চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পুলিশের ‘পাল্টা গুলি’তে আহত চারজন অভিযোগ করেছেন, হাতকড়া পরিয়ে রাস্তার পাশে তাঁদের পায়ে গুলি করা হয়েছে। তবে তাঁরা বলেছেন, গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছে ককটেল ও অকটেন ছিল। চারজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছেন। এখবর দিয়েছে প্রথম আলো।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চারজনের সঙ্গে গতকাল রোববার কথা হয়। এ সময় তাঁদের পাহারায় ছিল পুলিশ।
গত শনিবার রাতে সীতাকুণ্ডের নুনাছড়া এলাকায় পুলিশের ‘পাল্টা গুলি’তে চারজন গুলিবিদ্ধ ও একজন নিহত হন। পুলিশের দাবি, ওই দিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে পাঁচ যুবক ককটেল ফাটিয়ে নাশকতার চেষ্টা চালান। এগিয়ে গেলে পুলিশের ওপর জাহাজের সিগন্যাল লাইট ছোড়েন তাঁরা। এ সময় পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়।
গুলিবিদ্ধ পাঁচজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। নিহত মো. আরিফ হোসেন সীতাকুণ্ডের বারৈয়ারঢালা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক। গতকাল সকালে আরিফের স্ত্রী রাশেদা বেগম পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। আর বিকালে নিজ গ্রাম পশ্চিম লালানগরে দাফন হয় আরিফের।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ চারজন হলেন মো. রুবেল, মো. সোহেল, নুরুল হাদিস ও মো. পারভেজ। প্রথম দুজন দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের দাবি, একসঙ্গে ধরলেও ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় নিয়ে গুলি করা হয়। একজনের ভাগ্যে কী ঘটছে, অন্যজন তা জানতেন না।
হাসপাতালে মো. পারভেজ বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের নামার বাজার থেকে আমার বন্ধু সোহেল আমাকে সিএনজিতে (অটোরিকশা) তোলে। এ সময় গাড়িতে আরিফ ও হাদিসকে দেখতে পাই। কিছু দূর যাওয়ার পর পুলিশ সিগন্যাল (থামতে সংকেত) দেয়। সিএনজি থামলে আরিফ ও সোহেল দৌড় দেয়। পুলিশ তাদের জাপটে ধরে ফেলে।’
পেশায় নিজেকে রাজমিস্ত্রি দাবি করা পারভেজ বলেন, ‘পুলিশ আরিফের পকেট থেকে ককটেল উদ্ধার করে। গাড়িতে থাকা অকটেনের বোতলটিও উদ্ধার করে। এর পর আমাদের হাতকড়া পরানো হয়। একপর্যায়ে মারধর করে রাস্তার পাশে ফেলে পায়ে গুলি করে।’
পারভেজ বিএনপির সমর্থক হিসেবে সভা-সমিতিতে যেতেন বলে জানান। তাঁর বাড়ি সীতাকুণ্ডের বহরপুর এলাকায়। তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুতে গুলি লেগেছে।
নুরুল হাদিসের গুলি লেগেছে ডান পায়ের হাঁটুতে। সীতাকুণ্ডের পশ্চিম লালানগর এলাকার এই তরুণও অভিযোগ করেন, পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে তাঁদের গুলি করে।
নুরুল হাদিস বলেন, ‘আমাদের হাতকড়া পরিয়ে প্রথমে মারধর করে। পরে রাস্তার পাশে ফেলে হাঁটুতে গুলি করে। কোনো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেনি। আমাদের কাছে তিনটি ককটেল ও অকটেনভর্তি একটি বোতল ছিল। এগুলো কী কাজে নিচ্ছিল তা আরিফ জানেন।’
আরিফ তাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেন বলে নুরুল হাদিস দাবি করেন। আরিফের কাছে ককটেল থাকলেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল কি না, তা নুরুল হাদিস জানেন না বলে দাবি করেছেন।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি চালাচ্ছিলেন রুবেল। তাঁর বাড়ি শেখেরহাট এলাকায়। হাসপাতালে তাঁর মা নূর বানু বলেন, ‘আমার ছেলে এসব কিছুতে নেই। সে কাল সারা দিন বাড়িতে ছিল। সন্ধ্যায় গাড়ি নিয়ে বের হয়। এরপর এই ঘটনা।’ রুবেলও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
বহরপুর এলাকার মো. সোহেল পুলিশ দেখে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আরিফ আমাদের কী কাজে নিয়ে যাচ্ছিল জানি না। সিএনজিতে উঠে গাড়িতে অকটেন দেখি। কয়েকটি ককটেলও দেখতে পাই। পরে পুলিশ সিগন্যাল দিলে আমি ভয়ে দৌড় দিই। পরে পুলিশ ধরে এনে গুলি করে। আমাদের দিক থেকে কোনো গুলি হয়নি।’ রুবেলও পেশায় সিএনজি অটোরিকশাচালক।
নিহত আরিফের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে নাশকতা এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় দুটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোতালেব সরকার।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নুনাছড়ার যে অংশে শনিবার রাতে পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ ও পাল্টা গুলির ঘটনা ঘটেছে, গতকাল সেখানে গিয়ে আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের একজন শিম ব্যবসায়ী মো. রাসেল। মহাসড়কের পাশেই তাঁর বাড়ি। তিনি জানান, প্রথমে ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন তিনি। পরে বেশ কয়েকটি গুলির শব্দ শোনেন। ভয়ে তিনি ঘর থেকে বের হননি।
এসআই জানান, শনিবারের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে সীতাকুণ্ড থানায় তিনটি মামলা করেছে। হত্যা, পুলিশের ওপর হামলা ও মহাসড়কে নাশকতার ঘটনায় এসব মামলা হয়েছে।
গুলিবিদ্ধ চার তরুণের অভিযোগের বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হাসান দাবি করেছেন, তাদের অভিযোগ মিথ্যা। পুলিশের ওপর হামলা চালানোর পর আত্মরক্ষার্থে গুলি করা হয়। তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও অকটেন উদ্ধার করা হয়েছে।
ওসি জানান, আরিফের পায়ে গুলি লেগেছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হতে পারে।
এএইচ





