দলীয় পদ-পদবি, আধিপত্য, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, গরুর হাটের ইজারা ও চাঁদা তোলাকে ঘিরে প্রায় দু’বছর ধরে বিরোধ চলে আসছে দুই পক্ষের মধ্যে। এ দুইপক্ষের জেরেই গত ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাড্ডায় ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহত তিনজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
এই ঘটনার দু’দিন পর শনিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে বাড্ডা থানায় অজ্ঞাত ১০ থেকে ১২ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত মাহবুবুর রহমান গামার বাবা মো. মতিউর রহমান।
পরিবারের অভেযোগ হত্যার ঘটনার এক সপ্তাহ পারও তেমন কোন ক্লু উদ্ধার করেতে পারে নাই পুলিশ। পুলিশ দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু যারা নির্দেশ দাতা তাদেরকেও গ্রেফতার হয়নি।
সরেজমিনে জানা যায়, শুধু ঝুট ব্যবসা ও আধিপত্যই এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ না। রাজনৈতিক কোন উদ্দেশ্য এবং দলীয় কোন্দলও এর একটি কারণ। যেটাকে উসকে দিয়েছে বড় কোন শক্তি।
মাহবুবুর রহমান গামার ছোট বোন ইভা নাজনিন রত্না টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ভাইয়ার সাথে ঝুট ব্যবসা নিয়ে বাউল সুমনের একটা বিরোধ চলছিল। বাউল সুমন মারা যাওয়ার পরে উনার সাঙ্গ-পাঙ্গরা ওটা নিতে চাইছিলো সেক্ষেত্রে ভাইয়া ছিল ওদের বাধা।
পরিবার থেকে বলা হচ্ছে, বাউল সুমনের সাথে বিরোধ মিমাংসা হয়ে গিয়েছিল। তারপরও তাকে কেন এবং কারা হত্যা করলো তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। গামার বন্ধু সালাম যিনি অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিনি পুলিশের কাছে তিন জন কিলারের নাম বলেছেন। তবে তিনি অসুস্থ থাকায় তার কাছে কাউকে যেতে দেয় না পরিবার। এই সালামকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করছেন নিহতের স্বজনরা।
স্বজনদের দাবি, সে ঘটনা স্থলে ছিলো এবং আহত অবস্থায় বেঁচে আছে। তাহলে সে কাউকে না কাউকে দেখছে এমনকি চিনতেও পারে। হয়তোবা উনিই সঠিকটা বলতে পারবে।
একটি সূত্রে জানা যায়, সালাম যে তিনজনের নাম বলেছে তাদের বাসায় ডিবি তল্লাসি করে কিন্তু তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
গামার বাবার সাথে কথা বলতে চাইলে বলা হয় তিনি কোন সাংবাদিকের সাথে কথা বলতে নারাজ। এবং পরিবারের কেউ যেন কোন সাংবাদিকের সাথে কোন কথা না বলে সে জন্য সবাইকে নিষেধ করা হয়েছে।
নিহত মাহবুবুর রহমান গামার স্ত্রী আয়শা ইসলাম লিনতা টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আমরা কাউকে সন্দেহ করলেও কারো নাম বলতে পারছি না। কারণ আমরা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমার একটা মাত্র ছেলে নাম মানছিব রহমান আয়াশ (৮)। আমার ছেলের একটা ভবিষ্যত রয়েছে।
তিনি তার কান্নাজড়িত ভেজা গলায় বলছিলেন, কোন কুল কিনার খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা একটাই দাবি আমার স্বামী হত্যার সুষ্ঠ বিচার চাই।
তবে পুলিশের একটি সূত্র বলছে, সঠিক তদন্ত কাজের জন্যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতা হারুন, তৌফিক ও শামীমকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কারণ তারা একত্রে ওই দিন উক্ত স্থানে উপস্থিত ছিলেন। যখন জিন্স ও টি-শার্ট পরা তিন অজ্ঞাত যুবক পানির পাম্পের মধ্যে প্রবেশ করে। তখন হারুন, তৌফিক, শামীম ও আড্ডাস্থল থেকে বের হয়ে যান।
তবে গামার খুব ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ঝুট ব্যবসা নিয়ে গামাকে হত্যা করা মূলত কোন কারণ ছিল না। এর সাথে আরও অনেক কিছুই জড়িত রয়েছে। ঝুট ব্যবসা সাধারণ একটা ইস্যু। এটাকে ফোকাস করেই মূলত ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে।
ওই সূত্রটি আরও জানায়, গামাকে হত্যা করার মূল টার্গেট ছিল এই কারণে যে সে খুব অল্প দিনেই দলীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে একটা সুনাম অর্জন করেছিল। আর সামনে সে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিল যেখানে তার জিতে যাওয়া সম্ভাবনা ছিল। আর এই জিনিসটাই তার দোসররা সহ্য করতে না পেরে তাকে হত্যা করেছে।
সুত্রটি বলছে বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ফারুক মিলন সঙ্গে মাহবুবুর রহমান গামার অনেক আগে থেকেই দল করে। সে গামার অনেক সিনিয়র। সিনিয়র হওয়ার স্বত্ত্বেও ফারুক মিলন মহানগর কমিটিতে যেতে পারেনি। কিন্তু গামা সেদিক থেকে এগিয়ে আছে। এটাও একটা কারণ হতে পারে। তাছাড়া বিরোধ চলছিল বাউল সুমনের লোক জাহাঙ্গীর ও উজ্জ্বলের সাথে। আর এদেরকে ফারুক মিলন নিজেই পরিচালনা করতো বলেও জানায় সূত্রটি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় গত শনিবারে ওই এলাকার ডিস ব্যবসায়ী আমির আলীর সাথে অন্য একটি গ্রুপের বাকবিতন্ডা হয়। তারা আমির আলীকে থানায় ধরে নিয়ে যায়। পরে গামা নিজে গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনে। যার ফলে ডিস ব্যবসায়ী আমিরের বিপক্ষের লোকজন গামার উপরে ক্ষিপ্ত হয়। আর ওই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার তাকে হত্যা করা হলো।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, গামার যানাযা নামাজে মহল্লার এবং দলীয় কিছু লোক আসলেও অনেকেই আসেননি। এমনকি ওই আসনের সরকার দলীয় এমপি রহমতউল্লাহ ওই জানাজাহ নামাজে সরিক হননি। জানাজায় তার অংশগ্রহণ করার কথা থাকলেও তিনি তাতে অংশগ্রহণ করেননি।
এ ব্যাপারে এমপি রহমতউল্লাহর মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নিহতের স্বজনরা এটাও দাবি করছে যে, মূল পরিকল্পনাকারি যদি ফারুক মিলনই হয়ে থাকে তাহলে তার সাথে উপরের কোন হাত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বাড্ডার আদর্শনগর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন মাহাবুবুর রহমান সোহেল ওরফে গামা আর মেরুল বাড্ডার আফতাবনগর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন জাহাঙ্গীর ও উজ্জ্বল। আদর্শনগর এলাকায় সর্বক্ষেত্রে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণে একমাত্র বাঁধা ছিল গামা। এলাকায় এককভাবে দলকে নিয়ন্ত্রণ, ঝুট ব্যবসা, পশুরহাটসহ প্রায় সব বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। গামা ও জাহাঙ্গীরের মধ্যে বিরোধ ছিল তুঙ্গে। একাধিকবার বিভিন্ন দলীয় অনুষ্ঠানে হাতাহাতি হয়েছে তাদের মধ্যে। খুনের সঙ্গে গামার গ্রুপের কয়েকজন নেতাকর্মীও জড়িত আছে।
দু’মাস আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ আর্দশনগর স্কুলে দুপক্ষকে নিয়ে একটি মিটিং করেছিলেন। ওই মিটিংয়ে সমাধান তো দূরের কথা একে অপরকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়। মিটিং পণ্ড হয়ে যায়। তাদের দ্বন্দ্ব খোদ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেই অস্বস্তি ছিল।
দলীয় একটি সূত্র বলছে, আসন্ন ঈদে আফতাবনগরের মাঠে যে গরুর হাট বসবে ওই হাটের কিছুদিনের মধ্যে টেন্ডারের আহ্বান করা হয়েছে। দুই পক্ষই ওই টেন্ডার ফেলেছিল। ওই হাটের যেন গামা ইজারা পায় এজন্য থানা সভাপতি ওসমান গনি ও সেক্রেটারি মোস্তফা হোসেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউসারকে বলেছিলেন। এতে ক্ষিপ্ত ছিল জাহাঙ্গীর।
বর্তমানে বাড্ডা থানায় যুবলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। জাহাঙ্গীর ও উজ্জ্বলসহ তাদের সহযোগীরা কোন পদে নেই। ওই পদ নেয়ার জন্য তারা বিভিন্ন স্থানে তদবির করেছিল। কিন্তু, গামা বাড্ডা থানায় নিজের লোক আলিম ও সবুজকে কমিটিতে দিতে চাচ্ছিলেন। সব মিলিয়ে তাদের বিরোধ ছিল তুঙ্গে।
বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ৬ নং ওয়ার্ডের কমিশনার ওসমান গনির কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বুঝিনা আপনারা (সাংবাদিক) আমার কাছে এত জিজ্ঞেস করেন কেন। পুলিশের কাছে খোঁজ নেন সব জানতে পারবেন। আমি কি সঠিক উত্তর দিতে পারবো?
তবে সুষ্ঠ বিচার দাবি করে তিনি বলেন, আমরা চাই এটার একটা সুষ্ঠ বিচার হোক। সত্য ঘটনা উঠে আসুক। যারা দুষ্কৃতিকারি তাদেরকেই ধরা হোক। পুলিশকে চাপ দিলে কারা এ ঘটনা ঘটাচ্ছে এর মূল হোতা বের হয়ে আসবে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক আওয়ামী লীগের নেতা টাইমনিউজবিডিকে বলেন, দুর্বৃত্তরা একসঙ্গে তিনটি প্রাণ কেড়ে নিলো। গামা ভাই এলাকার মধ্যে প্রভাবশালী ছিলেন। এটা আগে এবং পরে যারা সহ্য করতে পারেনি তারাই তাকে খুন করেছে।
সর্বষেশ এই মামলার তদন্ত কাজ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তরের পর গত সোমবার ট্রিপল মার্ডারের মূল পরিকল্পনাকারি বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মো. ফারুক মিলন এবং সহযোগী নূর মোহাম্মদকে গ্রেফতারের ব্যাপারে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সেখানে ডিএমপি যগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম (ডিবি) বলেন, গত এক বছর আগে বাড্ডা থানার যুবলীগের নেতা সুমন ওরফে বাউল সুমন পুলিশের তাড়া খেয়ে হৃদরোগে মারা যান। এরপর থেকে ওই এলাকার যুবলীগের নেতা জাহাঙ্গীর ও উজ্জ্বল আদর্শনগরের স্টার গার্মেন্টসহ আরও কয়েকটি গার্মেন্টে ঝুটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু, এখানে বাধা দেন গামা। এই নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। এই হত্যায় আটজন অংশ নিয়েছিল বলেও জানান তিনি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে যগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম মামলা হস্তান্তরের বিষয়টি স্বীকার করলেও একটি সূত্রে জানা যায় এখনও হস্তান্তর করা হয়নি। তবে বাড্ডা থানার ওসি এম এ জলিল টাইমনিউজবিডিকে বলেন, এ মামলা ডিবিতে দেওয়া হয়েছে।
ডিবিতে এই মামলার তদন্ত কাকে দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেলওয়ার বিষয়টি জানেন। তবে দেলওয়ারের সাথে মোবাইলে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি মোবাইলের কল রিসিভ করেও তিনি কোন কথা বলেননি।
নিহত শামসু পরিবারের মামলা নেওয়া হয়নি এমন অভিযোগের ভিাত্ততে ওসি জলিল বলেন, একই স্থানে একটি ঘটনায় একটি মামলা হয়। তাই একটা মামলা হওয়ার পর তাদেরটা আর নেওয়া হয়নি। তবে অভিযোগ এই মামলার সাথে নথিভুক্ত হয়েছে।
তারা যে নাম দিয়েছে তারা হলেন, বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক জুয়েল ও সোহেল এবং কর্মি রনি।
গত বৃহস্পতিবার রাতে বাড্ডার লিংক রোডের আদর্শনগরের ওয়াসার পানির পাম্পের মধ্যে দুর্বৃত্তরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে। এতে স্বেচ্ছাসেবক লীগের চার নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় চারজনকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে রাত ১০টায় মানিক ও শামসুদ্দীন মোল্লা মারা যান। পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গামা মারা যান। আহত আবদুস সালাম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
নিহত মাহবুবুর রহমান গামার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ। পিতার নাম মো. মতিউর রহমান। তিনি মধ্য বাড্ডা আদর্শ নগর ৬৩৫/বি-৪০ নম্বর নিজস্ব বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকেন। পেশায় ছিলেন ব্যবসায়ী। তার সোনার বাংলা সমাজ কল্যাণ সংস্থা নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই সংস্থার কয়েকটি প্রজেক্ট রয়েছে যার মধ্যে সোনার বাংলা মা ও শিশু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স একটি।
নিহত সামসুদ্দিন মোল্লা বাড্ডার মোল্লাপাড়ার ৬৬২ নম্বর বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকতেন। তিনি এক সন্তানের জনক। তার পিতার নাম মাহাতাব উদ্দীন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা। ফিরোজ আহমেদ মানিক আদর্শ নগরের শ-২৬/১ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় ভাড়া থাকতেন। তার জুমায়ারা ও রুহি নামে দুই মেয়ে রয়েছে। তিনি আল সামী হাসপাতালের ম্যানেজার ছিলেন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকলীগের কর্মী ছিলেন। তার পিতার নাম আবদুর রাজ্জাক। গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবায়। আহত আবদুস সালাম মোল্লাপাড়ায় থাকেন বলে জানা গেছে।
এএইচ





