বাংলাদেশের প্রথম সিরিয়াল কিলার চাঁদপুরের রসু খাঁকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছে আদালত।
বুধবার দুপুর ১টার দিকে সহকারী জজ অরুনাথ চক্রবর্তী এ রায় দেন।
১১ নারীকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এ খুনি বর্তমানে চাঁদপুর জেলা কারাগারে। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৯টি মামলার একটির রায় হয়েছে আজ বুধবার।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পিপি অ্যাডভোকেট সাইয়েদুল ইসলাম বাবু। আর রসু খাঁর পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট নাঈমুল ইসলাম।
চাঁদপুরের মদনা গ্রামের ছিঁচকে চোর রসু খা ভালবাসায় পরাস্ত হয়ে এক সময় সিরিয়ার কিলারে পরিণত হয়। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তার লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের চিত্র বেরিয়ে আসে। নিজের মুখে স্বীকার করে ১১ নারী হত্যার কথা।
তার টার্গেট ছিল ১০১টি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর। কিন্তু ফরিদগঞ্জে পুলিশের হাতে ধরা পরার পর তার সেই আশা গুঁড়েবালিতে পরিণত হয়। রসু যাদের হত্যা করেছে তারা সবাই ছিল গার্মেন্টস কর্মী।
রসু ভালোবাসার অভিনয় করে নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের ঢাকার সাভার ও টঙ্গী এলাকা থেকে চাঁদপুরে এনে প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। হত্যার শিকার ওইসব হতভাগ্য মেয়েদের অধিকাংশেরই সঠিক নাম ঠিকানা বা পরিচয় আজো জানা যায়নি। এলাকাবাসী তার দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।
রসুকে গ্রেপ্তারের পর চাঁদপুর ও ফরিদগঞ্জ থানায় মোট ১০টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ১টি হত্যা ও অপরগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে। তার মামলাগুলো বিচারের জন্য চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হলে সেখানে একটি মামলার রায়ে রসু খালাস পেয়ে যায়।
এ অবস্থায় তার বাদবাকি মামলাগুলো চাঁদপুর আদালতে পুনরায় ফেরত পাঠিয়ে দেয় ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ১টি এবং অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে ৮টি মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে টঙ্গীর গার্মেন্ট কর্মী শাহিদা হত্যা মামলার রায় আজ।
রসু খান বর্তমানে চাঁদপুর জেলা কারাগারে রয়েছেন। তিনি সেখানে স্বাভাবিক আচরণ করছে বলে জানালেন চাঁদপুর জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক।
রসু খার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলোর মধ্যে ৮টি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ এবং একটি মামলা যুক্তিতর্ক গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। এসব মামলা কবে শেষ হবে তা কেউ বলতে পারছে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তাকিয়ে রয়েছে কবে হবে মামলার সমাপ্তি, আর তারা পাবেন স্বজন হত্যার বিচার।
আসামি পক্ষের আইনজীবী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট ফরিদগঞ্জের নানুপুর খালপাড়ে এনে ধর্ষণের পর খুন করা হয় খুলনার দৌলতপুরের সজলা গ্রামের সাহিদা বেগমকে। পরবর্তীতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। এরপর চাঁদপুর মডেল থানার তৎকালীন এসআই নজরুল ইসলাম বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই সময় মামলাটির তদন্ত সাপেক্ষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
পরে রসু খা ধরা পড়লে তাকে রিমান্ডে নেওয়ার পর সে এ ঘটনার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এর ভিত্তিতে ২০১০ সালে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়।
তদন্তশেষে এ মামলায় রসু খার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। দণ্ড বিধির ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করে স্বাক্ষগ্রহণ করা হয়। রসু খাঁর কৌঁশুলি না থাকায় আদালত সিনিয়র আইনজীবী মো. নইমুল ইসলামকে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে রসু খাকে আইনগত সহায়তা দেয়ার জন্য নিয়োগ করেন।
অ্যাডভোকেট নইমুল ইসলাম জানান, 'সোমবার মামলাটির যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। বুধবার রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অরুনাভ চক্রবর্তীর আদালত। আজ আদালত ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন।'
চুরির ঘটনায় ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর ঢাকার টঙ্গীর নিরাশপুর থেকে রসু খাকে আটক হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে সিরিয়াল কিলিংয়ের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য। একে একে ১১ জন নারীকে হত্যার ঘটনা স্বীকার করে রসু খাঁ। পরবর্তীতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমিরুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানন্দিতেও ১১ খুনের বর্ণনা দেয় সে। জবানবন্দিতে সে জানায়, তার ইচ্ছা ছিলো ১০১ নারীকে খুন করে সিলেট মাজারে গিয়ে সন্যাসী হওয়ার।
এএইচ





