নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে উপজেলায় পুলিশের সহায়তায় ও উপস্থিতিতে কিশোর শামছুদ্দিন মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দীর্ঘ ৫ বছর পর পুলিশের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে বলে সিআইডি নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন। তবে, পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ততার পরও সুষ্ঠু বিচার করা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মিলনের পরিবার।
বিগত ২০১১ সালের ২৭ জুলাই সকাল সাড়ে দশটার দিকে কোম্পানীগঞ্জ থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আকরাম শেখের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একদল পুলিশ শামছুদ্দিন মিলনকে ডাকাত সাজিয়ে তাঁদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে স্থানীয় জনতার হাতে তুলে দেন। এ সময় স্থানীয় জনতা পুলিশের কথামত ডাকাত ভেবে তাঁদের (পুলিশের) উপস্থিতিতেই কিশোর মিলনকে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
এ ঘটনার মামলা করতে বারবার কোম্পানীগঞ্জ থানায় আসলেও পুলিশ মামলা না নিলে অবশেষে আটদিন পর মিলনের মা নোয়াখালীর ২ নম্বর আমলী আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রাথমিক ভাবে মামলায় সরাসরি কোন আসামির নাম উল্লেখ করা না হলেও ঘটনার সময় স্থানীয়ভাবে ধারণকরা একাধিক মুঠোফোনে ধারণকৃত ‘ভিডিওচিত্র’ দেখে পুলিশের সহায়তায় ও উপস্থিতিতে কারা কিশোর মিলনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তা বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। মিলনের হত্যাকারীদের নাম প্রকাশ পায়।
আইনজীবী গিয়াস উদ্দিনের বাবুলের আরো বলেন, নৃসংশভাবে পিটিয়ে হত্যার পর সারা দেশে আলোচিত মিলন হত্যা মামলার অভিযোগ পত্র দাখিল নিয়ে ডিবি পুলিশ যে কালক্ষেপণের পথ বেঁচে নিয়েছে মিলনের মামলার ভবিষ্যত কি হবে? ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা মামলায় আসামি হবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তা না হলে, আইন অনুযায়ী মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের নির্ধারিত সময়সীমা ৬০ দিনের স্থলে ৫ বছরই বা পার হবে কেন?
মামলার সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা নোয়াখালী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-ডিবি) আতাউর রহমান বলেন, মামলা হতে সকল আসামীকে অব্যহতি দিতে সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তিনি এই মামলার দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন।পরে নোয়াখালী আমলি আদালতের জ্যৈষ্ঠ বিচারিক হাকিম ফারহানা ভুঁইয়া চূর্ড়ান্ত প্রতিবেদন আমলে না নিয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
মিলনের চাচা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মিলন হত্যার ঘটনার জন্য দায়ি পুলিশ সদস্যরা সবাই স্ব-পদে চাকরি করছেন। ডিবি পুলিশও অভিযোগপত্র দিব দিব বলে টালবাহনা করছে। পুলিশকে বাঁচানোর জন্যই এসবই হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত হয়ত কিছুই হবে না। ওরা সবাইকে টাকা খাইয়ে বুক করে ফেলেছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিলন হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত বলে চিহ্নিত পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আকরাম শেখ বর্তমানে চাকরি করছেন বাগের হাটের মংলা থানায়। আর রফিক উল্লাহ বান্দরবন সদর থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। এ ছাড়া দুই কনষ্টেবল আবদুর রহিম চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়ি এবং হেমারঞ্জন চাকমাকে হাতিয়া থানায় কর্মরত রয়েছেন।
মিলনের মা কোহিনুর বেগম বলেন, ‘যাঁরা আমার ছেলেকে দাঁড়িয়ে থেকে হত্যা করিয়েছে, তাঁরা নিশ্চিন্তে চাকরি করছে; আর আমি ছেলে হারানোর শোকে নিজেই আজ অসুস্থ হয়ে পড়েছি। এই দেশে অপরাধীরাই যে নিরপরাধ হয়, তা পুলিশ সদস্যদের চাকরিতে বহালের মধ্যদিয়েই প্রমাণ হয়েছে।’
জেলা পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মিলনকে হত্যার ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ থানার তৎকালীন ওসি রফিক উল্লাহ, উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আকরাম শেখ, দুই কনষ্টেবল আবদুর রহিম ও হেমারঞ্জন চাকমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে এ চার পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে পৃথক বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যকেই লঘু শাস্তি দিয়ে স্ব-পদে বহাল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত: ডাকাতের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ২০১১ সালের ২৭ জুলাই ভোররাতে চর কাঁকড়া ইউনিয়নের মানুষ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছয় ডাকাতকে ধরে গনপিটুনী দিয়ে হত্যা করেছিল। কিশোর মিলন ওইদিন সকালে জমি রেজিস্ট্রি করানোর জন্য ১৪ হাজার টাকা সঙ্গে নিয়ে নানার বাড়ির উদ্দেশ্যে চর ফকিরা ইউনিয়নের গ্রামের বাড়ি থেকে বের হন।
পথিমধ্যে চর কাঁকড়া একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ে দু:সম্পর্কিত খালাতো বোন চুমকির সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় স্কুলের পাশে বেপারী বাড়ির পুকুরঘাটে বসেছিল মিলন। ওই সময় স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন ও নারী ইউপি সদস্য ফেরদৌস আরার স্বামী নিজাম উদ্দিন ওরফে মানিক মিলনকে দেখে বিভিন্ন প্রশ্ন শুরু করেন।
খালাতো বোন চুমকির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে একথা বলার পর তারা চুমকিকে বিদ্যালয় থেকে ডেকে এনে পরিচয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু ততক্ষনে আরো এক ডাকাত ধরা পড়েছে খবর ছড়িয়ে পড়ায় ইউপি সদস্য জামাল ও নিজাম উদ্দিন মিলনকে উত্তেজিত জনতার রোষানলে পড়ে যেতে পারেন এই ভেবে একা ছেড়ে না দিয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার তৎকালীন এসআই আকরাম শেখ ও দুই পুলিশ কনস্টেবলের হেফাজতে দেন। তখন মিলনের কাছে ছিল ১৪ হাজার টাকা ও একটি দামি মুঠোফোন সেট।
মিলনকে চরকাঁকড়া বেপারী বাড়ির মসজিদের কাছের মোক্তব থেকে পুলিশ হেফাজতে দেওয়ার পর পুলিশ অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের পথে থানায় না গিয়ে টেকেরহাট বাজার দিয়ে থানার দিকে রওয়ানা হয়। যাওয়ার পথে টেকেরহাট বাজারে গিয়ে হঠাৎ পুলিশের গাড়ি থেমে যায়। এসময় পুলিশ কিশোর মিলনকে ‘ডাকাত সাজিয়ে’ গাড়ি থেকে নামিয়ে দিলে উপস্থিত লোকজন পুলিশের উপস্থিতেই তাঁকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে।
এরপর পুলিশ মিলনের লাশ গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে গিয়ে ভোর রাতে গনপিটুনিতে মারা পড়া অপর ছয় ডাকাতের সঙ্গে একেও ডাকাত হিসেবে সংবাদ মাধ্যমের কাছে উপস্থাপন করে পুলিশ। এ ঘটনার আটদিন পর নোয়াখালীর ২ নম্বর আমলী আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন মা কোহিনুর বেগম।
আইনজীবি মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, 'মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিওচিত্র দেখে পুলিশ মিলন হত্যা মামলায় সাতজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের মধ্যে একজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে, সব আসামিই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে গেছে।'
এমআইএস





