বনানীতে স্ত্রীকে হত্যার পর নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহননকারী ব্যবসায়ী আবদুর রবের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন আপাদমস্তক ব্যবসায়ী। রবের বাবা হাজি আবসার উদ্দিন ছিলেন রাজধানীর শীর্ষ ব্যবসায়ীদের অন্যতম। উপমহাদেশ ভাগের কারণে পারিবারিক ঐহিত্যের এই ব্যবসা পুরান ঢাকায় শুরু করেছিলেন তিনি।

ভোজ্য তেলের দোকান থেকে ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে শিল্পপতি বনে যান তিনি। গড়ে তোলেন আবসার গ্রুপ। বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাই আলাউদ্দিন আহমেদের হাত ধরে ব্যবসায় হাতেখড়ি হয় আবদুর রবের। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর ব্যবসার পুরো দায়িত্ব পড়ে আবদুর রবের উপর। কিন্তু তিনি ব্যবসায় সুবিধা করতে পারেননি। বরং ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। সম্প্রতি স্ত্রীসহ তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়।

পুলিশের ধারণা, বিপুল অঙ্কের ঋণের কারণেই পরিবারে অশান্তি চলছিল। সে কারণেই স্ত্রীকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন আবদুর রব।

নিহত দম্পতির মেজো ছেলে নাঈম আহমেদ মঙ্গলবার ক্যান্টনমেন্ট থানায় এ বিষয়ে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারেও পারিবারিক কলহে এ ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

গত সোমবার রাতে বনানী ডিওএইচএসের বাসা থেকে ব্যবসায়ী আবদুর রব ও তাঁর স্ত্রী রোকসানা পারভীনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওল্ড ডিওএইচএসের ৫ নম্বর রোডের ৬০/এ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে ৯ বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকতেন।

ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার নিহতদের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে পরিবারের কাছে। সন্ধ্যায় তাঁদের লাশ দাফন করা হয় বনানী কবরস্থানে। এ দম্পতির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় ভিন্ন কিছু আছে কি না, তা যাচাইয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গুলশানের বাড়িতে নাতিদের নিয়ে বসবাস করেন আবদুর রবের মা শহর বানু। সম্পত্তি বেচাকেনা নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ায় মাকে গুলশানের বাড়িতে রেখে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে আবদুর রব উঠেছিলেন বনানীর ফ্ল্যাটে। সেখানেই এ মর্মান্তিক এ ঘটনা।

পুলিশের উধ্বর্তন কর্মকর্তারা বলছেন, বনানী ৫ নম্বর রোডের যে ফ্ল্যাট থেকে দম্পতির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয়েছে, সেখানে অনেক আলামত ছিল। গুলিভর্তি পিস্তল, ব্যবহৃত গুলির খোসাসহ আলামত জব্দ করা হয়েছে।

গৃহকর্মী ফিরোজা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পুলিশেকে দেয়া তথ্য অনুসারে, দুপুরে খাবার না খেয়েই ঘরে ঢোকেন আবদুর রব ও স্ত্রী রোকসানা। এরপর আর দু'জনে ঘরের বাইরে আসেননি। কেউই তাঁদের ঘরে ঢোকে নি।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিহতদের গাড়িচালক সাইদুল ইসলাম জানান, ‘আবদুর রব সোমবার খুব সকালে বের হন। প্রথমে যান পুরান ঢাকার অফিসে। দুপুরের আগেই চলে আসেন। বাসায় ফেরার আগে রাওয়া ক্লাবে যান ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানসংক্রান্ত কাজে। এরপর বাসায় ফিরে আর বের হননি।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত দম্পতির তিন ছেলে নাফিজ আহমেদ রাজীব, নাইম আহমেদ ও নাজিম আহমেদ গুলশানে দাদির বাড়িতে থাকেন। এর মধ্যে গত সপ্তাহে বিয়ে করেন মেজ ছেলে নাইম আহমেদ।

আবদুর রবের আদি বসবাস বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জের কলাটিয়ায়। আবদুর রবের দাদার নাম হাজি নূর মোহাম্মদ। কলাটিয়া বাজারে তাঁর একটি মুদি দোকান ছিল। নূর মোহাম্মদের চার সন্তানের মধ্যে একজন হাজি আবসার উদ্দিন পাকিস্তান আমলে ছোট কাটরায় একটি ভোজ্য তেলের দোকান দেন। সেখান থেকে একটি লবণের মিল দিয়ে বড় ব্যবসায়ী হিসেবে উত্থান ঘটে তাঁর। তেল, লবণ, সিগারেটসহ অর্ধশত ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন তিনি।

পুরান ঢাকার জৈষ্ঠ ব্যবসায়ীরা জানান, বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে পুরান ঢাকার শীর্ষ ব্যবসায়ীদের একজনে পরিণত হন আবসার উদ্দিন। তিনি বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতেন। পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে ‘আবসার উদ্দিন মার্কেট’ নামে একটি মার্কেট আছে।

বিগত দশ বারো বছরে ধীরে ধীরে ব্যবসায় মন্দার দেখা দেয়। সম্প্রতি তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন। এমনকি ব্যক্তিগত ও ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে না পেরে প্রায়ই অপমানিত হচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে তিনি একটি প্রতিষ্ঠিত কম্পানির কাছে সহায় সম্পদ বিক্রি ও বন্ধক রেখেছিলেন। এরই সূত্রে গুলশানের বাড়িটি ওই কম্পানির কর্ণধার দ্রুত দখলে চাইছিলেন। এ ধরনের চাপের মুখে গুলশানের বাড়ি ছেড়ে তিনি বনানীর ফ্ল্যাটে ওঠেন।

আবদুর রবের চাচাতো ভাই শেখ আবুল হোসেন জানান, চার বছর আগে নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জের মুন্সীখোলায় আবসার গ্রুপের নামে ১০৫ বিঘা জমি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেন আবদুর রব। দুই কোটি টাকা বায়নানামা করে ১২ কোটি টাকার বিনিময়ে আবদুর রব ওই জমি বিক্রি করেন। এরপর ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করে ওই প্রতিষ্ঠান।

শেখ আবুল হোসেন আরও জানান, সম্প্রতি ১০৫ বিঘা জমির পাশাপাশি ওই প্রতিষ্ঠান গুলশানের ৯৫ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর দোতলা বাড়িটি ১৭ কাঠা জমিসহ তাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে দাবি করে। প্রতিষ্ঠানটি কৌশলে ১০৫ বিঘা সম্পত্তির খসড়া বায়নানামার মধ্যে গুলশানের ১৭ কাঠা সম্পত্তি লিখে রাখে। এ নিয়ে রব ও তাঁর মা শহর বানু আপত্তি জানায়।

কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ১৭ কাঠা সম্পত্তি রবকে ছেড়ে দিতে বলে। তা না হলে মামলা ও নানা ধরনের হুমকি দিতে থাকে। এ নিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন রব। একপর্যায়ে মা শহরবানুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু তাঁর মা কোনোভাবে রবের কথায় রাজি হননি। এ নিয়ে মায়ের সঙ্গে মতবিরোধ হলে বানানীতে ফ্ল্যাট কিনে স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সেখানে ওঠেন রব। এসব মিলে স্ত্রী রুখসানা পারভীনের সঙ্গে রবের চরম মতবিরোধ হয়।

এছাড়া ১৯৯০ সালে আবসার গ্রুপ ২০ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ নিয়েছিল। এ ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে সুদে আসলে শত কোটি টাকায় পৌঁছায়। মূলত ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের জন্যই নারায়ণগঞ্জের পাগলার মুন্সীখোলার ১০৫ বিঘা জমি খায়ের গ্রুপের কাছে মাত্র ১২ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেন আবদুর রব।

পুলিশের তৈরি করা সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিছানায় রুখসানার লাশ উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। ঘরের দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসানো অবস্থায় ছিল আবদুর রবের লাশ। রুখসানার বুকের ডান পাশে গোলাকার ও পিঠের ডান পাশে গভীর ছিদ্র রয়েছে। আবদুর রবের ডান কানের নিচে গোলাকার ছিদ্র রয়েছে। এই ছিদ্র মাথার বাঁ পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। এসবই গুলির চিহ্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে সুরতহাল প্রতিবেদনে।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, আবদুর রবের স্ত্রীর শরীরে চারটি গুলির চিহ্ন রয়েছে, আর আবদুর রবের মাথায় একটি গুলি। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা উদ্ধার হয়। এ ছাড়া মেঝেতে পড়ে ছিল আবদুর রবের ব্যবহৃত লাইসেন্স করা পিস্তল।

পুলিশের গুলশান জোনের উপকমিশনার লুৎফুল কবীর বলেন, স্ত্রীকে হত্যার পর আবদুর রব আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে সিআইডি ও ডিবির টিম তদন্ত কাজ করছে। পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক টিমও তদন্তে যুক্ত আছে।

ঢাকা, জেইউ, ৩সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসআর