আইনি যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্টে) উপস্থাপনকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামকে ‘নরপশু’বলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।
তিনি বলেছেন, যুক্তিতর্কে এমন শব্দ চয়নে অভিযুক্ত যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন তার জন্য আমি দুঃখিত। অভিযুক্তকে কষ্ট দেয়ার জন্য এমন শব্দ চয়ন আমি করিনি। সে সময় (মুক্তিযুদ্ধের সময়) তার অপরাধের মাত্রা বোঝাতেই এমন শব্দ চয়ন করা হয়েছিল। তাতে যদি আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের অমান্য হয়ে থাকে সে জন্যও দুঃখ প্রকাশ করছি।
ভবিষ্যতে আর কোনো মামলার বিচারিক কার্যক্রমে এমন শব্দ চয়নে সচেতনতা অবলম্বন করবেন বলেও ট্রাইব্যুনালকে প্রতিশ্রুতি দেন তুরিন আফরোজ।
বুধবার ট্রাইব্যুনাল-১ এ এটিএম আজহারের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন তার আইনজীবী মো. শিশির মনির। তিনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শুরুতেই তুরিন আফরোজের শব্দ চয়নের বিষয়ে মৌখিক আপত্তি জানান।
এ সময় চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল বৃহস্পতিবার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে এ বিষয়ে মৌখিক ব্যাখ্যা দিতে বলেন। যদিও এ সময় তুরিন আফরোজ ট্রাইব্যুনালের এজলাসে উপস্থিত ছিলেন না। তবে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম সঙ্গে সঙ্গেই এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
এরপর আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু করেন আইনজীবী শিশির মনির। এর মাঝেই ট্রাইব্যুনাল-১ এর এজলাসে উপস্থিত হন তুরিন আফরোজ।
প্রথমদিনের যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এম ইনায়েতুর রহিম তুরিন আফরোজকে বলেন, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ গতকাল (মঙ্গলবার) যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে ‘নরপশু’শব্দটি ব্যবহার করেছেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তা বিভিন্নভাবে এসেছে। এতে আসামিপক্ষ মৌখিক আপত্তি জানিয়েছেন। তাছাড়া আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের জন্যও এমন শব্দ চয়ন ভালো না।
এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বৃহস্পতিবার আপনাকে থাকতে বলেছিলাম।
এ সময় তুরিন আফরোজ বলেন, আপনারা চাইলে এখনই আমি তার ব্যাখ্যা দিতে পারি। ট্রাইব্যুনাল তাতে সম্মতি দিলে তুরিন আফরোজ এর ব্যাখ্যা দেন।
ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তুরিন আফরোজ বলেন, ব্যক্তিগত অভিমত বা সিদ্ধান্তে এমন শব্দ চয়ন আমি করিনি। প্রসিকিউশনের সিদ্ধান্তেই আমি তা বলেছি। তাছাড়া আমি অভিযুক্তকে অপরাধী বলছি না, বলতে পারি না। সে সময় তিনি (এটিএম আজহারুল ইসলাম) যেসব অপরাধ সংঘটিত করেছেন তার ভয়াবহতার মাত্রা বোঝাতেই এমন শব্দ চয়ন করা হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যা উঠে এসেছে তাতে এমন শব্দ চয়ন অযৌক্তিক কিছু না।
তুরিন আফরোজ এসময় এমন শব্দ চয়নের বিষয়ে আরো বিশদভাবে বলতে গেলে গেলে চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, এ বিষয়ে বিশদভাবে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। উভয়পক্ষই হয়তো বিশদ সাবমিশন রাখতে পারবেন। গতকাল আপনি যখন এ শব্দ চয়ন করেছেন তখন আমরাও কিছুটা বিব্রতবোধ করেছি। কিন্তু আমরা বিষয়টাকে নিয়ে এগোতে চাই না। তাছাড়া আদালতে শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
চেয়ারম্যান বলেন, আমি শিল্প এতো ভাল বুঝি না। যতোটুকু বুঝি তাতে মনে হয়, যে শিল্পী তার শিল্পে যত কম আঁচড়ে অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটাতে পারেন তাকেই আমরা ভালো শিল্পী বলি। আপনারা কথা শিল্পী। অল্প কথায় অনেক কিছু বোঝাতে হবে।
এ সময় তুরিন আফরোজ বলেন, আমি অভিযুক্তকে হার্ট (আঘাত) করে কিছু বলতে চাইনি। যদি অভিযুক্ত এতে হার্ট (আঘাত) পেয়ে থাকেন তাহলে সে জন্য আমি দুঃখিত।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এ সময় সংবাদ মাধ্যমের শব্দ চয়ন নিয়ে বলেন, সংবাদ মাধ্যম একই বিষয় বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করে থাকে। অনেক সময় ভুলভাবেও প্রকাশ করে বা প্রচার করে থাকে। যেমন, বিচারকদের অভিশংসন নিয়ে সবাই কথা বলছে। কিন্তু সংবিধানের কোথাও কি ‘অভিশংসন’শব্দটা আছে? সংসদের হাতে ‘অপসারণের’ক্ষমতা রয়েছে। অভিশংসনের ক্ষমতা রয়েছে মহামান্য রাষ্ট্রপতির।
এরপর আগামী ১ সেপ্টেম্বর সোমবার পর্যন্ত আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
ঢাকা, ২৭ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেএইচ





