রাজধানীর মগবাজারে সোনালীবাগে দুই পরিবারের মধ্যে তিনটি মাত্র কক্ষ নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়। ইটের গাথুনিতে টিনের ছাউনি ওয়ালা এই ঘর দখল নিয়েই সংঘটিত হলো তিন খুন।

তবে এই ট্রিপল মার্ডারের নেপথ্যে শুধু বাড়ি নিয়ে দ্বন্দ্ব বলে স্থানীয়রা ধারণা করলেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ। এর মধ্যে রেলের জায়গা দখল নিয়ে বিরোধ ছিল অন্যতম কারণ।

তবে নিহতের পরিবারের দাবি, চাঁদা না দেয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ তিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর এলাকাবাসী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টায় মগবাজার ওয়্যারলেস গেটের ৭৮নং সোনালীবাগের একটি বাসায় সন্ত্রাসীদের এলাপাথারি গুলিতে তিনজন নিহত ও একজন আহত হয়।  নিহতরা হলেন- বৃষ্টি আক্তার (৩২), মুন্না (২০) ও বেলাল হোসেন (২২)। গুলিতে আহত হয়েছেন হৃদয় হোসেন। আহত হৃদয় নিহত বৃষ্টির ছোট ভাই। তিনি ঢামেকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বৃষ্টি মগবাজার রেলওয়ে ইউনিট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কালা চানের বড় বোন।

পূর্ব রাজাবাজারে ইসলামী ফ্রন্ট নেতা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার না পেড়ুতেই বৃহস্পতিবার রাতে মগবাজারের সোনালীবাগে এই হত্যাকাণ্ড ঘটল। এঘটনায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবণতি ঘটেছে বলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বোতন কর্মকর্তারাও পড়েছেন বিপাকে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বোতন সূত্রে জানা গেছে, মগবাজার রেলক্রসিং এলাকার সোনালীবাগে অবস্থিত রেলওয়ের জায়গাটির দখল নিয়ে বিরোধ ছিলো কালা বাবু ওরফে কাইল্যা বাবু ও কালা চানের মধ্যে।

এ দুজনই শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সহযোগী। এদের মধ্যে আরেক নাটেরগুরু জড়িত ছিলেন সন্ত্রাসী রনি।কালাচানের কাছ থেকে জায়গাটির দখল নিতেই কাইল্যা বাবু গ্রুপের সন্ত্রাসীরা এ ঘটনা ঘটায়।

এ কিলিং মিশনে ১৫/২০ জন সন্ত্রাসী অংশ নিলেও মূল কিলিং মিশনের দায়িত্বে ছিলো ৬ জন। দুটি মোটরসাইকেলে করে এসে ৮/১০ রাউন্ড গুলি করে  পালিয়ে যায় তারা।

সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কালাচান, কালা বাবু ও রনি মগবাজার এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী। বিশেষ করে কালা বাবু ও রনির বিরুদ্ধে রমনা থানায় একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই মামলা রয়েছে। রনি মগবাজারের স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহাবুর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি।

এছাড়াও তার বিরুদ্ধে রাজারবাগ এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় মামলা রয়েছে। ওই ঘটনায় পুলিশ তাকে অস্ত্রসহ আটক করেছিল। যুবলীগের দক্ষিণ শাখার এক নেতার আর্শিবাদে সে চলাফেরা করে। কালা বাবু মগবাজারে আনসার সদস্য হত্যার সঙ্গেও জড়িত বলে দাবি স্থানীয়দের।

কালাবাবুর প্রতিদ্বন্দ্বী কালাচান এলাকায় যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধেও জায়গা দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এই তিনজনই এক সময়ের দুধর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সহযোগী। তবে জিসানের অবর্তমানে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

মগবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সব ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হত্যার সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে সম্পৃক্ত এই তিনজনের দলবল।

জানা গেছে, রেলের যে জমিতে কালাচান ঘর তুলেছে সেই জায়গাটি এক সময় কালা বাবুর নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে জায়গাটি রনি কালাবাবুর কাছ থেকে জোরপূর্বক দখল করে নেয়। পরে ৬/৭ মাস আগে কালাচান ৭০/৮০ হাজার টাকা দিয়ে রনির কাছ থেকে জায়গাটি কিনে নেয়। এরপর সেখানে ৪টি ঘর উঠায় কালাচান।

এ কারণেই কালাচানের উপর ক্ষিপ্ত হয় কালাবাবু। এরই জের ধরে কালা বাবুর অনুগত সন্ত্রাসীরা এই হত্যাকাণ্ডসংঘঠিত করে।

ঘটনাস্থলে কথা হয় ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি আবদুল খালেকের সাথে। তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, রেলের জমির দখল নিয়ে কালা চান ও কালা বাবুর মধ্যে ঝামেলা ছিল। কালা বাবু তাই দলবল নিয়ে এসে কালা চানের বোন বৃষ্টিকে গুলি করেছে।

স্থানীয়রা জানান, গুলি করে দু’টি মোটরসাইকেলে করে ৬ জন চলে যায়। আর বাকিরা বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে যে যার মত করে চলে যায়। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি লোহার রড ও লাঠিও ছিল।

নিহত বৃষ্টির চাচা শাহ আলম বলেন, এক মাস আগে থেকে কালা বাবু নামে এক সন্ত্রাসী দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেয়ায় কালা বাবু সদলবলে এই হত্যাকান্ড ঘটায়।

হত্যার ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল, শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান, উপকমিশনার কৃষ্ণপদ রায়, রমনা থানা পুলিশসহ, ডিএমপি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পুলিশের ক্রাইম সিনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে আলামত সংগ্রহ করেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়ার কথা জানান।

পুলিশের আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার জানান, দোষীদের গ্রেফতারে কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

ঘটনার পরপরই জড়িতদের সন্ধানে অভিযানে নামে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডির বেশ কয়েকটি টিম। ইতিমধ্যে সিআইডি একজনকে আটকও করেছে।

রমনা থানার ওসি (অফিসার ইনচার্জ) মশিউর রহমান জানান, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত (রাত ২টা) মামলা হয়নি। তবে মামলা না হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার ইকবাল হোসেন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, মগবাজারের খুনের ঘটনায় সম্পৃক্ত সন্দেহে দুই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তাদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল তাদের আটক রাখা হবে। তারা হলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী কালাবাবুর চাচি চায়না বেগম এবং চম্পা বেগম।

ঢাকা, জেইউ, ২৯ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম//এসএইচ