"ওরা নাছিরকে মেরে ফেলেছে। ওদের হুমকিতে আমার পরিবারের সবাই ভয়ে এলাকা ছেড়েছে। আমাকেও হুমকি দিচ্ছে। মামলা তুলে নিয়ে যদি আমি এলাকা না ছাড়ি তবে আমাকেও মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিচ্ছে।"

কথাগুলো বলেন রাজধানীর ভাসানটেক এলাকায় নিহত নাছিরের বড় ভাই ও মামলার বাদী মো. মোশারফ হোসেন। বৃহস্পতিবার তার সাথে কথা হলে তিনি এসব কথা বলেন।

ছোট ভাইয়ের খুনীদের অনবরত: হুমকিতে রয়েছেন বলে জানান তিনি। "তোর ভাইরে মাইরালাইছি। তোরেও মাইরালামু। তখন মামলা চালানোর লোক পাবি না। তোর খোঁজও কেউ লইবো না।” গত বুধবার খুনিরা মোশারফকে বাসায় এসে এভাবেই হুমকি দিয়ে যায় বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট এলাকা সূত্রে জানা গেছে, খুনিদের হুমকিতে নিহত নাছির হোসেনের পরিবারই এখন ফেরারি জীবন যাপন করছে। সন্ত্রাসীদের অনবরত: হুমকিতে নিহতের একমাত্র ভাই মোশারফ ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা ভাসানটেক এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু সেই মোশারফও এখন হুমকিতে।

ভুক্তোভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব ঘটনার পরও হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীরা বীরদর্পে এলাকায় ঘুড়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের গ্রেফতারে পুলিশের কানমাথা নড়ছে না।

তবে কিন্তু পুলিশ বলছে, খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজহারভুক্ত আসামীদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। তবে বারবার অভিযান চালিয়েও আসামীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আসামীরা গা ঢাকা দিয়েছে।

ভাসানটেক থানায় নতুন যোগদান করা অফিসার ইনচার্জ(ওসি)আবুল কালাম আজাদ জানান, বস্তিতে মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে যারা জড়িত তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। খুব দ্রুত তাদের গ্রেফতার করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

মামলার বাদী ও নিহত নাছিরের বড় ভাই মো. মোশারফ টাইমনিউজবিডিকে জানান, আমার ভাই খুনের ঘটনার পর ৬ দিন অতিবাহিত হলো। খুনিরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের ধরছে না। এই হত্যাকান্ডের মূলহোতা বাবলু ও মামুনকে গ্রেফতার করতে পুলিশ কোনো চেষ্টা করছে না।

তিনি বলেন, নিজের নিরাপত্তা নিয়েই এখন শঙ্কায় আছি। ভাই খুনের সুষ্ঠু বিচার নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে মোশারফ বলেন, ‍"মামলা করেছি ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে। কিন্তু মামলা এজহার ভুক্ত হবার পর দেখি ৭ জনের নাম। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জহির রায়হান ৭ জনের নাম বাদ দিয়ে শুধু ৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা নিয়েছে।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, তিনদিন চুপ থাকার পর গত সোমবার পুলিশ আসামি দাঁতভাঙ্গা খোকনের বাড়িতে লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। কিন্তু আসামী ধরার নাম নেই।

তিনি জানান, মামলাটি ভাসানটেক থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) তদারকিতে থাকলে সুষ্ঠু তদন্ত হবে না। তিনি মামলার তদন্ত দায়িত্ব ডিবি পুলিশের কাছে দেয়ার দাবি জানান।

নিহত নাছির হোসেনের মা রিজিয়া বেগমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ছেলে খুন হবার পর থেকে পরিবারের অন্য সবাই আতংকে আছেন। মামলার আসামিদের বাড়ির কাছে বড় মেয়ের বাসা। আসামীপক্ষের লোকজন নানাভাবে হুমকি দিচ্ছিল। আতংকের কারণে তার মেয়ে এলাকা ছেড়ে টাঙ্গাইল চলে গেছে।

ভাসানটেক বস্তি এলাকায় হামলার শিকার একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, বস্তি ও এর আশপাশ এলাকায় মামুন ও বাবলু'র নেতৃত্বে মাদকের ব্যবসা চলে। চাঁদাবাজি, খুন ও ধর্ষণসহ নানা অপরাধে তারা অভিযুক্ত। প্রশাসনের সাথে যোগসাজশ করে এসব করে আসছে তারা। সে কারণে কখনো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় নি।

সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার স্থানীয় ব্যবসায়ী রতন খান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, কোরবানীর ঈদের আগে মামুন ও বাবলু’র লোক পরিচয় দিয়ে আমার দোকানে এসে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা।কিন্তু আমি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় ঈদের পরে দোকানে হামলা চালায় তারা। আমার ছোট ভাইকে কুপিয়ে জখম করে।

তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসন যদি এব্যাপারে আগে থেকে নজরদারি রাখতো তবে সন্ত্রাসীরা এতো বাড়তে পারতো না।

ভাসানটেক থানা পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, থানার টেলিফোন অপারেটর মখলেছুর রহমান অভিযানের খবর আগেই স্থানীয় সন্ত্রাসীদের জানিয়ে দেন। উর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষ ভাসানটেক এলাকায় সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসা বিরোধী অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে তা আগেই সন্ত্রাসীদের জানিয়ে দিয়ে তাদের সরে পড়তে সহায়তা করতেন। এক্ষেত্রে থানার ওসি ও কয়েকজন এসআই জড়িত ছিল বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভাসানটেক থানার অপারেশন অফিসার (এসআই) জহির রায়হান বলেন, খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

খুনিদের হুমকিতে ভুক্তোভোগী পরিবার এলাকা ছেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জহির রায়হান বলেন, শুনেছি নিহতের পরিবারের কয়েকজন সদস্য এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তবে এ বিষয়ে পুলিশকে কিছুই অবহিত করা হয়নি।

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মামলার এজহারভুক্ত এক আসামীকে গ্রেফতার করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, খুনের ঘটনার সাথে জড়িত আসামীদের খুব দ্রুতই গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

উল্লেখ্য, গত ৯ অক্টোবর ভাষানটেকে মামাতো বোনকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় সন্ত্রাসীরা নাছিরকে (২৫) পিটিয়ে হত্যা করে। ওই দিন ভাষানটেক থানায় বাদী হয়ে নিহতের বড় ভাই মোশারফ একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

তবে ওই ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সখ্যতা রয়েছে এবং ভাষানটেক এলাকায় একের পর এক অপরাধ ঘটছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে ১৩ অক্টোবর ভাষানটেক ফাঁড়ির একজন এসআই, পাঁচজন এএসআই ও ১৩ জন কনস্টবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

একই কারণে ভাষানটেক থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম নবীকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে একই অভিযোগে থানার ওসি হোসনে আরাকেও প্রত্যাহার করা হয়।

ভাসানটেক থানায় নতুন অফিসার ইনচার্জ(ওসি) আবুল কালাম আজাদ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ভাসানটেক এলাকার সন্ত্রাসীদের আতুরঘর হলো ভাসানটেক বস্তি। এই থানায় এসেই বস্তি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি।

কিছু পুলিশের সোর্স ও আগের কিছু পুলিশ সদস্যের সাথে সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ ছিল। পুলিশ সদস্যদের অপসারণ করা হয়েছে। পুলিশ সোর্সকেও বাদ দেয়া হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার নিসারুল আরিফ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ১৯ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আশা করছি মামলার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে নিহতের পরিবার বিচার পাবেন।

জেইউ