আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ি ডেটকো'র মালিক ফরিদপুরের শমসের আলী মোল্লার ছেলে শামসু মিয়া সময়ের ব্যবধানে ‘প্রিন্স মুসা বিন শমসের’ ওরফে মুসা বিন শমসের নামে খ্যাত। দেশ-বিদেশে রক্ষিত অঢেল সম্পদ এবং রাজকীয় ও জীবন যাপনের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
৩ নভেম্বর ‘প্রিন্স মুসা বিন শমসেরকে ধরার জন্য মাঠে নামে দুদকের অনুসন্ধানী টিম। আর ইতোমধ্যে দুদকের উপ-পরিচালক মীর মোঃ জয়নুল আবেদীন শিবলী আগামী ১৮ ডিসেম্বর সকাল ১০ টায় মুসা বিন শমসেরকে তলব করেছেন। দুদক মুসাকে ধরার জন্য কমপক্ষে ব্যবসায়িক ও ব্যাংকার ১০জনকে তলবি নোটিশ পাঠাবেন।
জানা যায়, মুসার রোলেক্সের ৫০ লাখ ডলার মূল্যের একমাত্র ঘড়ি পরিধান, ১০ লাখ ডলার মূল্যের সাড়ে ৭ হাজার হীরক খন্ড মন্ডিত ইউনিক মন্ট বাঙ্ক কলম। ৭০ লাখ ডলার মূল্যের অলংকার পরিধান, গোলাপ জলে গোসল ইত্যাদি বিলাসী জীবন যাত্রায় অভ্যস্থ, রহস্যে ঢাকা মুসার সম্পদ-রহস্য উদঘাটনে অনুসন্ধান করছে দুদক।
রাজধানীর গুলশানের বাড়িতে ২০ ফিট আয়তনের স্বর্ণখচিত ঝাড়বাতি, পরিধেয় জ্যাকেট, ব্যক্তিগত জেট বিমানে যাতায়াত, সুইস ব্যাংকে ৭ বিলিয়ন ডলার আটকে থাকা, টনিব্লেয়ারের নির্বাচনী ব্যায় নির্বাহের প্রস্তাব সবই বিত্ত-বৈভব আর বিলাসী জীবনযাত্রার নির্দেশক। বিশ্বের ‘হান্ড্রেড বিলিয়নিয়ার’র তালিকায় নাম নেই মুসার। দেশে তার বিনিয়োগ সম্পর্কেও ব্যাংকের কাছে তথ্য নেই।
জানা যায়, গত ২০১০ সালেও দুদক তাকে ধরার জন্য চেষ্টা চালায়। শুধুমাত্র সুইসব্যাংকে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মজুতের তথ্য-উপাত্ত ও ওই সময় পায়নি দুদককে।
তবে গত ১জুন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি ও বিটিভি ওয়াল্ডে প্রচারিত একটি সাক্ষাতকারে মুসার মন্তব্য দেশের অনেকর দৃষ্টি পড়ে তার উপর।
সাক্ষাতকারে মুসা বিন শমসেরের সুইস ব্যাংকে ফ্রিজ হয়ে যাওয়া ৭ বিলিয়ন ডলার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
জবাবে মুসা জানান, কোনো ব্যবসাই তার থেমে নেই। ওই টাকা ছাড়াতে পারলে বাংলাদেশের পদ্মাসেতু নির্মাণে বিনিয়োগ করবেন কি না। এমন প্রশ্নের জবাবে বলা হয়। প্রথমে পদ্মাসেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিলো ২.৯৭ মার্কিন ডলার বা সাড়ে ২০ হাজার কোটি টাকা। জবাবে মুসা বলেন, ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সত্যিই আমার কাছে বড় কিছু নয়।
গত জুলাইয়ে বিজনেস এশিয়ায় ‘প্রিন্স মুসা-সংখ্যা’য় উল্লেখিত তথ্য থেকে দুদক তার বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে অনুসন্ধানে নেমে রীতিমতো সমুদ্রে হাতরে বেড়াচ্ছে দুদক । খুঁজছে দেশের অভ্যন্তরে তার অর্থ-সম্পদের তথ্য।
গত ১৪ জুলাই ‘বিজনেস এশিয়া' ম্যাগাজিনে তুলে ধরা হয় মুসার ইতিবাচক সব তথ্য। বাংলাভাষীদের পাঠকের জন্য ম্যাগাজিনটিতে রয়েছে প্রতিটি প্রতিবেদনের বাংলা ভার্সন।
মুসা পরিবারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: ফরিদপুর শহরে বসবাসকারী পাকিস্তান আমলে তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মচারি শমসের আলী মোল্লার তৃতীয় ছেলে শামসু মিয়া। শামসু মিয়ারা ৪ ভাই ২ বোন। অন্যদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তার এক বোন কবি হাবিবউল্লাহ সিরাজীর স্ত্রী। মুসার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা। মুসার ২ ছেলে এক মেয়ে।
মুসার বড় ছেলে হাজ্জাজ বিন মুসা ববি (ববি হাজ্জাজ ) জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা। ববির স্ত্রী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। ছোট ছেলে আজ্জাত বিন মুসা জুবি। তার স্ত্রী সুমী নাসরিন। তিনিও ব্যবসায়ী। মেয়ে জাহরা বিনতে মুসা ন্যান্সি। বিয়ে হয়েছে আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ছেলে শেখ ফজলে ফাহিমের সঙ্গে। এ বিয়ে দেশের ইতিহাসে এক ব্যয়বহুল বিয়ে।
আরো জানা যায়, মুসার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের বাজার-সদাই করেন ব্যক্তিগত জেট বিমানে করে। অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য আয়ারল্যান্ড থেকে আনা হয় সুপেয় বোতলজাত পানি। ইটালি থেকে আনা রসালো জলপাই দিয়ে তৈরি হয় আচার। প্যারিস থেকে আনা হয় বোতলজাত সুগন্ধি পানি। রাজকীয় সেই ভোজ সভা দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত হয় গণমাধ্যম কর্মীদের মুখেমুখে।
গুরুর পা ছুঁয়েই সাফল্য: ১৯৫০ সালের ১৫ অক্টোবর পাকিস্তানের শামসু মিয়ার। ৬০ দশকে মধ্যবিত্ত পরিবারের টানা-পড়েনের ঢেঁউ দারুণভাবে আলোড়িত করে শামসু মিয়াকেও। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারি পিতা শমসের আলী মোল্লা সপরিবারে চলে আসেন পূর্ব পাকিস্তানে। স্থায়ী হন ফরিদপুর শহরে। পাকিস্তানে পড়াশুনা করা ২৩ বছরের তরুণ শামসু প্রতিষ্ঠা লাভের প্রত্যয়ে চলে আসেন ঢাকায়।
সম্পৃক্ত হন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়। ৮০ দশকের শুরুতে চলে যান মধ্যপ্রাচ্যে। জনশক্তি রপ্তানি শুরু করেন। প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে,পরে ইউরোপীয় দেশগুলোতে। ব্যবসার এক পর্যায়ে পরিচয় হয় সিরীয় বংশোদ্ভুত সৌদি নাগরিক আকরাম ওয়াজেহ’র সঙ্গে। আকরাম ওয়াজেহ অস্ত্র ব্যবসা করতেন। তাকেই ‘গুরু’ মেনে অস্ত্র ব্যবসায় নাম লেখান মূসা। গুরুর পা ছুঁয়ে সালাম করেন তিনি। ওয়াজেহ এখনো মূসার অস্ত্রব্যবসার প্রধান উপদেষ্টা।
বিশ্বের অন্তত ৩০টি দেশে তার ব্যবসা রয়েছে। বাণিজ্যিক অফিস রয়েছে ঢাকা, নিউইয়র্ক, জুরিখ, লন্ডন, মস্কো ও প্যারিসে। গালফ ইস্টিইম জেট বিমানে চড়ে অফিস করেন। সবগুলো শহরেই রয়েছে বাড়ী।
ঢাকার বনানীতে ব্লক-১, রোড-১ এর ৫৭ নম্বর বাড়িটি তার। প্রাসাদোপদম এ বাড়ির ভেতরটা যেন এক স্বপ্নপুরী। তুলনাহীন বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত মূসা একটি সাক্ষাতকারে দাবি করেন, তিনি কখনো মদের পাত্র স্পর্শ করেননি।
একে,এএইচ





