একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন বিষয়ে প্রথম দিনের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেছেন আসামিপক্ষ।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করেন। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেছেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান।
প্রথম দিন একটি অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের যুক্তি খণ্ডন করেন তিনি।
যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান মামলার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে এবং দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
এসময় আদালত বলেন, যে আটটি অভিযোগে তাকে সাজা প্রদান করা হয়েছে সে বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন।
অ্যাডভোকেট এসএম শাহাজাহন বলেন, প্রমাণিত আটটি অভিযোগ হল ৬,৭,৮,১০,১১,১৪,১৬ এবং ১৯। এর মধ্যে ৮ ও ১০ নং অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
এরপর অ্যাডভোকেট শাহজাহান ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপনের শুরু করে বলেন, এ অভিযোগে বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ৭ মে পিরোজপুর জেলার পাড়েরহাট বাজারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আসে এবং মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী শান্তি কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ নিয়ে পাকিস্তিানি সেনাবাহিনীকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর মাওলানা সাঈদীর দেখানো মতে পাড়েরহাট বাজারে আওয়ামী লীগ ও হিন্দুদের দোকানপাট ও বসত বাড়িতে আগুন দেয়।
এ ঘটনা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ১,২,৩,৪,৮,৯,১২ এবং ১৩ নং সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছে।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের ১ নং সাক্ষী মাহবুবুল আলম ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, ‘মে মাসের প্রথম সপ্তায় পাক হানাদার বাহিনী পিরোজপুরে আসে। ৭ মে সকাল বেলা আমি নিজ বাড়িতেই ছিলাম এবং লোক মুখে শুনতে পাই পাক হানাদার বাহিনী পাড়েরহাট আসিতেছে এবং পারের হাটের শান্তি কমিটির লোকেরা পাড়েরহাট রিক্সা স্ট্যান্ডে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে। আমি পাড়েরহাটে যাইয়া রিক্সা স্ট্যান্ডের আড়ালে থেকে গোপনে লক্ষ্য করিতেছি পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির লোকের দাড়িয়ে আছে। কিছু পরে একেকটি রিক্সা করে ২৬টি রিক্সায় ৫২ জন পাক হানাদার বাহিনী রিক্সা স্ট্যান্ডে নামে। শান্তি কমিটির লোকেরা তাদের অভ্যর্থনা জানায়।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1390908574.jpg[/img]
তিনি বলেন, সাক্ষ্যে বলা হয়, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী উর্দুভাষা ভাল জানতেন বিধায় ক্যাপ্টেন ইজাজের সাথে কথা বলেন। পরে বাজারের দিকে পাক হানাদার বাহিনী যেতে থাকে। শান্তি কমিটির লোকেরা বাজারের ভেতরের দিকে যায়। মুক্তিযোদ্ধার পক্ষের আওয়ামী লীগ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের দোকানঘর, বসতঘর ক্যাপ্টেন ইজাজকে দেখিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, সাক্ষ্যে আরো বলা হয়,ক্যাপ্টেন ইজাজ লুটের নির্দেশ দেয়। লুটপাট শুরু হয়ে যায়। আমি অকুস্থল থেকে কিছু দূরে সরে যাই। পরে জানতে পারি ৩০ থেকে ৩১টি দোকান ঘরের মালামাল, বসতবাড়ি লুটপাট করে সাঈদী সাহেবের নেতৃত্বে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়।’
অ্যাডভোকেট শাহাজাহন বলেন, সাধারনত পাকিস্তান আর্মি আসলে সে এলাকায় একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হত। মানুষ জীবন নিযে পালাত। কিন্তু এ সাক্ষী বলেছেন, তিনি গুনেছেন তারা ২৬টি রিক্সা যোগে এসেছে এবং প্রতি রিক্সায় দুজন করে মোট ৫২ জন সৈন্য ছিল। ২৬ টি রিক্সা এবং ৫২ জন আর্মি গণনা করা কি সম্ভব?
অ্যাডভোকেট শাহজাহান আরো বলেন, সাক্ষীর এসএসসি রেজিস্ট্রেশন ফর্মে জন্ম তারিখ লেখা রয়েছে ২০/৩/১৯৫৯। সে মোতাবেক ১৯৭১ সালের ২০ মার্চ তার বয়স ছিল ১২ বছর । রাষ্ট্রপক্ষের ১৩ নং সাক্ষী বলেছেন মাহবুবুল আলম স্বাধীনতার আগে স্কুল ছাত্র ছিলেন।
শাহজাহান বলেন, এ বয়সের একজন ছেলের পক্ষে ওই ঘটনা সেখানে অবস্থান করে দেখা,রিক্সা ও সৈন্য সংখ্যা গণনা করা কি তার পক্ষে সম্ভব ?
এ পর্যায়ে বিচারপতি সুরেন্দ্রকুমার সিনহা বলেন,আনবিলিভঅ্যাবল।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের ১ নং সাক্ষী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে মামলা করেছেন এবং পরে ট্রাইব্যুনালে তার দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এরপর অ্যাডভোকেট শাহাজাহান মাহবুবুল আলম এবং রাষ্ট্রপক্ষের অন্যান্য সাক্ষীদের জেরা থেকে মাহবুবুল আলমের সাক্ষ্যকে অসত্য প্রমাণের চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, সাক্ষী বলেছেন, ‘লুটপাট শুরু হয়ে যায়। আমি অকুস্থল থেকে কিছু দূরে সরে যাই। পরে জানতে পারি ৩০ থেকে ৩১টি দোকান ঘরের মালামাল, বসতবাড়ি লুটপাট করে সাঈদী সাহেবের নেতৃত্বে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়।’
কাজেই কাদের বাড়িঘর লুটপাট হয়েছে তা তার পক্ষে দেখা এবং বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া জেরায় তিনি বলেছেন মাখন সাহার দোকান লুটের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের দুই নং সাক্ষী রুহুল আমিন নবিনের সাক্ষ্যের যুক্তি খণ্ডন করেন অ্যাডভোকেট শাহজাহান।
এ সাক্ষী ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে বলেছেন, ‘৭ মে পারেরহাটের শান্তি কমিটির সেকেন্দার আলী শিকদার, দানেস মোল্লা, মাওলানা মোসলেহউদ্দিন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবসহ আরো কয়েজন পারেরহাটে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য রিক্সা স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে থাকে। ২৬টি রিক্সাযোগে প্রায় ৫২ জন পাক হানাদার বাহিনী পারেরহাটে প্রবশে করে।
সক্ষী বলেছেন, শান্তি কমিটির লোকজন পাক হানাদারদের নিয়ে পারেরহাট বাজারে প্রবেশ করে এবং আওয়ামী লীগ ও হিন্দুদের বাড়িঘর দোকানপাট দেখিয়ে দেয়। শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের দেখিয়ে দেওয়া ঘরগুলোতে শুরু হয় লুটপাট। পারের হাট বাজারের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মাখন সাহার দোকানের মাটির নিচের লোহার সিন্দুক থেকে ২২ শের স্বর্ণ ও রূপা লুট করে। ৩০/৩৫টি দোকান ঘর লুটাপাট চালায়। ’
অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, জেরায় সাক্ষী বলেছেন, মাখন সাহার দোকানে গর্ত করার খবরটা তিনি শুনেছেন বিকালে। আর ৩০/৩৫টি দোকান লুটের খবর তিনি জানতে পেরেছেন সন্ধ্যায়। তার মানে ঘটনার সময় সে সেখানে ছিল না এবং দেখেনও নি। তিনি শুনেছেন।
তাছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের ৯ নং সাক্ষী রুহুল আমিন নবিন সম্পর্কে বলেছেন ৭ মে’র অনেক আগে তিনি পাড়েরহাট ছেড়ে চলে গেছেন। ৯ নং সাক্ষী আরো বলেছেন, পাড়েরহাটে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে রুহুল আমিন নবিনের নাম তার মনে আছে। কাজেই ৯ নং সাক্ষী যে দাবি করেছেন অর্থাৎ ৭ মে’র আগেই নবিন পাড়েরহাট ছেড়ে চলে গেছে এটা স্বাভাবিক। কারণ যারা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজ করেছে ২৫ মার্চের পর তাদের এলাকায় না থাকাই স্বাভাবিক। কাজেই রুহুল আমিন নবিন ৭ মে পাড়েরহাট ছিলেন না এবং ওই দিন তিনি মাওলানা সাঈদীকে পাড়েরহাট দেখেছেন মর্মে যে ঘটনার বিবরন দিয়েছেন তা অসত্য।
তাছাড়া নুরুল হক মৌলভির যে মামুস স্টোরের সামনে দাড়িয়ে তিনি ঘটনা দেখার কথা বলেছেন তা তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি বলে জেরায় তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
যুক্তি উপস্থাপন অসমাপ্ত অবস্থায় মামলার কার্যক্রম আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি ছিলেন, জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান।
আসামিপক্ষে ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ মিঠু, সাইফুর রহমান, তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, তারিকুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক।
গত ২১ জানুয়ারী আসামিপক্ষের সময় আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ২৮ জানুয়ারী পর্যন্ত এ মামলার কার্যক্রম মুলতবি করেছিলেন।
ওই দিন সাঈদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান আসামিপক্ষের ১৬,১৭তম সাক্ষীর জেরা পড়ে শুনান।
গত বছরের ২৫ নভেম্বর সাঈদীর মামলার শুনানি করা হয়েছিল। পরে বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধের কারণে আর শুনানি করা হয়নি।
গত বছরের ২৪ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া ট্রাইব্যুনালের রায়ের ১২০ পৃষ্ঠা রায় পড়ে শোনান এ মামলার প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
গত বছরের ২৮ মার্চ সাঈদী ও সরকারপক্ষ পৃথক দু’টি আপিল (আপিল নম্বর: ৩৯ ও ৪০) দাখিল করেন।
গত বছরের ৩ এপ্রিল আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদনের সারসংক্ষেপ জমা দেন রাষ্ট্রপক্ষ। ১৬ এপ্রিল সারসংক্ষেপ জমা দেন আসামিপক্ষ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণের আটটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দু’টি অপরাধে সাঈদীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
[b]ঢাকা, জানুয়ারি ২৮ (টাইমনিউজবিডি.কম) // জিই[/b]
অপরাধ
রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন, যুক্তিতে এসএম শাহজাহান
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন বিষয়ে প্রথম দিনের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেছেন আসামিপক্ষ।





