প্রধান বিচারপতির ফোনালাপ রেকর্ড করে তা গণমাধ্যমে ফাঁস করে দিয়ে আপীল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) শুধু আদালতই নয়, দেশের মর্যাদাও ক্ষুন্ন করেছিলেন।
আজ (রোববার)ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম-এল.আর.এফ. আয়োজিত “বিচার বিভাগীয় রিপোর্টিং” শীর্ষক এক কর্মশালায় এমন মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একজন বিচারক হয়ে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য রেকর্ড করে তা ফাঁস করে দিয়েছিলেন মানিক যা কোন সভ্য সমাজে চিন্তাই করা যায় না।
ব্যারিস্টার খোকন বলেন, বিচারপতি মানিক এমন কাজ করে নিজেকে ছোট করেছেন, বিচার বিভাগকে ছোট করেছেন এবং দেশকে ছোট করেছেন।
বিচারপতি মানিকের এমন কর্মকান্ডের ফলে বিচার বিভাগ অনেক পিছিয়ে গেছে মন্তব্য করে ব্যারিস্টার খোকন বলেন, সরকার এ ব্যাপারটির কোন সমাধান না করে তা ঝুলিয়ে রাখে।
ভবিষ্যতে যাতে সর্বোচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নকারী এমন ঘটনা না ঘটে সেজন্য এ বিষয়টির একটি সুন্দর সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন খোকন।
তিনি বলেন, বিচারপতি মানিকের ফাঁস করা বক্তব্য সাংবাদিকদের প্রকাশ করা ঠিক হয়নি। তবে, প্রকাশই যখন করলো তখন এর শেষ অবধি যাওয়া উচিত ছিল। বিষয়টিকে মাঝামাঝি রেখে সাংবাদিকদের হাত গুটিয়ে ফেলা উচিত হয়নি।
উল্লেখ্য, চলতি (২০১৫) সালের আগস্ট মাসে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও আপিল বিভাগের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের টেলিফোন আলাপ গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়।
বিচারপতি মানিকই ওই বক্তব্য রেকর্ড করে তা সাংবাদিকদের সরবরাহ করেছেন বলে পরবর্তীতে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
গত ১০ই আগস্ট (২০১৫) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বৃহত্তর বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের ফোনালাপের সিডি উপস্থাপন করা হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই ফোনালাপ:
বিচারপতি মানিক: এই যে সেদিন বললেন না, আপনি সেদিন বললেন যে, সাকার ফ্যামিলি আপনার কাছে এপ্রোচ করছে আমারে না করার জন্য কিন্তু পরবর্তী টাইমে দেন।
প্রধান বিচারপতি: সাকারটাতো হিয়ারিং হয়ে গেছে।
বিচারপতি মানিক: না, সেটা বলতেছি না। আপনি বলছিলেন, সাকার ফ্যামিলি আপনাকে বলছে আমাকে না রাখার জন্য এ জন্য রাখতে পারেন নাই।
প্রধান বিচারপতি: হ্যাঁ..হ্যাঁ।
বিচারপতি মানিক: কিন্তু, এখন পরবর্তীটা
প্রধান বিচারপতি: পরবর্তীতে হিয়ারিংয়ে যেটাই যাই, আমি আপনাকেই রাখব।
বিচারপতি মানিক: আমার কিন্তু আছে আর এক মাস।
প্রধান বিচারপতি: হ্যাঁ..?
বিচারপতি মানিক: এক মাস আছে।
প্রধান বিচারপতি: এক মাস আছে? কবে শেষ হবে?
বিচারপতি মানিক: আমারতো... মানে এই ছুটিতেই শেষ। নইলে আর পাব না কিন্তু। আমাকে দেন। অন্তত সাকার ফ্যামিলি থেকে আপনাকেও বলছে আপনি দিতে পারেন নাই, সাকার ফ্যামিলি মেম্বাররা বলছে। কিন্তু এইটাতো...
প্রধান বিচারপতি: সাকার ফ্যামিলি মেম্বার মানে, সাকার পক্ষ থেকে।
বিচারপতি মানিক: যাই হোক, সাকার পক্ষ থেকে বলছে আমারে না দেয়ার জন্য।
প্রধান বিচারপতি: হ্যা না দিতে বলছিলেন।
আরেক সিডিতে বিচারপতি মানিকের সাথে আরেকটি টেলিফোন আলাপে প্রধান বিচারপতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের ‘বাড়ি আত্মসাৎ’ মামলা নিয়ে কথা বলেন। এতে শোনা গেছে-
বিচারপতি মানিক: আচ্ছা কালকে তো ১১ নাম্বারে মওদুদের। মওদুদেরটা ১১ নাম্বারে। মওদুদেরটায় কিন্তু আমার নাম ছিলো লিস্টে।......আজকে কিন্তু আমার নাম নেই।......আমি ছিলাম কিন্তু। আপনি কালকে বললেন না কালকে, মওদুদ আসছিলো। আপনার হাতে পায়ে ধরছে।
প্রধান বিচারপতি: হ্যাঁ।
বিচারপতি মানিক: কি বলছে?
প্রধান বিচারপতি: আপনি দয়া করে যাকে দেন চৌধুরী সাহেবকে দিবেন না। হাতে পায়ে ধরছে।
বিচারপতি মানিক: ধরছেতো কি হইছে?
প্রধান বিচারপতি: অস্পষ্ট
বিচারপতি মানিক: কি বলছে, যে মানিক সাহেবকে দিবেন না?
প্রধান বিচারপতি: হ্যাঁ, জ্বি, জ্বি।
বিচারপতি মানিক: হ্যাঁ, কি বলছে?
প্রধান বিচারপতি: চৌধুরী সাহেবকে বাদ দিয়ে যাকে দেন। তাকে দিয়েন না।
কর্মশালায় বিএনপিপন্থী আইনজীবী খোকন আরও অভিযোগ করেন, আয়কর খাতসহ সরকারের প্রতিটি খাতে চলছে সীমাহীন দুর্নীতি। এভাবে, একটি দেশ চলতে পারে না।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ পর্যায়ে পৌছেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অতি মাত্রায় রাজনীতিকরণের ফলে এমনটি হয়েছে।
ব্যারিস্টার খোকন আরও অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখন সরকারের রাজনৈতিক নির্দেশ পালন করতেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার মূল কাজে মনোযোগ দেয়ার সময় তারা পাচ্ছেন না।

শিগগিরই আদালত অবমাননা আইন:
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, অতি শিগগীরই আদালত অবমাননা (contempt of court) আইন সংসদে পাস করতে তিনি উদ্যোগ নিবেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকরা অবশ্যই স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারবেন, তবে আইনের উর্ধ্বে উঠে নয়। সাংবাদিকদেরও কিছু আইন-কানুন মেনে সাংবাদিকতা করতে হবে।
তিনি বলেন, আদালত অবমাননা আইন থাকা উচিত। “আমি দেশের আইনমন্ত্রী হিসেবে আশ্বাস দিতে পারি অতি শিগগিরই পার্লামেন্টে কন্টেম্প অব কোর্ট আইনটি পাস করার ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করব”।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি এম. বদি-উজ-জামান। এতে বক্তব্য রাখেন, সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ফারুক কাজী, কাজী আব্দুল হান্নান ও জাহিদুল হোসেনসহ আইন বিষয়ক সিনিয়র সাংবাদিকরা।
কর্মশালার দ্বিতীয় পর্বে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার বলেন, আইন অঙ্গনে টাউট-বাটপারদের দৌরাত্ম দিন দিন বাড়ছে।
এসব বাটপারদের চিহ্নিত করতে সাংবাদিকদের আরও বেশি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিরও আহবান জানান সুপ্রিম কোর্টের এই সিনিয়র আইনজীবী।
প্রধানমন্ত্রী দেশকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন উল্লেখ করে বাসেত মজুমদার বলেন, দলের ভেতরে থাকা কিছু লোকই প্রধানমন্ত্রীর অর্জনে ভূলুন্ঠিত করতে কাজ করছে। এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দেন তিনি।
কেবি





