রাজধানীর গোপীবাগে কথিত পীর লুৎফর হত্যাকান্ডের সাথে পূর্ব রাজাবাজারে ইসলামীফ্রন্টের নেতা ও ইসলামী অনুষ্ঠান উপস্থাপক শাইখ নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার উদ্দেশ্য অভিন্ন ও একই সূত্রে গাথা। গোপীবাগের হত্যাকাণ্ডের মতোই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে ফারুকী হত্যায়। একই কায়দায় অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
তবে পার্থক্য মাত্র একটি তাহল নূরুল ইসলাম ফারুকীর ইসলামী আদর্শ আহালে সুন্নি। অন্যদিকে কথিত পীর লুৎফর রহমান নিজেকে আল্লাহবাবা দাবি করতেন।
গোড়া আদর্শের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠি হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ধারণা করা হয়েছে।
তবে নিহতের পরিবার ও আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত নেতাদের দাবি, জামায়াত শিবির অথবা হেফাজতে ইসলামের মতো কোনো দলের নেতাকর্মীরা এ হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে।
তবে তাৎক্ষনিকভাবে ঘটনার সাথে কোনো ধরণের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করে হেফাজতের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের নেতা
আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, সব কিছুতে হেফাজতকে জড়িয়ে কথা বলা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই ঘটনার সাথে হেফাজতের দূরতম সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে জানান, মাওলানা ফারুকী হত্যাকান্ডের পর একটি মহল জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে মিথ্যা বক্তব্য প্রদান করছে। এঘটনার সাথে জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানান তিনি।
সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ফ্রন্ট নেতা ও টিভি উপস্থাপক শাইখ নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোপীবাগের ৬ খুনের ঘটনার সাথে ব্যাপক মিল খুঁজে পেয়েছেন তারা।
গোপীবাগে মুরিদ সেজে বাসায় ঢুকে ১০-১২ জন মিলে হত্যা করে কথিত পীর লুৎফর রহমানসহ (৬০) মোট ৬ জনকে। এ সময় বাসায় স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সবার হাত-পা বেঁধে একে একে হত্যা করা হয়। ফারুকী হত্যার ক্ষেত্রেও একই ধরণের হত্যার নকশা ধরা পড়েছে। গলা কাটা হয়েছে। দুই ঘটনাই ছিল মাগরিব নামাজের আজানের সময়।
অপরদিকে ফারুকী হত্যার ঘটনাও একই কৌশলে ঘটানো হয়েছে। হজ পালন ও ওয়াজ মাহফিলের দাওয়াত নিয়ে দুই দুর্বৃত্ত বাসায় প্রবেশ করে। পরে আরও ৫ জন প্রবেশ করে। এক পর্যায়ে সবার হাত-পা বেঁধে শুধু ফারুকীকে জবাই করা হয়।
এই সবই করতে হত্যাকারী সময় নেন প্রায় দুই ঘন্টা।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্তি উপ-কমিশনার আশিকুর রহমান বলেন, গোপীবাগ ও রাজারবাগের দুই হত্যাকান্ডের মধ্যে ব্যাপক মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। হত্যার রহস্য ও পরিকল্পনাকারী সম্ভব একই।
বাসায় প্রবেশ, সময় নিয়ে বাসার লোক জনের সঙ্গে কথা বলা এবং হাত-পা বাঁধা, এরপর ঠান্ডা মাথায় হত্যা এসবই মিলে যাচ্ছে। এসব কিছু মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, নিহত শাইখ নূরুল ইসলাম ফারুকী ছিলেন মিলাদ ও মাজার জিয়ারতের পক্ষে। একই সঙ্গে তিনি সুন্নিভিত্তিক সংগঠন আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতেরও নেতা ছিলেন। একারণে হিযবুত তাওহীদ, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের বিরোধিতা করতেন তিনি।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, হত্যার ঘটনা রহস্যজনক। ইসলামী আদর্শ থেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের মহাসচিব মাসুদ হোসেন আল কাদেরি বলেন, পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী সেলাফি, জামায়াতী, ওহাবি, শিবির, মাজারবিরোধী এবং ওলি-আউলিয়াবিরোধীরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা না হলে সারাদেশে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। কর্মসূচিতে কোনো অঘটন ঘটলে তার জন্য সরকার দায়ী থাকবে।’
যেভাবে হত্যা করা হয়:
ফারুকীর ছেলে ফয়সাল ফারুকী টাইমনিউজবিডিকে জানান, মাগরিবের সময় দু'জন অতিথি আসেন। তারা তার (ফয়সাল) বাবার সঙ্গে হজে যাওয়ার বিষয়ে কথা বলেন। এরপর আরও কয়েকজন আসার কথা জানায় তারা। এর পরেই বাসায় কলিং বেলের শব্দ। আব্বা দরজা খুলতেই ৭/৮ জন পিস্তল এবং রামদা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। এসময় আমরা পরিবারের ৫ সদস্য উপস্থিত ছিলাম।
অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সবার হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলে। ওই ঘর থেকে আব্বাকে মাঝখানের রুমে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের নিচে গলা কেটে হত্যা করে তারা পালিয়ে যায়।’ খুনিরা বাড়িতে লুটপাট চালায়। এ ঘটনার দুই দিন আগেও ওই দুই জন বাসায় এসে কথা বলে গেছেন বলে জানান তিনি।
আব্বা সত্যের কথা বলতেন। আব্বার কথা যারা অপছন্দ করতেন তারাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তার দাবি ধর্মীয় কারণেই তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত বলেও দাবি করে তিনি।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার সাংবাদিকদের বলেন, সব ধরনের বিষয়কে আমলে নিয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এখনই বলা যাচ্ছে না কী কারণে এবং কারা হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে।’
উল্লেখ্য, ১৯৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর পঞ্চগড় জেলার বড়শ্বশী ইউনিয়নের নাউতারী নবাবগঞ্জ গ্রামে আলহাজ মাওলানা জামশেদ আলীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ২ মেয়ে ও ৪ ছেলে। ছেলেরা হলেন- মাসুদুর ফারুকী, আহমেদ রেজা ফারুকী, ফয়সাল ফারুকী ও মো. ফুয়াদ ফারুকী। মেয়েরা হলেন- হুমায়রা তাবাচ্ছুম তুবা ও লাবিবা লুবা। তার প্রথম স্ত্রী রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় থাকেন বলে জানা গেছে। ঘটনার সময় তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে রাজবাজারের বাসায় ছিলেন।
ঢাকা, জেইউ, ২৮ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম,এসআর





