফুর্তি করতো। তারা দৈনিক হাজার হাজার টাকা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিয়ে ভাগ বাটোয়ারা করে নিত। এ ধরনের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে হয়তোবা তাদের নিজেদের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব ঘটে থাকতে পারে। আর এ দ্বন্দ্বের জেরেই তাকে হত্যা করে পরে আগুন দিয়ে দগ্ধ করেছে বলে তাদের ধারণা। কাজলী অত্যন্ত শক্তিশালী একজন হিজড়া সর্দারনী ছিলেন। হত্যার পর ভিতর থেকে গেট বন্ধ করে ছাদের ওপর দিয়ে হয়তোবা হত্যাকারিরা পালিয়ে গেছে বলেও তারা ধারণা করছেন।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে এডিশনাল এসপি(অপরাধ) সাইদুর রহমান বলেন, কাজলী আত্মহত্যা করেছে না হত্যা করা হয়েছে এ বিষয়ে তারা গভীরভাবে তদন্ত করছেন। এর রহস্য উদঘাটনের জন্য সিআইডি ক্রাইম সদস্যদের ডাকা হয়েছে। তারা বিশদভাবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার পর এ রহস্য তারা জানাবেন বলে তিনি জানান। হিজড়ারা তাকে জানিয়েছেন ভিতর থেকে প্রধান গেটের দরজা বন্ধ ছিল। তারা উপর দিয়ে (৪র্থ তলার ) ছাদ দিয়ে প্রবেশ করে নিচতলার নিচের গেট খুলেছে এবং কাজলীকে দগ্ধ হতে দেখেছেন। তিনি আরো বলেন, পুলিশ নিশ্চিত হয়েই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলেও জানান।
এদিকে কাজলীর নিচতলার বাসার মালামাল ও বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ ও এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন এলাকাবাসী। হয়তোবা সেখানে ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে বলেও তারা মনে করেন। ঘটনা যাই ঘটুক কাজলী হত্যা না আত্মহত্যা সে রহস্য উদঘাটনে তদন্ত সাপেক্ষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এএইচ





