ঢাকা: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার ১০ বছর পেড়িয়ে গেলেও বিচারকার্য এখনো শেষ করা যায় নি। আগস্টের ভয়াল সেই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা ২টি মামলার মোট সাক্ষী ৪৯১ জন। অথচ এই মামলার মাত্র ৯৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ করতেই সময় লেগে গেলো ১০ বছর।

সে হিসেবে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণে যে ধীর গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতে এই সরকারের আমলে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এ নৃশংস ঘটনার পর এ পর্যন্ত চার মেয়াদে বিভিন্ন দল ক্ষমতায় এসেছে। এই অতিবাহিত সময়ে মামলাও পাঁচটি আদালত ঘুরেছে।

একাধিক বিচারকও মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। নতুন করে বিচারের দায়িত্ব পাওয়া ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালেও ২০২ টি তারিখ গত হয়েছে।

দুই দফা তদন্তে ৭ বছর সময় পেরিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে ছয়বার। এরপরও মামলার কোনো কূল কিনারা হয়নি।

তবে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবিদের দাবী, আগামী ১ বছরের মধ্যে এই মামলা নিষ্পত্তি হবে। বিচার প্রক্রিয়া যে গতিতে চলছে তা নিয়েও সন্তুষ্ট প্রকাশ করেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে কোন মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে বেশি সময় লাগে। আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থাকে অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ায় ধীর গতি লক্ষ্য করা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২১ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা এই দুই মামলায় মোট আসামি ৫২ জন। এর মধ্যে হাজতে রয়েছন ২৫ জন। পলাতক রয়েছেন ১৯ জন। জামিনে রয়েছেন ৮ জন।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবি এ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, সৈয়দ রেজাউর রহমান আরও বলেন, মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য ২০০৯ সালের জুনের ২৫ তারিখে আবেদন করা হয়। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ তদন্ত শেষে অভিযোগ গঠিত হয়। বর্তমানে মামলার সাক্ষী গ্রহণ ও জেরা চলছে। ২০১৫ সালের আগস্টের মধ্যে এ মামলা বিচার নিষ্পত্তি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

মামলার ধীর গতি সম্পর্কে এ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন জোট সরকার মামলার তদন্ত শুরু করলেও তা ছিল কাগজে কলমে। এ সময় জজ মিয়া নাটক সৃষ্টি করে মামলাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টাও করা হয়েছিল। তারা আওয়ামী লীগের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছে। জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছে। যে কারণে মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশীট দিতে অনেক সময় লেগে গেছে।

তবে আসামীপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, বিতর্কিত সিআইডি কর্মকর্তা দিয়ে মামলা ২টি তদন্ত করা হয়েছে। সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ অবসরে যাওয়ার পর বর্তমান সরকার মেয়াদ বাড়িয়ে মামলার তদন্ত ভার অর্পণ করেন।

তিনি গত নির্বাচনে আ্ওয়ামী লীগের একজন মনোয়নপ্রার্থী ছিলেন। এমন একজন বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাকে দিয়ে মামলার তদন্ত করা হলে তা কতটুকু নিরপেক্ষ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

মামলার আসামী পক্ষের আইনজীবি এ্যাডভোকেট মো. সানা উল্লাহ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বর্তমান সরকার নিজেদের মতো করে তদন্ত করে চার্জশীট দিতেই অবসর থেকে ফিরিয়ে আনা সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। যা ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মিথ্যাভাবে জড়ানো হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে তার কোন রকমের সম্পৃক্ততা নেই।

এব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ আসামী পক্ষের আইনজীবিদের অভিযোগ অস্বীকার করে টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আমার চাকরির মেয়াদ ৬ বছর ৩ মাস থাকা অবস্থায় গত বিএনপি সরকারের আমলে জোর পূর্বক অবসরে পাঠায়। পরবর্তীতে আমি মামলা করে চাকরি ফিরে পাই।

বর্তমান সরকার ২১ গ্রেনেড হামলা ও পিলখানার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় আমাকে চুক্তিভিত্তিক তদন্তের দায়িত্ব দিলে আমি এ মামলাগুলো তদন্ত করে চার্জশীট দেই।

সূত্রে জানা গেছে, এই দুই মামলার অন্যতম আসামী মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে সিলেটে সাবেক ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা, চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ও কোটালিপাড়ায় আওয়ামী লীগের গাড়ী বহরে বোমা হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামী। এসব মামলার হাজিরা ও জেরার কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জেলায় হাজিরা দিতে যান সে। যে কারণে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হাজিরা দিতে পারেন না । মামলার ধীর গতির এটাও একটি কারণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দুই মামলায় পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন ও রাতার বাবু। অপর ২ পলাতক আসামী ফরিদপুরের দুই ভাই মুত্তাকিন ও মুরসালিন ভারতের বিহারের একটি জেলে রয়েছেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট একটি বিভীষিকাময় দিন। সেদিন ছিল, শনিবার। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সমাবেশ ডাকে। এদিন শেখ হাসিনার জনসভায় চালানো গ্রেনেডের হিংস্র দানবীয় সন্ত্রাস আক্রান্ত করে মানবতাকে।

সমাবেশে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সমাবেশে অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যের পর সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য দিতে শুরু করেন। বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে হঠাৎ শুরু হয় নারকীয় গ্রেনেড হামলা। মুহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে একের পর এক বিস্ফোরিত হয় গ্রেনেড। আওয়ামী লীগ নেতারা ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক মানবঢাল রচনা করে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন বঙ্গবন্ধু কন্যাকে।

নিহত হন যারা

২১ আগস্টের সেই রক্তাক্ত ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। আর এ হামলায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২৪ আগস্ট মারা যান। আহত হওয়ার পর প্রায় দেড় বছর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা ও প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। রক্তাক্ত-বীভৎস ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় নিহত অন্যরা হলেন মোসতাক আহম্মদ সেন্টু, শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), হাসিনা মমতাজ রীনা, রিজিয়া বেগম, রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, লিটন মুন্সী, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসির উদ্দিন সর্দার, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।

আহত হয়েছিলেন যারা

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি (তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য) জিল্লুর রহমান, প্রয়াত আবদুর রাজ্জাক, ঢাকার সাবেক মেয়র (প্রয়াত) মো. হানিফ, আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, কাজী জাফর উল্লাহ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা আখতার, এ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দীপ্তি, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিকসহ ৫ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ আহত হন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে অনেকে কিছুটা সুস্থ হলেও পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে আছেন অনেকে।

ঢাকা, জেইউ,২১ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম//