জয়পুরহাটে চাঞ্চল্যকর ব্র্যাক ব্যাংকে ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনায় ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

আটককৃতরা হলেন রাজা মিয়া(৪৫), শ্রী বাদল মল্লিক ওরফে বাবলা(৪৯), মঞ্জুরুল হাছান শামীম(৩২), অনুপ চন্দ্র পন্ডিত(২১), প্লাবন চন্দ্র পন্ডিত(২৫), স্বপন দেবনাথ(৪০) ও এমকে কুদ্দসুর রহমান বুলু(৫২)।

গ্রেফতারকৃতরা ছাড়াও ইসলাম ও তাজ আহমেদ নামে আরও দু’জন পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এই দুধর্ষ ডাকাতি কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন শামীম ও রাজা মিয়া। তারা ব্যাংকের ভল্ট আনলক স্পেশালিস্ট। দীর্ঘদিন তারা এই পেশার সাথে জড়িত।

গ্রেফতারকৃতরা ডাকাত দলের সদস্যরা ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা লুট করেছিল বলে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তবে ব্যাংক ম্যানেজম্যান কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাদের ১ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা লুট করা হয়েছে।

ব্যাংকের ডাকাতির ঘটনায় র‌্যাব মোট ৫৬ লাখ টাকা উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেল চার’টায় র‌্যাব হেডকোয়াটারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান, লিগ্যাল মিডিয়া উয়িং কমান্ডার(পরিচালক) মুফতি মাহমুদ খান।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখ জয়পুরহাট শহরের কেন্দ্রস্থলে শাহজাহান ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে লাগোয়া পার্শ্বের মার্কেটের দেয়াল কেটে এ ডাকাতির ঘটনা ঘটে।

এই দূর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনাটি সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিত বিধায় ডাকাতরা কৌশলে বিভিন্নস্থানে আত্মগোপন করে থাকে। এ সকল বিষয়াদি বিবেচনায় রেখেই র‌্যাব গোয়েন্দা দল মূল রহস্য উদ্ঘাটনের নিমিত্তে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।

মুফতি মাহমুদ খান জানান, র‌্যাব গোয়েন্দা দল অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারে, জয়পুরহাটের ওই ডাকাতির মূল হোতা এবং ভল্ট অনলক স্পেশালিষ্ট রাজা মিয়া মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর এলাকায় অবস্থান করছে। উক্ত গোযেন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব-১১ এর একটি দল তাদের গত ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টায় মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলাধীন হাশারপাড়া এলাকা  রাজা মিয়াকে গ্রেফতার করে। পরে তার তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থান হতে অন্য ৬ জনকে আটক করা হয়।

তিনি জানান, জয়পুরহাটের ব্র্যাক ব্যাংক ডাকাতির মূল নায়ক রাজা মিয়া। রাজা মিয়া ২০০২ সালে চট্টগ্রামের জনৈক শুক্কুর আলীর নেতৃত্বে রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ ব্র্যাক ব্যাংক, কলাবাগান শাখায় শাহেদ আলম, হানিফ ও অন্যান্য ২০/২১ জনের সহায়তায় ২৫০ ভরি স্বর্ণালংকার লুটের সাথে জড়িত।

ওই সময় রাজা মিয়া ব্র্যাক ব্যাংক কলাবাগান শাখায় সুড়ঙ্গ কেটে ভিতরে ঢুকে ভল্ট ভাংতে না পেরে ড্রয়ারে রক্ষিত ২৫০ ভরি স্বর্ণ লুট করে। স্বর্ণ লুটের ২দিন পর উক্ত ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট রাজা মিয়াসহ ১৮/১৯ জন গ্রেফতার হয় এবং দেড় বছর কারাভোগ করে।

কারাগারে থাকাকালীন সময় শামীমের সাথে রাজা মিয়ার পরিচয় হয়। জেল থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর ২০১২ সালের দিকে শামীমের সাথে রাজা মিয়ার আকস্মিক দেখা হয় এবং শামীম তার মোবাইল নম্বর রাজা মিয়াকে দিয়ে যোগাযোগ করার জন্য বলে।

ঈদ-ঊল-আযহার ২০ থেকে ২৫ দিন আগে রাজা মিয়ার সাথে শামীমের ফোনে যোগাযোগ হয় এবং শান্তাহারে গিয়ে ব্যাংক ডাকাতির সাথে সংশ্লিষ্ট  তাজ, নওশের, ইসলাম, ইকবাল, বুলু ও স্বপন সাথে জয়পুরহাটে ভাড়াকৃত বাসায় পরিচয় হয়।

ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা থাকলেও টানা হরতালের কারনে ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়না। শামীম, রাজা মিয়া, নওশের, ইসলাম ও তাজ এই চক্রটি সাধারণত স্বর্ণালংকারের দোকান/ব্যাংক যেখানে নিরাপত্তা কিছুটা দুর্বল সে ধরনের স্থান খুজে বের করে ডাকাতির টার্গেট নির্ধারণ করত।

এরই ধারাবাহিকতায় ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী শামীম ও রাজা মিয়া তেমনই একটি টার্গেট হিসাবে জয়পুরহাটের ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা নির্বাচন করে। ডাকাতির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে ব্যাংক সংলগ্ন একটি বাসায় বাংলাদেশ পোর ডিভলপমেন্ট লিমিটেড নামের এনজিও অফিস দেখিয়ে ভাড়া নেয়।

পরিকল্পনা মোতাবেক শামীম মালিকের সাথে ঘর ভাড়া করার ব্যাপারে চুক্তি করে এবং বুলুকে ভাড়ার ৫/৬ হাজার টাকা দিয়ে ঘর মালিকের কাছে দিতে বলে। বুলু টাকা দিয়ে দোকানের চাবি ইসলামকে বুঝিয়ে দেয়। কুদ্দুসুর রহমান বুলু মূলত একজন দর্জি এবং বরিশালে বসবাস করে। এই পেশায় সে এই প্রথম জড়িযে পরে। ডাকাতি করার আনুমানিক ১০/১৫দিন পূর্বে রাজা মিয়া তার পূর্ব পরিচিত স্বপনকে দেয়াল কাটার লোক নিয়ে আসতে বলে।

স্বপন দেবনাথের সাথে রাজা মিয়ার পরিচয় আহমেদবাগ বৌদ্ধ মন্দির এলাকায় একটি চায়ের দোকানে ২/৩ বছর আগে। ঐ পরিচয়ের সূত্র ধরে মোবাইলে রাজা মিয়ার সাথে এই ডাকাতির ব্যাপারে যোগাযোগ হয়। স্বপন দেবনাথের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত স্বপন চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা, ইপিজেডসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সাধারণ আনসার সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছিল। সে সুবাদে মাইক্রোবাস চালক নওশেরের সাথে তার পরিচয়।

স্বপন, তাজ, নওশের দেয়াল কাটার কাজ হিসেবে জয়পুরহাটের গমন করে। ডাকাতির প্রায় ১ সপ্তাহের পূর্ব হতে ইসলাম, তাজ স্ক্রু ড্রাইভার ও শাবল দিয়ে দেয়াল কাটার কাজ শুরু করে এবং এই কাজ সম্পন্ন করতে তাদের প্রায় ৬দিন সময় লাগে।

দেয়াল কাটার পর ব্র্যাক ব্যাংকে প্রবেশ করার মতো সুড়ঙ্গ তৈরী করে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাত্রে তাজ মাহমুদ ও নওশের ব্যাংকে প্রবেশ করে সিসি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। কিছুক্ষণ পরই রাজা মিয়া ও ইসলাম আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি নিয়ে ভোল্টে প্রবেশ করে এবং ভোল্টের তালা ভেঙ্গে ফেলে। ভল্টের তালা ভাঙ্গার পর ভিতরে সাজানো ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা  নিয়ে ভাড়াকৃত ব্যাংক সংলগ্ন রুমে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে লুট করা টাকা ভাগাভাগি করে নিয়ে চলে যায়।

মুফতি মাহমুদ খান আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে রাজা জানায়, সে বিভিন্ন ডাকাতির কাজে মূলত: ভোল্ট আনলক স্পেশালিষ্ট হিসেবে কাজ করে। যে কোন ধরনের ভোল্ট/তালা সে ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে ভাঙ্গার যোগ্যতা রাখে।

রাজা মিয়া র‌্যাবকে আরও জানায়, লুট করা টাকা রাজা ৩১ লক্ষ, শামীম ৩৩ লক্ষ, ইসলাম ১২ লক্ষ ৫০ হাজার, তাঁজ মাহমুদ ৮ লক্ষ, এমকে কুদ্দুসুর রহমান বুলু ও ইকবাল ৩৩ লক্ষ, স্বপন ১৮ লক্ষ, নওশের ১৪ লক্ষ ও বাদল ৯ লক্ষ টাকা ভাগ পায়।

এখানে উল্লেখ্য যে, রাজধানীর বাড্ডা থানায় ২০০৫ সালে একট্ চুরির মামলায় তিন মাস জেল খাটেন শামীম। অপরদিকে ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর খানার গোডাউন লুট মামলায় জেল খাটেন এবং রিমান্ডে ছিলেন।

জেইউ