দেশে হঠাৎ করে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে ধারণা করছেন সাধারণ জনগণ।
গত সপ্তাহে গোটা দেশের বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার কুটনৈতিক পাড়া এবং রংপুরে দু’জন বিদেশী নাগরিককে হত্যা সেই সাথে সরকার দলীয় এমপির গুলিতে এক শিশু আহত এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবিরি) সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খাঁনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ও অন্যান্য অপরাধের ভয়াবহতায় এখন আতংকিত ও উৎকন্ঠিত দেশবাসী।
তবে পুলিশ বলছে, কোন অপরাধ সংগঠিত হলে সেটার সুষ্ঠ তদন্ত করে একটি সুন্দর সমাধান দেওয়া পুলিশের কাজ। তবে এক্ষেত্রে সময়ের প্রয়োজন। যেহেতু আমরা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজ করি, সেহেতু তাদের অতংকিত হওয়ার কোন কারণ নেই।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কুটনৈতিক পাড়া গুলশানে তাভেলা সিজার (৫১) নামে ইতালির এক নাগরিক দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়।
ওই দিন সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে গুলশান ২ নম্বর সেকশনের ৯০ নম্বর সড়কে এ ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে স্থানীয় ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জানাযায়, তিনি নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক এনজিও আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি সংস্থার প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে গুলশানে কর্মরত ছিলেন। প্রায় প্রতিদিনের মতো বারিধারায় সুইমিং শেষে তাভেলা হেঁটে গুলশান ২ নম্বরের বাসায় ফিরছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সচিবলায়ে সাংবাদিকদের বলেন, ইতালীয় নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করা হবে।
এদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত যুক্তরাজ্যর নাগরিকদের সতর্ক করেছেন। দেশটির সরকারি ওয়েবসাইট গভ ডট ইউকেতে দেওয়া এক নির্দেশনায় বাংলাদেশে সাধারণ সন্ত্রাসী হুমকির কথা বলা হয়েছে।
বিদেশিদের যাতায়াতের স্থানসহ আরও বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার হামলা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে ওই নির্দেশনায়।
এতে যুক্তরাজ্য তার নাগরিকদের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত ও অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ করার পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল ও কনফারেন্স সেন্টারে নাগরিক জমায়েতে যোগদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়।
জানা যায়, হত্যা মিশনে অংশ নেওয়া তিনজনের মধ্যে দুইজনের পরনে ছিল কালো টিশার্ট এবং অন্যজনের গায়ে লাল-কালো টিশার্ট। তারা ৮৩ নম্বর সড়ক দিয়ে পালিয়ে যায়। তবে ঘটনাস্থল এবং তার আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ পরীক্ষা করছে পুলিশ।
ইতালিয় নাগরিক হত্যার দাগ যেতে না যেতেই গত ৩ অক্টোবর (শনিবার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুরের মাহিগঞ্জের নাচনিয়া বিলে রফিকিনিও নামে এক জাপানি নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তবে এ ঘটনায় চার সন্দেহ ভাজনকে আটক করেছে পুলিশ। রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন জানান, এ ঘটনায় পুলিশ বাড়ির মালিক জাকারিয়া বালা, ব্যবসায়িক বন্ধু হীরা, ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ির মালিক মুরাদ ও রিকশা চালক মোন্নাফকে আটক করা হয়েছে।
এদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলের ছোট ভাই স্থানীয় বিএনপি নেতা রাশিদুন্নবী খান বিপ্লব এবং নিহত জাপানি নাগরিকের বন্ধু ও সহকর্মী হুমায়ুন কবির হিরাকে দশ দিনের রিমান্ড দেয় রংপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু তালেবের আদালত।
এদিকে বাংলাদেশে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার নিন্দা জানিয়ে খুনিদের খুঁজে বের করার আহবান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
এর আগে ২ অক্টোবর (শুক্রবার) সকাল পৌনে ৬টার দিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা শহরের ব্র্যাক মোড়ের গোপালচরণ এলাকায় গাইবান্ধা-১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের গুলিতে সৌরভ নামে এক শিশু গুরুতর আহত হয়। গুলিবিদ্ধ শিশুটি ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র। সকালে সে রাস্তায় জগিং করছিল।
গুলিবিদ্ধ সৌরভ ওই উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের গোপালচরণ গ্রামের সাজু মিয়ার ছেলে। সে হুড়াভায়া খাঁ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র।
স্থানীয়দের কেউ কেউ জানান, সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন ঘটনাস্থলে হঠাৎ এক ব্যক্তিকে তার গাড়িতে উঠতে জোরাজুরি শুরু করেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি তার আচরণে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গাড়িতে না উঠে দৌঁড়ে পালায়। এতে ক্ষীপ্ত হয়ে তিনি তাকে লক্ষ্য করে পরপর দুই রাউন্ড গুলি ছোঁড়েন।
কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে রাস্তায় জগিংরত সৌরভের দুই পায়ে গিয়ে লাগে। আশে পাশের লোকজন ছুটে এলে সংসদ সদস্য গাড়ি নিয়ে দ্রুত সরে পড়েন।
সৌরভের চাচা সাজা মিয়ার অভিযোগ, প্রতিদিন তিনি সৌরভকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটাহাটি করে ব্যায়াম করেন। শুক্রবার ভোরেও তিনি সৌরভকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটছিলেন। কিন্তু এমপি লিটন হঠাৎ করে গুলি ছুড়ে কেন ওই ঘটনা ঘটালেন তা তার বোধগম্য নয়।
এদিকে আহত শিশুটিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রংপুর নিয়ে যাওয়ায় পথে সংসদ সদস্যের নিজ এলাকা বামনডাঙ্গায় তার লোকজন গাড়িটি দীর্ঘক্ষণ আটক করে রাখে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে শিশুটিকে রংপুর পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
এই ঘটনা গুলোর মধ্য দিয়ে সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বাসায় ঢুকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবিরি) সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খাঁনকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মধ্য বাড্ডার জ-১০/১ বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ওই খুনের ঘটনা ঘটে। বাড়িটির তিনতলাও তছনছ করে দুর্বৃত্তরা।
এ ব্যাপারে মঙ্গলবার গুলশান জোনের উপকমিশনার (ডিসি) এস এম মুস্তাক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, খিজির খানের হত্যাকাণ্ডের পেছনে তিনটি কারন রয়েছে। আর ওই তিন কারনকে সামনে রেখে তদন্ত কাজ করবে পুলিশ।’
তিনি বলেন, খিজির হত্যাকাণ্ডটি সুপরিকল্পিত। আমরা ধারণা করছি এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তিনটি কারন রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- সম্পতিপারিবারিক দ্বন্দ্ব অথবা ধর্মীয় কোন কারন। তাই এই তিন কারনকে সামনে রেখে তদন্ত কাজ শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এদিকে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আজ (মঙ্গলবার) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছে সরকার। ব্রিফিংয়ে এই দুই হত্যার নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কূটনীতিকদের কাছে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
এ সময় তারা কূটনীতিকদের জানান, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জাপানের নাগরিক হোসি কোনিও ও ইতালির নাগরিক তাবেলা সিজার হত্যা তদন্তের অগ্রগতি হয়েছে।
এছাড়া বর্তমানে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও স্বাভাবিক রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও কুটনীতিকদের আশ্বস্ত করেন মন্ত্রীরা।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৫ মার্চ গুলশান এক নম্বরে গুলিতে নিহত হন সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ আল আলী। তবে খালাফ আল আলীর বিচার কাজ এখনো অব্যাহত।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল হালিম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, দেশের এমন পরিস্থিতিতে আমার বলার কিছু নেই। আমাদের সাধারণ মানুষের কথা তো আর তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তারিফ ইশতিয়াক বলেন, আমাদের দেশের জন্য এমন ধরনের ঘটনা খুবই উদ্বেগ জনক। এর ফলে আমাদের দেশের ভাব মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে।
এসকল ঘটনার পরে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ জন্য আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সজাগ থাকা উচিৎ।
চাউলের ব্যবসায়ী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে কোন আইএস নেই। আমাদের দেশ একটি স্বাধীন দেশ। এখানে কোন আইএস থাকতে পারেনা। তাহলে আমাদের বাবা-দাদারা দেশ স্বাধীন করেছেন কেন।
দেশের এমন পরিস্থিতির বিষয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রব খান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলেই দেয় যে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুস্থ না। যেটা আরো ভালো থাকতে পারতো।
তিনি বলেন, বিদেশী নাগরীক নিহত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হলেও দেশে মানুষ হত্যা কিন্তু প্রায়ই হচ্ছে। সেই জন্যে আমি বলবো, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত ভালো কখনো ছিলো না। মাঝে মাঝে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। তবে এবার দু’জন বিদেশীকে নিয়ে ঘটনা ঘটার কারনে একটু বেশিই টনক নড়ছে।
তিনি বলেন, এক্ষেত্রে আইএস জঙ্গি সংগঠনের নাম চলে আসায় এটার বিশেষত্ব আরো বেড়ে গিয়েছে। এখানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দুর্বলতা প্রকাশ পায় যে তারা যদি আরও একটু দক্ষতার পরিচয় দিত তাহলে হয়তো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হতো।
ইতালিয় নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং হাই সিকিউরিটি পূর্ণ কুটনৈতিক এলাকায়। কিন্তু তারা কোন প্রমাণ রেখে যায়নি। এমনকি ওখানকার সিসি ফুটেজও স্পষ্ট না। এখানে পুলিশের ব্যর্থ না হলেও তারা আরো একটু দক্ষতার পরিচয় দিতে পারতো বলে তিনি ধারণা করছেন।
তবে তিনি এটাও বলেন যে, এটা আইএস এর কাজ হতে পারে না। তার মতে, দেশের মধ্যে যে সকল সংগঠন জঙ্গি কর্মকাণ্ড করছে এটা তাদেরই কাজ।
এই সম্পর্কে তিনি বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের দেশের জঙ্গি তৎপরতা পুরোপুরি ভাবে নির্মূলতো করতে পারেইনি বরং বিভিন্ন সময়ে ব্লগার হত্যার মধ্য দিয়ে তারা তাদের তৎপরতা জানান দিচ্ছে। এই সকল বিষয় বিবেচনা করে বলা যায় যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন উদ্বেগ জনক।
তবে এ সকল ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশের মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. নজরুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, পুলিশ কোন অপরাধের মূল কারণ সমাধান করতে পারে না। এর জন্য অন্য প্রতিষ্ঠান আছে। তারা যখন ব্যর্থ হয় তখন পুলিশ সমাধানের চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, আমরা খুব গুরুত্ব সহকারে তদন্ত কাজ করি এবং দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনি। তবে এক্ষত্রে সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
তবে তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, আমরা বিশ্বাস করি যে এসকল ঘটনার সাথে যারা জড়িত আমরা তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবো এবং এই কাজের মদদ দাতাদেরকেও ধরতে পারবো।
এমআর/এসএইচ





