মোবাইল ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগে মো. রাজা (২০)কে পিটিয়ে হত্যা মামলার প্রধান আসামি হাজারিবাগ থানা ছাত্রলীগ সভাপতি মো. আরজু মিয়া (২৮) সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে র্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহতের ঘটনায় এলাকায় চঞ্চল্যেকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কেউই এ বিষয়ে তেমন কথা বলতে সাচ্ছন্দ বোধ করছেন না।
তবে তার দলীয় লোকজন তার নিহতের খবর শুনে রিতিমত হতবাক হয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি দলীয় কন্দোলও এটার কারণ হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
তবে স্থানীয় একটি সূত্র জানায় আরজু দীর্ঘ দিন যাবত ইয়াবা ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। আর যে ছেলেকে মোবাইল ও ল্যাপটপ চুরির দায়ে মারা হয়েছে সেও হিরোইনছি অর্থাৎ মাদক সেবি।
আরজুর সাথে এই মাদক ব্যবসা নিয়ে ওই ছেলের ঝামেলা হয়েছিলা। আর তারই জের ধরে রাজাকে মোবাইল ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।
সরেজমিনে জানা যায়, হাজারিবাগের গণকতুলি ৪৫/১/এ দুই তলা বাসার নিচতলায় বড় ভাই এবং মাসহ থাকতেন। আরজু দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। বাবা দু’মাস আগেই মারা গিয়েছেন। বড় ভাই মাসুদ চালের ব্যবসা করেন।
নিহত আরজু বোরহান উদ্দিন কলেজ থেকে অনার্স শেষ করে সরকারি কবি নজরুল কলেজে অ্যাকাউন্টিং এ মাস্টার্স করছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আরজুর দলীয় বড় ভাই মো. ইসমাইল টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আরজু একজন ভালো ছেলে ছিলেন। সে দক্ষ ও মেধাবী ছিলো। তার নামে কোন মামলা নাই। তাকে কেন হত্যা করা হলো জানি না। সামনে ২৬ আগস্ট তার মাস্টার্সের পরীক্ষা ছিল। প্রসাশন তাকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করেছে। আমরা এর বিচার চাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, নিহত রাজার মামার সাথে র্যাবের একটা আলাদা যোগাযোগ আছে। ওর মামাই র্যাবে ফোন দিয়ে আরজুকে হত্যা করিয়েছে।
হাজারিবাগ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াফেজ আহমেদ সামি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, তার সাথে আমি সবসময় থেকেছি কখোনো বিড়ি-সিগারেট খেত না। তার নামে থানায় কোন মামলা নেই। তাকে পরিকল্পিত ভাবেই হত্যা করা হয়েছে।
হাজারিবাগ ২২ নং ওয়ার্ডের কমিশনার তারিকুল ইসলাম সজিব টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আমি তো আরজুর পক্ষে বলতে পারি। আপনারা ওর এলাকার মানুষের কাছে খোজ নেন সবই জানতে পারবেন। তার নামে থানায় কোন মামলা আছে কিনা খোজ নিয়ে দেখেন। তাহলে জানতে পারবেন। তার নামে কোন মামলা নেই।
তিনি বলেন, আমার অফিসের সামনে থেকে হাজারিবাগ পার্কের গেট থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়। যার নামে একটা জিডি পর্যন্ত নেই তাকে কেন হত্যা করা হবে। এটা অবশ্যই পরিকল্পিত হত্যা। এখানে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। আমাদের দলীয় কোন্দলও এর কারণ হতে পারে।
আরজুকে গ্রেফতারের সময় প্রত্যক্ষদর্শী মুন্না টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আরজুকে যখন ধরে নিয়ে যায় তখন বিকেল ৫টা বাজে।
তখন সিভিল পোশাকে হাজারিবাগ পার্কের গেট থেকে র্যাব পরিচয়ে তাকে ধরে নিয়ে যায়। তবে সিভিল পোশাকে যারা আরজুকে ধরে তাদের পিছোনে র্যাব-২ এর একটি গাড়ি ছিল।
নিহত আরজুর বড় বোন রেহানা আক্তার জানান, সোমবার রাত একটার দিকে ৮ থেকে ৯ জন পুলিশ এসে আমাকে এবং আমার মাকে ওসি কথা বলবে বলে নিয়ে গেছে। নিয়ে যাওয়ার পর ওসি তো কথাই বলেনি আমাদের বসিয়ে রাখে।
পরে ফজরের আজানের পরে আমাদের কাছ থেকে সাদা কগজে সাক্ষর নিয়ে বাসায় চলে যেতে বলে। বাসায় আসার কিছক্ষন পরে ঢাকা মেডিকেল থেকে একজন আমার ছোট বোনের জামাইয়ের কাছে ফোন করে বলে যে, আমি মেডিকেল থেকে বলছি আরজু আপনার কি হয়।
তার প্রশ্নের উত্তর বলার পর উনি বলেন আরজু মারা গেছে। এখন মর্গে রাখা আছে আপনারা নিয়ে যান। তখন আমরা তো আকাশ থেকে পড়ছি।
আরজুকে গ্রেফতারের ব্যাপারে তার ছোট বোন নার্গিস আক্তার টাইমনিউজবিডিকে বলেন, সন্ধ্যা সড়ে ৬টার দিকে আরজুর সাথে আমার মোবাইলে কথা হয়।
আরজু বলে আমি কমিশনারের বাসায় আছি। তোরা মাকে দেখে রাখিস। তারপর থেকে ওর আর কোন খোঁজ পাচ্ছি না।
তবে চুরির অপরাধে রাজাকে মারার ব্যাপারে আরজুর বড় বোন রেহানা আক্তার বলেন, রাজা চুরি করছে এমনটা স্বীকার করায় তাকে তার চাচা শামিমসহ আরজু মারধোর করে। পরে আরজু ওকে ছেড়ে দিলেও রাজার চাচা তাকে বেধড়ক মারে।
তবে আরজুর ব্যাপারে তার দলিয় নেতারা যা বলেছেন তার বিপরিতে স্থানীয়রা তেমন মুখ খলতে নারাজ। সাংবাদিকদের সাথে তার ব্যাপারে অনেকে অনেক ভালো কিছু বললেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাক্তি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আরজু খুবই খারাপ একটা ছেলে ছিল। তাকে কেউ ভালবাসতো না এবং সে দির্ঘ্য দিন ধরে মাদক ব্যবসা করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যাক্তি আরও জানান, আরজু মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার ফলে রাজধানীর নিউমার্কেট থানায় তার নামে কয়েকটি মামলা রয়েছে।
তবে এ ব্যাপারে নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াসির আরাফাত খানের সাথে কথা বললে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আমি দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই থানার দ্বায়িত্বে আছি। তার নামে আমার থানায় এ পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি। তবে আমি দ্বায়িত্ব পাওয়ার আগে কোন মামলা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে কাগজ পত্র না দেখে কিছু বলা সম্ভব না।
তবে মোবাইল ও ল্যাপটপ চুরির অপরাধে যাকে মারা হয়েছে সেই রাজার ব্যাপারে এলাকাবাসী বলছে সে কামরাঙ্গি চরে তার দুলাভাইয়ের স্টিলের দোকানে কাজ করতো।
রাজার পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করে ওই স্টিলের দোকানে কাজ করে। তারা তিন বোন এবং দুই ভাই। বাবার নাম মো. বাবু। থাকেন একই এলাকার ৪৬ নং গণকতুলির বাসায়।
তার বাবা অসুস্থ থাকায় তার চাচা শামিমের সাতে কথা বললে তিনি বলেন, সোমবার সকালে আরজু আমাকে ফোন করে যেতে বলে। তখন আমি আর রাজার বড় বোন মিলে আরজুর বাড়ি যায়।
যাওয়ার পরে আরজুর মায়ের কাছে রাজার বড় বোন অনেক আকুতি করে বলে ছেড়ে দিতে। কিন্তু না ছেড়ে দিয়ে রাজাকে তারা বাড্ডা নগর আরজুর গোপন আস্তানায় নিয়ে বেধড়ক মারে এবং রাজার বড় বোনবে রাস্তা থেকেই তাড়িয়ে দেয়।
পরে বিকেল ৩টার দিকে রাজাকে বাড়ির সামনে ফেলে রেখে চলে যায়। তখন আমরা হাসপাতালে রাজার বাবার কাছে ছিলাম। রাজাকে দেখে ভাড়াটিয়া একজন আমাদের জানানোর পরে তাকে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যায়।
সকল ব্যাপারে হাজারিবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজি মাইনুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, রাজাকে হত্যার অপরাধে তার বোন বাদি হয়ে সোমবার রাত সাড়ে দশটার সময় আরজুকে এক নম্বর ও আরও পনের জনের নামসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামীকরে একটি হত্যা মামলা দ্বায়ের করেন। মামলা নম্বর ১৫।
তিনি বলেন, পরে আমরা এই মামলার ২,৩ ও ৪ নম্বর আসামীকে গ্রেফতার করি। তারা হলেন, মনির, সাগর এবং সুজন। তবে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে চাননি।
আরজুকে কারা গ্রেফতার করেছে এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, কারা তাকে গ্রেফতার করেছে সে ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।
উল্লেখ্য, মোবাইল ও ল্যাপটপ চুরির অপরাধে রাজাকে হত্যার সাথে জড়িত হাজারিবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. আরজু মিয়াকে সোমবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে আটক করতে হাজারীবাগে অভিযান চালানো হয়। র্যাবের উপস্থিতি বুঝতে পেরে আরজু গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে র্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি করে। এতে আরজু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
এমআর/এসএইচ





