৭১'র মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করতে ‘বাঙ্গালি মুজাহিদ’ বাহিনী গঠন করেছিলো বলে সাক্ষ্য দেন প্রসিকিউশনের তৃতীয় সাক্ষী মোঃ আবু আসাদ (৬০)।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনালে এই সাক্ষ্য গ্রহন করা হয়।
আদালতে স্বাক্ষীর জবানবন্দিতে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন। অপরদিকে আসামীপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান।
আবু আসাদ তার জবানবন্দিতে বলেন, অভিযুক্ত মাওলানা আবদুস সোবহানকে আমি আগে থেকেই চিনতাম। কেননা তিনি পাবনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতা ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল সকালে আনুমানিক ১০টার দিকে পাকিস্তানি আর্মি এবং মাওলানা সুবহান সাহেব অপারেশনের জন্য আমাদের গ্রাম জয়নগরে ঢোকে। তারা গ্রামে প্রবেশ করে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং গুলি করে মানুষ হত্যা করতে থাকে। এসময় ভীত সন্ত্রস্থ মানুষগুলো প্রাণ ভয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে। আমিও পালানোর সময় মাওলানা সোবহানের হাতে ধরা পড়ি। সুবহান আমাকে ধরে ইউনিয়ন বোর্ডের সামনে অপেক্ষমাণ একটি আর্মি ট্রাকে তুলে দেয়। তখন সেখানে পাকিস্তানি আর্মিরা দাঁড়িয়ে ছিলো।
এসময় আমার সাথে আরো ৫/৬ জনকে তারা তুলে নিয়ে যায়। এরপর বিকাল ৩/৪টা পর্যন্ত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে লুট করা গবাদি পশুসহ আমাদেরকে ট্রাকে করে পাকসি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে স্থাপিত আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। আর্মি ক্যাম্পে আমাদেরকে সোবহান ৩টি লাইনে দাঁড় করিয়ে বলেন,‘আমি মাওলানা আবদুস সুবহান, আমার বাড়ি পাবনা, আমি একজন মুসলান, তোমরাও মুসলমান জান প্রাণ দিয়ে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে হবে।
তোমরা আজ থেকে ‘মুজাহিদ’,আমার এই আদেশ তোমরা যারা পালন করবে তারা সব রকম সুযোগ-সুবিধা পাবে এবং যারা মানবে না তাদেরকে এই পদ্মা নদীতে গুলি করে ফেলে দেয়া হবে।’ আমি সহ উপস্থিত সকলে প্রাণ ভয়ে মাওলানা সুবহানের কথায় রাজি হই।
এরপর রাতের বেলায় পাকসি রেলওয়ে হাসপাতালে মাঠে বিভিন্ন তাবুর ভেতরে ৮/১০জন করে আমাদেরকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও বিহারীদের পাহারায় রাখা হয়।পরদিন সকাল থেকে পাকিস্তানিরা আমাদেরকে রাইফেল চালানোর ট্রেনিং দিত।এসময় আমরা দেখতাম প্রতিদিন ৫/৭জন যুবককে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে তাদের হাত ও চোখ বেঁধে নিয়ে আসা হত। পরে সুবহান একটি সাদা প্রাইভেট কারে আসত এবং মেজর জয়তুনের সঙ্গে পরামর্শ করে গভীর রাতে এলাকার মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে ওই যুবকদেরকে গুলি করে পদ্মা নদীতে ফেলে দিত। আমি নিজ চোখে দেখেছি কখনো সুবহান নিজেই আবার কখনো পাকিস্তানি সেনারা পিস্তল দিয়ে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করত।
আবু আসাদ আরও বলেন, আমরা বাঙ্গালি মুজাহিদ পালাতে চেষ্টা করেও পারিনি। পালানোর চেষ্টা করায় সুবহান আমাদের মধ্য থেকে ৫জন বাঙ্গালি মুজাহিদকে গুলি করে নদীতে ফেলে দেয়। এর মধ্যে ৪জন ছিলেন, হাশেম, কাশেম, রুস্তম ও মুজিবর।
তিনি বলেন, ১৫দিন ট্রেনিং নেওয়ার পর ২ মে, ১৯৭১ সালে ভোরবেলা বেশ কিছু ট্রাকে করে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদেরকে শাহপুরে অপারেশনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সুবহানও প্রাইভেটে করে আমাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। শাহপুর পৌঁছানোর আগে একটি ছোট নদী আছে নাম তার সুতগাং।নদীতে পানি থাকায় গাড়িগুলো পার হতে পারেনি। তাই পাক সেনাদের সঙ্গে আমরা নদীর এপারে গাড়ি পাহারায় থেকে যাই।
সুবহান সহ কয়েকজন পাক সেনা নদীতে পেরিয়ে যেতে থাকে। এসময় সুবহান সাহেবের হাতে একটি তালিকা দেখতে পাই যাতে অনেক মানুষের নাম লেখা ছিলো। সেবহান সাহেব সহ পাঞ্জাবি সৈন্যরা গ্রামে ঢোকার ১০-১৫ মিনিট পর গুলির শব্দ শুনতে পাই এবং অগ্নিসংযোগের কারণে ধোয়া দেখতে পাই।
এসময় মানুষদের দিক-বিদিক ছোটাছুটি করতে দেখি। বিকাল ৩টা সাড়ে ৩টার দিকে সুবহানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি সেনারা গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগী নিয়ে আমাদের প্রহরারত গাড়িগুলোর কাছে আসে। এরপর লুন্ঠিত মালামাল ও গবাদি পশু নিয়ে আমরা ক্যাম্পে ফিরে আসি। নদীতে তখন হাটু পানিও কম পানি ছিলো। শাহপুরের ঐ অপারেশনে অংশ নেওয়া বাঙ্গালি মুজাহিদদের কাছে শুনি এ অপারেশনে প্রায় ২০-২৫জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে চাঁন্দ্র আলী, রজব আলী, সামছুল প্রমূখের নাম আমার মনে পড়ে। ক্যাম্পে এসে সেনারা বলাবলি করছিলো তারা কিভাবে মহিলাদেরকে নির্যাতন করেছিলো।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালে আমি আমাদের বাঙ্গালি মুজাহিদদের মধ্যে থেকে ২জনকে রাইফেল সহ পালিয়ে যেতে সাহায্য করি। এতে আমাকে সন্দেহ করে ধরে পাক সেনারা আমাকে আটক ও নির্যাতন করে। সকালে মাওলানা সুবহান, খোদা বক্স ওরফে খুদু খা সহ বেশ কয়েকজন নেতাকে ক্যাম্পে ডেকে আনা হয়। তখন মাওলানা সুবহান আমাকে প্রশ্ন করে ও চড়-থাপ্পর মেরে জিজ্ঞেস করে, আমি তাদেরকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছি কিনা। আমি সব সময় বলেছি, আমি কিছুই জানিনা। এরপর আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। পরে মাওলানা সুবহান একটি কোরআন শরীফ এনে তা আমাকে ছুঁয়ে বলতে বলে, আমি তাদেরকে পালাতে সাহায্য করেছি কিনা। তখন আমি আল্লাহর কাছে মনে মনে মাফ চেয়ে কোরআন শরীফ ছুঁয়ে মিথ্যা বলি।
তখন মাওলানা সুবহান পাঞ্জাবিদের বলে, ওকে আপনারা ছেড়ে দেন ও কিছুই জানে না। এর কিছুদিন পর মাওলানা সুবহান একটি তালিকা অনুযায়ী হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা আড়ম বাড়িয়া গ্রামে পাঞ্জাবিদের দ্বারা হত্যাকান্ড ও অগ্নিসংযোগ চালায়। ঐ সকল অপারেশনে বাবার সামনে মেয়েকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ ও পরে হত্যা করতে আমি নিজ চোখে দেখেছি। এসময় আমরা গ্রামে পাহারায় থাকতাম যেন গ্রামের কেউ পালাতে না পারে। সুবহান আমাদেরকে বলতেন, আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের বাড়িঘর দেখিয়ে ও পুড়িয়ে দাও।
আবু আসাদ বলেন, এরপর ১৯৭১ সালের ২৮/২৯ নভেম্বর আমাকে এবং আরো কয়েকজন বাঙ্গালি মুজাহিদ এবং আরো কয়েকজন বয়ষ্ক পাকিস্তানি সৈন্যকে ব্রিজের ওপর পাহারা দিতে দেওয়া হয়।তীব্র শীতের কারণে পাকিস্তানি সেনারা ও কয়েকজন বাঙ্গালি মুজাহিদ শেডের নীচে অস্ত্র জমা করে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি তাদের ঘুমের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে স্তুপিকৃত অস্ত্র থেকে ২টি ও নিজের জন্য বরাদ্দকৃত অস্ত্রসহ সেখান থেকে দুই/আড়াই কিলোমিটার দূরে কাদিমপাড়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে কমান্ডর খায়রুজ্জামান বাবুর কাছে অস্ত্র পৌঁছে দেই। সেখানে আমি সুক্তিয়োদ্ধা ট্রেনিং নেয়ার জন্য তালিকাভুক্ত হই। কয়েকদিন পর দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। সেখান থেকে আমরা আমাদের তাবু গুটিয়ে পাকসি ফাঁড়িতে আসি। সরকার রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে আমি সহ ২৫জনকে চাকুরি দেয়। আমি যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং শেষ করতে পারিনি তাই আমি কোনো সনদ পাইনি।তবে মুক্তিযোদ্ধার পক্ষের শক্তি হিসেবে আমাতে চাকরি দেওয়া হয়। আমি ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি আর্মি ও মাওলানা সুবহানের কথায় বাধ্য হয়ে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দান করি।
জবানবন্দি শেষে সাক্ষ্যি মোঃ আবু আসাদ অভিযুক্ত মাওলানা সুবহানকে ডেকে সনাক্ত করেন।
২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পাশ থেকে সোবহানকে আটক করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
[b]ঢাকা, কেএ, ৬ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ
[/b]





