বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ‘মুক্তমনা’ ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় হত্যার সন্দেহের তীর জঙ্গীদের পর এবার শিবিরের দিকে। অভিজিতের বাবা ড. অজয় রায়ের অভিযোগ এই হত্যাকান্ডের সাথে শিবিরের সম্পৃক্ততা আছে।

অপরদিকে এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে ইতিপূর্বেই হিজবুত তাহরিরের সদস্য শফিউর রহমান ফারাবিকে আটক করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।

অভিজিত হত্যাকান্ডের ২৩ দিন অতিবাহিত হলেও আসল খুনিদের ধরতে না পারায় শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসী মজুমদার মিলনাতায়নে নাগরিক সমাবেশে ড.অজয় রায় বলেন, ২৬ শে ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অমর একুশে বইমেলায় অভিজিৎ ও তার স্ত্রী বন্যা অবস্থান করে। এসময় বুয়েটের শিক্ষক ফারসীম মান্নানের আহ্বানে ছায়াবিথী ও অবসর প্রকাশনীর মাঝখানে ত্রিপল বিছানো যায়গায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখকদের আড্ডায় অংশগ্রহন করেন অভিজিৎ।

তিনি বলেন, আমার ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে জানতে পারি ওই সমাবেশে শিবিরের সার্ভার থেকে পরিচালিত বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘জিরো ট্যু ইনফিনিটি ও পাই’ নামে দুটি ম্যগাজিনের লেখকরা উপস্থিত ছিলো। এতে ১১জন আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ৪/৫ জন অপরিচিত ছিলো। তাদেরকে এখানে কে আসতে বলেছে জানতে চাইলে তারা বলে স্যার (ফারসীম মান্নান) আসতে বলেছে। পরে তারা অভিজিৎকে দেখে চলে যায়।

অজয় রায় বলেন, সেই থেকেই ফারসীম মান্নানের গতিবিধি ভালো মনে হচ্ছেনা। আমি সিআইডি, ডিবিকে তাদের তালিকা দিয়েছি কিন্তু এখনো কোন আশার বানি শুনতে পারলাম না। ওই আলোচনা শেষে যাবার পথে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বাহিরে অভিজিৎকে হত্যা করা হয়।

এদিকে বুয়েটের শিক্ষক ফারসীম মান্নান বলেছেন, ওই ঘটনার পর আমি ১৬মার্চ স্যারের (অজয় রায়) সাথে দেখা করেছি তার পরে তো স্যারের এব্যাপারে কোন ‘ডাউট’ থাকার কথা নয়। তাছাড়া ওই আড্ডায় অপরিচিত কেউ ছিলোনা। ঐ আড্ডায় উপস্থিতদের ছবিও ফেসবুকে আপলোড করা হয়েছে। তারপরও স্যারের এমন কথায় আমি দু:খ পেয়েছি।

এদিকে অজয় রায়ের সন্দেহভাজন ফারসীম মান্নান ও শিবির নেতাদের ব্যাপারে পুলিশের উর্ধতন কোন কর্মকতাদের বক্তব্য না পাওয়া গেলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, নানাবিধ চাপ থাকায় ডিবি অভিজিৎ হত্যাকন্ডের তদন্তে কোন গাফলতি করছেনা, যখন যেখান থেকে কোন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

ফারসীম মান্নান ও শিবিরের ব্যাপারে তিনি বলেন, তাদের ব্যাপারেও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এর আগে, অভিজিৎ হত্যার কিছুক্ষন পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে 'আনছারুল্লাহ বাংলা টিম সেভেন' নামে একটি সংগঠন অভিজিতের হত্যার দায় স্বীকার করে পোষ্ট দেয়। আর শফিউর রহমান ফারাবি নামের এক হিজবুত তাহরিরের সদস্য ফেসবুকে দীর্ঘ দিন থেকে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলো।

সেই ফারাবিকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আটক করে র‍্যাব। পরে র‍্যাব ও ডিবি তাকে পুলিশেরে কাছে হস্তান্তর করে। তাকে ১০দিনের রিমান্ড নিয়ে পুলিশ জানতে পারে যে ফারাবি সরাসরি হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত না থাকলেও সে এই হত্যাকান্ডে তার শীর্ষদের উৎসাহিত করেছে।

পুলিশ আরো বলেন, ফারাবির সেই শীর্ষরা যাদের সাথে তার কোন দিনও দেখা হয়নি, শুধু তাদের সাথে তার ফেসবুকেই পরিচয়। তার ধর্মীয় লেখা দেখে শীর্ষরা ফারাবির প্রতি দূর্বল হয়ে পরে।

আর সেই শীর্ষদের সংখ্যা প্রায় ১০/১২ জন তাদের তালিকা করে তাদেরও খুঁজছে পুলিশ।

একই ভাবে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে শুরু হওয়া আন্দোলনের ১০ম দিনে পল্লবীর নিজ বাসার সামনে নিহত হন ‍রাজীব হায়দার ওরফে ‘থাবা বাবা'।

রাজীব হায়দার খুন হওয়ার পর তদন্তে বেরিয়ে আসা ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের মধ্যে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্যায় প্রশাসনের ছাত্র,কথিত শিবেরের ‘বড় ভাই’ রেজওয়ানুল আজাদ রানা। তিনি অবশ্য এখন পলাতক।

এবং অভিজিৎ হত্যাকান্ডে গ্রেফতারকৃত সন্দেহভাজন আসামি শফিউর রহমান ফারাবিকেও রাজীব হত্যার সাথে সংশ্লিষ্টতায় গ্রেফতার হয়। পরে উচ্চ আদালতের রায়ে সে জামিনে বের হয়।

তাই অভিজিৎ হত্যায়, ধর্মীয় উগ্রবাদিদের পাশাপাশি এবার শিবিররে সংশ্লিষ্টতাও খুঁজে দেখছে পুলিশ।

উল্লেখ্য, এদিকে অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ এফবিআই এসে ডিবি পুলিশকে তদন্তে সহযোগিতা করে। এবং তারা অভিজিতৎ এর হত্যার নমুনা পরীক্ষার জন্য আমেরিকায় তাদের ল্যাবে নিয়ে যায়। তারা যদি হত্যাকারীকে সনাক্ত করতে পারে তাহলে তারা আমেরিকার আইন অনুযায়ী আসামিকে শাস্তি দেবে।

এআই/এমকে