নিরাপত্তাকর্মীকে খুন করে উত্তরা থেকে তরুণী অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় এখনো কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মেয়েটির পরিবার রয়েছে আতঙ্কে। গত এক মাসে রাজধানীতে পর পর কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু মামলাগুলোর তদন্তে বিশেষ অগ্রগতি নেই। মিরপুরের একটি ঘটনায় তিন অভিযুক্ত ২০ দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে গেছে।

নারীদের আইনি সহায়তাদানকারী সংস্থার একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছেন, ধর্ষণের ঘটনার খুব অল্পসংখ্যকই জানা যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ায় ধর্ষণের শিকার ও তাঁদের পরিবার ঘটনাগুলো প্রকাশ করতে চায় না। বিশেষ করে মেয়েশিশুরা খুবই নির্মমভাবে এসব ঘটনার শিকার হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিল্লিতে এক ছাত্রীকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা গোটা ভারতকেই নাড়িয়ে দেয়। এর কিছুদিন পরই ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে (মানিকগঞ্জ এলাকায়) চলন্ত বাসে এক পোশাককর্মীকে ধর্ষণ করে দুই বাসকর্মী। ধর্ষণের দায়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের একটি আদালত ওই বাসচালক দীপু মিয়া ও হেলপার কাশেম আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। কিন্তু সম্প্রতি একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটে চললেও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও ঘরে-বাইরে তাঁরা নিরাপত্তাহীন।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে সারা দেশে মোট ৮১২ জন নারী ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে ধর্ষণ-পরবর্তী সময়ে ৮৭ জনকে হত্যা করা হয় এবং আত্মহত্যা করেন ১৪ জন। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩০৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সারা দেশে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ৯৮ জন এবং ২৯ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়ে সাতজন আত্মহত্যা করেছেন। আরও ৪৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্য অনুযায়ী, নারী নির্যাতনের যত ঘটনা ঘটছে, তার সিংহভাগই যৌন নির্যাতনের ঘটনা। সাধারণত এর শিকার ১৮-১৯ বছর বয়সী মেয়েরা। গত মাসে ১৭ জন নারী ওসিসির সহযোগিতা নিয়েছেন। এর আগের মাসে ২২ জন, এপ্রিলে এক সপ্তাহে ১০ জন নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ওসিসিতে আসেন।

ওসিসির সমন্বয়ক বিলকিস বেগম বলেছেন, ওসিসির পরিসংখ্যান দিয়ে ঢাকা বা এর আশপাশের নারীদের ওপর যৌন নির্যাতনের সঠিক চিত্র বোঝা যাবে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে পরীক্ষা করিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন, ওসিসিতে আসছেন না। তবে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা আরও বেশি, প্রকাশ পাচ্ছে কম।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, ধর্ষণের অধিকাংশ ঘটনাই চাপা পড়ে যায়। বিশেষ করে শহরের বস্তি অঞ্চলগুলোতে অবস্থা খুবই খারাপ। রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশকে প্রভাবিত করে ধর্ষকেরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। আর তাদের বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সামাজিক হয়রানির ভয়ে ধর্ষণের শিকার নারী ও তাঁদের স্বজনেরা কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে চাইছেন না। তবে দিল্লির ঘটনার পর একটা সচেতনতা তৈরি হওয়ায় অনেকগুলো ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে। মানুষের সাহায্য ও সাক্ষ্যেই মানিকগঞ্জের ঘটনায় দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন আবারও নড়েচড়ে ওঠার সময় এসেছে।

ভয়াবহ ঘটনা, ধরা পড়েনি আসামি: ৩ জুলাই রাতে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে ক্যামব্রিয়ান কলেজের এক ছাত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। বাধা দিলে লিয়াকত হোসেন লিটন নামের এক নিরাপত্তাকর্মীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন ভোরে গাড়িতেই ধর্ষণ করে মেয়েটিকে উত্তরা এলাকায় নামিয়ে দিয়ে যায় তারা।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মেয়েটির পূর্বপরিচিত রুম্মন নামে এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর বাইরে আর অগ্রগতি নেই। উদ্ধার হয়নি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র।

ঘটনার শিকার মেয়েটি জানান, তাঁর হবু বর ও মায়ের সঙ্গে বাসায় ফেরার সময় একটি মাইক্রোবাসে করে দুর্বৃত্তরা আসে। তারা প্রথমে মেয়েটির মাকে পিস্তল দিয়ে আঘাত করে, তারপর মেয়েটির হবু বরকে চাপাতি দিয়ে কোপায়। এরপর পাশের একটি বাসার নিরাপত্তাকর্মী এগিয়ে এলে তাঁকে গুলি করে মেয়েটিকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে।

মেয়েটি জানান, গাড়িতে চালক বাদে পাঁচজন ছিল। তাঁকে গাড়িতে তোলার পরে গাড়িটি বিমানবন্দরের দিকে ছুটতে থাকে। বিমানবন্দরে দুজন নেমে যায়। এরপর গাড়িটি আরও এক জায়গায় থামে। সেখান থেকে কিছু খাবার কেনা হয়। তারপর ফ্লাইওভারের ওপরে উঠে মেয়েটির চোখ বেঁধে দেওয়া হয়। চলতি পথে অপহরণকারীরা মেয়েটির কাছে জানতে চায়, তাঁর সঙ্গের ছেলেটি কে। আরও কিছু কথা তাঁরা মেয়েটির কাছে জানতে চায়। প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর মেয়েটির চোখ খুলে দেওয়া হয়।

মেয়েটি তখন দোকানের সাইনবোর্ডে জামালপুর, কালীগঞ্জ লেখা দেখতে পান। এরপর গাড়িটি গ্রামের মতো একটা জায়গায় থামে। দুর্বৃত্ত তিনজন একজনকে ফোন করলে টর্চ হাতে এক ব্যক্তি আসে। তারা পথ দেখিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়িটা নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা তাঁকে গাড়িতে রেখে ‘লক’ করে দিয়ে যায়। যাওয়ার সময় লম্বামতো একজন বলে যায়, চিৎকার করলে বা বের হওয়ার চেষ্টা করলে খুন করে ফেলবে।

কিছুক্ষণ পরে তারা ফিরে এলে গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। এ সময় তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকে, মেয়েটির সঙ্গে কী করা যায় সে বিষয়ে। একজন বলে পেটে ছুরি ঢুকিয়ে মেরে ফেলার কথা। আরেকজন বলে, সিএনজিতে উঠিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দে। তখন তৃতীয়জন বলে, ও তো একা বাড়িতে যেতে পারবে না। একজন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, বিশ্বকাপে মেয়েটি কোন দলের সমর্থক। খেলা বোঝে না বললে একজন তাঁর গালে চড় দেয়।

গাড়িচালক মেয়েটিকে বলে, সে চালককে বিয়ে করলে একটি ফ্ল্যাট উপহার দেবে। চালক এক নারীর ভিজিটিং কার্ড দেখিয়ে বলে, ‘দ্যাখ, ওর সাথে আমার প্রেম ছিল। আমাকে রেখে চলে গেছে। এ জন্য আমি মেয়েদের ঘৃণা করি।’

পুলিশ জানায়, মেয়েটি সেই কার্ডের নাম ও প্রতিষ্ঠানের নাম পুলিশকে জানিয়েছে। পুলিশ সেই নারীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে, ওই দিন সন্ধ্যার দিকে একই দুর্বৃত্তরা ওই নারীকে অপহরণ করে ছেড়ে দিয়েছিল।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি সূত্র জানিয়েছে, চক্রটি গুলশানের ওই নারীর পরিচয় নিয়ে একটি কার্ড রেখে তাঁকে ছেড়ে দেয়। ওই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একই চক্র এ ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে লোকলজ্জায় মুখ খুলছেন না অন্যরা।

ডিবির সূত্র বলছে, ওই চক্রটিকে তারা শনাক্ত করেছে। শিগগিরই তারা ধরা পড়বে। উত্তরা মডেল থানার ওসি শাহাদত হোসেন বলেন, পুলিশ আন্তরিকভাবে তদন্ত করছে। অচিরেই সব বের হয়ে আসবে।

অভিযুক্তরা জামিনে মুক্ত, নিরাপত্তাহীনতায় মেয়েটি: গত ১৬ জুন মিরপুরের পীরেরবাগে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ছয়জন বাসায় ঢুকে কলেজপড়ুয়া এক তরুণীকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় পুলিশ এক নারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। এঁরা হলেন মাহবুব আহাদ (৫০), আলমগীর হোসেন (৩০), আবু বক্কর সিদ্দিক (৩৩), আনিছ মাহমুদ (৩১), মোছা মিয়া (৫০) ও মাহমুদা আক্তার (২২)। আবু বক্কর, মোছা মিয়া ও আনিছ মাহমুদ গ্রেপ্তারের কয়েক দিনের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

মিরপুর থানার ওসি সালাহউদ্দীন খান বলেন, তদন্ত চলছে। অচিরেই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। তিনজন জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করেন।

এদিকে ঘটনার শিকার তরুণীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আসামিরা জামিন পাইছে। এখন আমার নিরাপত্তা কে দেবে?’ তাঁর আশঙ্কা, আসামিরা এখন তাঁর ও তাঁর পরিবারের ওপর চড়াও হতে পারে। মেয়েটি বলেন, নানা ভয় আর শঙ্কায় তিনি ঘটনাটি থানা-পুলিশকে না জানানোর অনুরোধ করেছিলেন স্বজনদের। পরে সবার কথামতো তিনি আইনের আশ্রয় নেন। এখন তিনি শঙ্কিত।

বিপর্যস্ত জীবন, চোখের চিকিৎসাও বন্ধ: গত ৮ জুন রাতে রাজধানীর মগবাজারের গোল্ডেন এন প্যালেস আবাসিক হোটেলে স্বামীকে বেঁধে রেখে এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করেন মহানগর (উত্তর) ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হোসেন ওরফে শাহীন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ইকবাল ও তাঁর সহযোগী উজ্জ্বলকে একটি ছুরিসহ গ্রেপ্তার করে। চোখের চিকিৎসার জন্যওই গৃহবধূ স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় আসেন। ঘটনার শিকার নারীর স্বামী গত মঙ্গলবার বলেন, ঘটনার পর থেকে তাঁর স্ত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। চোখের চিকিৎসাও ঠিকমতো হচ্ছে না।

এ বিষয়ে ওই নারী রমনা থানায় একটি মামলা করেছেন। রমনা থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার ছাত্রলীগ নেতা ও তাঁর সহযোগীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁরা কারাগারে রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি। তবে পুলিশ অচিরেই এই মামলার অভিযোগপত্র দেবে।

সব হারানো দুটি মেয়ে: গত ২০ জুন ১৩ ও ১৪ বছর বয়সী দুই কিশোরীকে ভুলিয়ে কমলাপুরের লাব্বায়েক পরিবহনের কার্যালয়ে নিয়ে ধর্ষণ করেন প্রতিষ্ঠানটির তিন কর্মী। মেয়ে দুটি যাত্রাবাড়ীর বাসা থেকে সাভারে আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার জন্য ওই পরিবহনের একটি বাসে উঠেছিল। কিন্তু তারা সাভার চেনে না। পরে বাসচালক আহমেদ শেখ ও হেলপার হাসনাইন তাদের মিথ্যা বলে কমলাপুরে লাব্বায়েকের কার্যালয়ে নিয়ে ধর্ষণ করেন।

পরদিন ২১ জুন ভোরে এক কিশোরী কৌশলে বাইরে এসে কাঁদতে থাকে। তখন স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী হুমায়ুন চৌধুরী মেয়েটির কাছ থেকে সব কথা শুনে পুলিশ ও কনটেইনার ডিপোর লোকজনকে বিষয়টি জানান। পুলিশসহ গিয়ে লাব্বায়েকের কার্যালয় থেকে আরেকটি মেয়েকে উদ্ধার করে এবং গ্রেপ্তার করে বাসচালক আহমেদ শেখ ও হেলপার হাসনাইনকে।

পুলিশ মেয়ে দুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে পাঠায়। চার দিন পরে ওসিসি থেকে তাদের বাবা-মায়ের কাছে পাঠানো হয়। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা মুগদা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মামলার চার আসামির মধ্যে দুজন ঘটনাস্থলেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা কারাগারে রয়েছেন। অন্য দুজনের মধ্যে একজনের নাম-ঠিকানা পেয়েছে পুলিশ।

লাব্বায়েক পরিবহনের ওই কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর দুই দিন কার্যালয়টি বন্ধ ছিল। এরপর কার্যালয়টিতে মিলাদ পড়ে আবারও কাজ শুরু করা হয়।

মেয়ে দুটি তাদের যাত্রাবাড়ীর বাসায় রয়েছে। তারা দুজনই সেখানকার একটি ফ্যান ফ্যাক্টরিতে কাজ করত। এখন তারা কাজে যায় না। মেয়েটির স্বজনেরা এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে চাননি।সূত্র: প্রথম আলো

ঢাকা, ১২ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ