ক্রমেই নানা ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশের একটি অংশ, যাদের কাছে রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়ছে বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদের নিয়ন্ত্রনে শুধুমাত্র লোক দেখানো ওয়ার্নিং লেটার ইস্যু ও নামকাওয়াস্তে তদন্ত কমিটি গঠণ ছাড়া আর কিছুই করতে পারছেন না উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মাদক পাচার, ছিনতাই, মানব পাচার ও অপহরণসহ নানা অপরাধী সিন্ডিকেটের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া সম্প্রতি এক চিঠিতে তার অধীনস্ত কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দেন। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, পুলিশের একটি অংশের মাদক ব্যবসা ও কিডনাপিংয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ তার কাছে রয়েছে।

পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান কড়া ভাষায় হুঁসিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ওই সব অপরাধী পুলিশ সদস্যরা তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখলে অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সম্প্রতি কিছু পুলিশ সদস্য ইয়াবা পাচার, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পরই বাহিনীটির অপরাধে জড়িয়ে পড়ার এই উর্ধ্বমূখী প্রবণতার বিষয়টি নজরে আসে।

পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ সালে ১৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া চলতি ২০১৫ সালে এ পর্যন্ত ৫ হাজার পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন অপরাধে শাস্তি দেয়া হয়েছে এবং বিচারাধীন রয়েছে আরও বহু অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, বিগত দেড় বছরে প্রায় ২হাজার ৪শ পুলিশ কর্মকর্তার পদন্নতি আটকে দেয়া হয় এবং সাসপেন্ডের মতো কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ এবং অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে অপরাধের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়ে যায়, তখন বাহিনীটি অপরাধ দমনে তাদের নৈতিক মনোবল হারিয়ে ফেলে।

এদিকে, যতই সতর্ক করা হচ্ছে অপরাধের সাথে জড়িত পুলিশ সদস্যদের ওপর তার সামান্যই প্রভাব পড়ছে বলে অনেকটা খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেছেন পুলিশ সদর দপ্তর এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

গত ফেব্রুয়ারিত ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের সহকারি কমিশনার রাজিবুল হাসান ১৭ বছরের এক কিশোরিকে অপহরণ করে এবং তাকে নিজ বাসায় দুই মাস ধরে আটকে রেখে নির্যাতন চালায়।

পরবর্তীতে ভিকটিমের পরিবার কাফরুল থানায় মামলা করে এবং র‌্যাব-৪ এর নিকট সাহায্যের আবেদন জানায়।

সহকারি পুলিশ কমিশনার রাজিবুল হাসানের কুকীর্তি প্রকাশ হয়ে পড়লে তাকে তেজগাও ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের অফিসে বদলি করা হয়। কিন্তু কিশোরীর পরিবারকে অদ্যবদী রাজিব হুমকি দিয়ে যাচ্ছে যাতে এই ঘটনা ফাঁস করা না হয়।

গত ২১শে জুন (২০১৫)ফেনী সদর থেকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এস বি) পুলিশের সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানকে ২৭ কোটি টাকা মূল্যের ৬লাখ ৮০হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব।

পরে জিজ্ঞাসাবাদে আটক পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজ বলেন, এই ইয়াবা পাচার চক্রের সাথে আরও বেশ কিছু পুলিশ সদস্য জড়িত রয়েছেন।

মাহফুজের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কক্সবাজার ডিবি (ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ) পুলিশের অফিসার-ইন-চার্জকে ডিআইজি অফিসে এবং আরও ১০ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়। এদের সবার বিরুদ্ধে ইয়াবা ও মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও বিবাহ বহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগও মিলছে হর-হামেশা। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার খিলগাওয়ে স্পেশাল পুলিশের একজন এএসআইয়ের বিরুদ্ধে তার সাবেক স্ত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এর আগে ২০১৪ সালের ১৫ই ডিসেম্বর নুর-ই-আলম নামে এক পুলিশ কনস্টেবলকে হাইকোর্ট এলাকায় ছিনতাইকালে হাতেনাতে ধরে ফেলে জনগণ। একই অপরাধে জড়িত পুলিশের অপর সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর খলিলুর রহমান অবশ্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

এমন নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে গত ১৭ই জুন ডিএমপি কমিশনার ওসি থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি প্রদান করে তার উদ্বেগের কথা জানান।

চিঠিতে ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান সাম্প্রতিক নানা ঘটনা বিশ্লেষণ করে বলেন, বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশের একটি অংশ।

মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, ইয়াবা ও ফেনসিডিল ব্যবসাসহ পুলিশের অপরাধ তদন্তে গত বুধবার (২৪জুন ২০১৫) পুলিশ সদর দপ্তর দুটি তদন্ত কমিটি গঠণ করে।

এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দুটি তদন্ত কমিটি গঠণের কথা স্বীকার করেন এবং বলেন, কিছু পুলিশ সদস্য এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে যা পুরো বাহিনীর সুনাম ক্ষুন্ন করছে।

ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, আমার পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে মূলত পুলিশ কর্মকর্তাদের তাদের অধীনস্তদের বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে এবং ভালো কাজে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখিত নির্দেশনা মেনে না চললে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান ডিএমপি কমিশনার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিজ্ঞানী এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, পুলিশকে রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করা এবং বাহিনীটির অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার কারণেই তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা অবশ্য বলেন, এটা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চরম ব্যর্থতা যে তারা অধীনস্তদের নিয়ন্ত্রন করতে পারছেন না।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই মর্মে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে বাহিনীর যে কোন সদস্যের অপরাধের বিষয়ে তারা যেন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেন। (সূত্র: নিউএজ)

কেবি