অর্ধশতাধিক দূর্নীতির অভিযোগ, চরম নৈরাজ্য আর লুটপাটের মধ্য দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম। সৎ এবং নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিস্ক্রিয় করে অদক্ষ, অযোগ্য, র্দুর্নীতি পরায়ন ও তদবীর বাজদের দিয়ে কারিগরি বোর্ড অফিসে চলছে লুটপাটের মহোৎসব।

বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ । যা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দৈনিক সমূহে প্রকাশিত হয়েছে । এতকিছুর পরও কোন শক্তিতে বহাল তবিয়তে বোর্ড চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ? পিছন থেকে কোন খুটির জোর কাজ করছে এমনটাই প্রশ্ন ভূক্তভোগিদের।         

মোস্তাফিজুর রহমানের স্বেচ্ছাচারিতা, বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি এবং মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্য, নামে-বেনামে ভূয়া বিলের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা আত্মসাৎ, হয়রানিমূলক বদলিসহ নানা অভিযোগে মুখ থুবরে পড়েছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ড।

গত মার্চে (২০১৫ইং) সাইক গ্রুপ ইন্সটিটিউটের মালিক আরেক দূর্নীতিবাজ আবু হাসনাত ই্য়াহিয়া ও স্ত্রী সোহেলী ইয়াসমিন অসৎউপায় অবলম্বন করে ৪০ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে এই মোস্তাফিজুর রহমানকে কারিগরি বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বসায়।

এই সুবাদে ইয়াহিয়া ও তার স্ত্রী সোহেলী ইয়াসমিন তাদের ঢাকার প্রতিষ্ঠান  স্থানান্তর করেন ময়মনসিংহে, যা বোর্ড নীতিমালায় নেই। এবং ইচ্ছেমতই তাদের প্রতিষ্ঠানের টেকনোলজি ও আসন বৃদ্ধি করেছে এবং নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান করে দিবে বলে অন্য মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার দালালী করছেন।

তিনি মূলত বেসরকারি পলিটেকনিক্যাল কলেজের অনুমোদন এবং মালিকদের সাথে যোগসাজস রেখে  নতুন নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন তদবির করে থাকেন। তার এ  তদবীর ও দালালীতে নতুন ৭টি বেসরকারি পলিটেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা পেলেও মূলত ২০১২ সালে ১টি  প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি ৬টি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনহীন অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

আরো অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অনিয়ম করে নিকটআত্মীয়-স্বজন এবং পছন্দের নিজস্ব লোক দিয়ে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকার ভূয়া কাজ করিছেন এ চেয়ারম্যান ।

একটি অনার বোর্ড তৈরীতে সবোর্চ্চ ২০/২৫ হাজার ব্যায় হওয়ার কথা। কিন্তু সেই অনার বোর্ড বানানো হয়েছে ১ লক্ষ টাকারও বেশি দিয়ে। এমনকি তার বাসায় ব্যবহৃত গৃহস্থলী সামগ্রী ও আসবাবপত্র তৈজসপত্রাদীও ক্রয় করেছেন বোর্ডের টাকায় । তার এসব অপকর্মে কেউ মুখ খুলতে চাইলে তার উপর নেমে আসে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র এবং নাড়াতে থাকেন বদলীর কলকাঠি। 

বোর্ডের বিভাগীয় প্রধানদের সাথে আলোচনা না করেই প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি টিভি বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে ।যা মূল খরচের চেয়েও তিনগুণ বেশি।

বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত কাজে দেশে এবং দেশের বাহিরে সফরে গেলে (অফিসে উপস্থিত না থেকেও) অতিরিক্ত কাজের নামে ভূয়া কাজ ও বিল দেখিয়ে লক্ষাধিক টাকা তুলে নেন বোর্ড চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব নায়েব আলী মন্ডলের যোগসাজসে বোর্ড চেয়ারম্যান বিভিন্ন র্দূর্নীতিতে জড়িত । সচিব নিজেও তার শশুর বাড়ির আত্মীয়, ভাতিজা, স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেসহ কয়েক দফায় অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় কারিগরি বোর্ডে নিয়োগ করেন ।

পরে চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানও বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তার আপন দুই বোন, বোনদের স্বামী, খালাতো বোন, খালাতো বোনের স্বামী, শ্যালকসহ নিকট আত্মীয় প্রায় ১ ডজন লোককে চাকরী দিয়েছেন কারিগরি অধিদপ্তরে । মোস্তাফিজুর রহমানের র্দূর্নতির খবর কারিগরি বোর্ডের সর্বজন বিদিত।

চেয়ারম্যান নিজে বোর্ডের গাড়ি ব্যবহার ছাড়াও পারিবারিক ভাবে চলার জন্য ২টি টয়োটো গাড়ি, ঢাকায় কয়েকটি ফ্ল্যাট, বিভিন্ন জায়গায় জমির মালিকানা, নিজের ছেলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আয় বহির্ভূত ২৬ লক্ষ ১২ হাজার ৮শত টাকা, ছেলের বিয়েতে পুত্রবধুকে ১০০ ভরি স্বর্ণ দেয়াসহ যাবতীয় অনিয়ম করে আসছেন।

আরো অভিযোগ রয়েছে, বোর্ড চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাবা নওগার মান্দা উপজেলার আজিজ ওরফে আইজ্জা একজন চিহ্নিত রাজাকার এবং আল বদর কমান্ডার ছিলেন । প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে এসব তথ্য রয়েছে ।

মোস্তাফিজুর রহমান তিনি যে শুধু কারিগরি বোর্ডে র্দূর্নীতি করতেন তা নয়। পূর্বে যেখানে কর্মরত ছিলেন সব জায়গায় পরিনত করেছেন র্দূর্নীতির স্বর্গরাজ্যে। উল্লেখ্য, দিনাজপুর পলিটেকনিক, রাজশাহী পলিটেকনিক, ঢাকা পলিটেকনিকসহ সয়ং কারিগর শিক্ষা বোর্ডও পরিনত হয়েছে র্দূর্নীতির আখড়ায়।

মোস্তাফিজুর রহমান বিল না পাওয়া স্বত্ত্বেও অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে ভূয়া ভাউসারের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বকেয়া বিল গ্রহন করছেন নিচে তার একটি বিবরণী দেয়া হলো :

২০১৫ ইং সালের ৩১ এপ্রিল সনদপত্র,নম্বরপত্র সংশোধন, ডুপ্লিকেট রেজি:কার্ড ও প্রবেশ সংক্রান্ত ১৬১৪ নং ভূয়া বিলে  ৩১ হাজার, একই বছরের ২ এপ্রিল উত্তরপত্র পূন:নিরীক্ষন সংক্রান্ত ১৩৬৪ নং বিলে ৩০ হাজার, ১৬ এপ্রিল  নম্বরপত্র লিখন বাবদ ১৪২৩ ন‌ং বিলে ৪০ হাজার (তিনি আনুপাতিক হারে কম পাবেন) ১৮ মে সনদ লিখন বাবদ ১৫৮৫ নং বিলে ৪৫ হাজার, ১৮ মে ৩৫ হাজার ৬শ টাকা, ২৫ আগস্ট নম্বরপত্রের বকেয়া সম্মানী বাবদ ৯ লক্ষ ৪০ হাজার ৩ শত টাকা,  ৩০ আগস্ট নম্বর পত্র বকেয়া সম্মানী বিল আংশিক বাবদ ৩ লক্ষ ২৮ হাজার, একই কাজে ৪৬৩ নং বিলে ২ লক্ষ১১ হাজার ৫শ টাকা নিয়েছেন।

বর্তমানে তার বিভিন্ন স্থাবর সম্পদ ছাড়া অস্থাবর সম্পদ রয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার।

স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে গাজীপুরের বোর্ড বাজারে ২ বিঘা জমি,  তেজগাওয়ে ২টি ফ্ল্যাট, এয়ারপোর্টের আশকোনাতে ১০ কাঠার প্লট ক্রয় (সূত্রনিখুত কথা-১৭-১২-১১ইং), নিজ জেলার নওয়াগারমান্ডা উপজেলার মইনাম গ্রামে অনেক জমি-জমা ক্রয় করেন এই সরকারি কর্মকর্তা ।

অভিযোগকারীরা জানায়, বোর্ড চেয়ারম্যানের বিভিন্ন র্দূর্নীতি আড়াল করতে এবং সামাল দিতে তার পালিত একটি সিন্ডেকেট রয়েছে বোর্ড অফিসে । যারা  চেয়ারম্যানের কথায় এবং শক্তিতে  বিভিন্ন র্দূর্নীতিতে জড়িত।

এ ব্যাপারে বোর্ড চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি ফোনে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে রাজী না হয়ে অফিসে যেতে বলে ফোন রেখে দেয়। পরবর্তীতে তাকে কোথায় আসলে পাবো এবং কয়টায় আসব এসব জানতে চাওয়ার জন্য বারবার ফোন করলেও তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি। 

এসএ/টাইম