জালিয়াত চক্রের সহায়তায় রাতারাতি চিকিৎসক সিদ্দিকুর রহমান নামে এক মুক্তিযোদ্ধার বড়ি দখলের অভিযোগ উঠেছে ট্রাফিক পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) ওবায়দুল হকের বিরুদ্ধে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদী হাইজিংয়ের কাছ থেকে সাড়ে ৩ কাঠা জমি কেনেন মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক এসএম সিদ্দিকুর রহমান।কিন্তু জালিয়াতি চক্রের সহায়তায় সেটি দখলে নিয়েছেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) ওবায়দুল হক।

জানা যায়, অনেক কষ্টে জমানো অর্থ আর স্ত্রীর গহনা বিক্রির টাকা দিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদী হাইজিংয়ের কাছ থেকে সাড়ে ৩ কাঠা জমি কেনেন মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক এসএম সিদ্দিকুর রহমান। ’৯০-এর দশকে কেনা ওই জমির ওপর টিনশেড বাড়িও করেন তিনি। আর এই জমির ওপরই নজর পড়ে ট্রাফিক পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) ওবায়দুল হকের।

স্থানীয় কিছু জালিয়াত চক্রের সহায়তায় রাতারাতি চিকিৎসক সিদ্দিকুর রহমানের বাড়িটি দখল করে নিয়েছেন তিনি। শুধু দখলেই সীমাবদ্ধ নয়, বাড়ির হোল্ডিং নম্বর পরিবর্তন করে এখন সেখানে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। রাজউকের বর্তমান পরিচালক (প্রশাসন) ওয়ালিউর রহমানের সামনেই চিকিৎসক ও তার সন্তানকে মারধর করে জমিটি দখলে নেন ট্রাফিক পুলিশের ওই কর্মকর্তা ও তার সহযোগীরা।

এ ঘটনায় রাজউক, দুদক, পুলিশের সদর দফতর ও আদালতে আবেদন করে জমিটি ফেরত পাওয়ার আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মুক্তিযোদ্ধা ডা. সিদ্দিকুর রহমান। জমিটি যেন বেদখল না হয় সেজন্য রাজউক ও ঢাকার নিু আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওবায়দুল বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশের সদর দফতর থেকে একজন এআইজির নেতৃত্বে বিষয়টি তদন্ত হচ্ছে। সূত্র জানায়, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ট্রাফিক অফিসারের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের সত্যতা মিলেছে।

অভিযোগের বিষয়ে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ওবায়দুল হক বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আপনি প্রশ্ন করার কে? আপনি অনধিকার চর্চা করছেন। আপনাকে কিছু বলতে চাই না। এ নিয়ে অধ্যাপক ডা. সিদ্দিকুর রহমান পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগ দিয়েছেন।’

ভুক্তভোগী অধ্যাপক ডা. এসএম সিদ্দিকুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘১৯৯৫ সালের ২০ এপ্রিল মোহাম্মদী হাউজিংয়ের ৯ নম্বর রোডের ২০ নম্বর প্লটে ৩৩০ অযুতাংশ জমি কিনি। ১৯৯৮ সালের ১৯ জুন আমার স্ত্রীর নামে দেড় কাঠা ও পরে আমার নামে দুই কাঠা জমির নামজারি হয়। ওই জমির ওপর টিনশেড ঘর নির্মাণ করে আমার মায়ের নামে একটি দাতব্য হাসপাতাল (অজুফা খাতুন মেমোরিয়াল হাসপাতাল) স্থাপন করি। সেখানে একজন কেয়ারটেকারও রাখি।

তিনি বলেন, ওই কেয়ারটেকারের সঙ্গে যোগসাজশে ২০১৪ সালে পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের টিআই ওবায়দুল হক ও তার সহযোগীরা বাড়িটি রাতের অন্ধকারে দখল করে নেয়। বিষয়টি আদাবর থানার তৎকালীন ওসি গাজী রুহুল ইমাম এবং পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ওই সময়ের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকারকে জানাই। ২০১৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আদাবর থানায় জিডি করি। থানা পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নিলে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের কাছে অভিযোগ করি। ওই দিনই ডিএমপি কমিশনার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তেজগাঁও জোনের ডিসিকে নির্দেশ দেন। তার পরও ডিসির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, উপায়ন্ত না দেখে আদালতের শরণাপন্ন হই। গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি আদালত একটি আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, ‘অত্র মোকাদ্দমা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নালিশি তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি দখল, আকার-আকৃতি ও প্রকৃতির বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়া হইল।’ ওই নির্দেশ বহাল থাকলেও দখলদাররা ১০ তলা ভবন নির্মাণের কাজ অব্যাহত রেখেছেন। এরই মধ্যে পঞ্চম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওবায়দুল হকের নেতৃত্বাধীন চক্রের সদস্যরা জাল কাগজপত্র ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজউক থেকে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি নেন। সে অনুযায়ী ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করলে ডা. সিদ্দিকুর রহমান রাজউকে অভিযোগ দেন। অভিযোগ যাচাই শেষে রাজউক গত ৮ আগস্ট এবং ২৪ আগস্ট দুই দফায় ইমারত নির্মাণ ছাড়পত্র বাতিল করে। পাশাপাশি ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের সব কার্যক্রম স্থগিত করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশ দেয়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিআই ওবায়দুল হকের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে রাজউকের একজন অথরাইজ অফিসার ২৯ এপ্রিল ইমারত নির্মাণের অনুমতিপত্র দেন। বিষয়টি রাজউক চেয়ারম্যানকে অবগত করা হলে তিনি ওই জমিতে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে ২৯ আগস্ট একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সাবেক ডিসি বর্তমানে রংপুরের এসপি বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘জমি দখলের অভিযোগটি প্রায় পাঁচ বছর আগের। তাই এ নিয়ে বিস্তারিত কোনো কিছু বলতে পারছি না। আমার কাছে এ ধরনের অভিযোগ এলে সাধারণত আদালতের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি। ওই সময়কার ওসি যদি টাকার প্রস্তাব দিয়ে থাকে সেটা অপেশাদার কাজ করেছেন।’

আদাবর থানার তৎকালীন ওসি গাজী রুহুল বলেন, ‘বিষয়টি আমার ভালোভাবে মনে নেই। ওই সময় যদি কোনো জিডি হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) পরিচালক ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘পুলিশের সহযোগিতাতেই দখলের ঘটনা ঘটেছিল। টনাস্থলে গিয়ে আমি পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চেয়েও পাইনি।’

মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটির আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান বলেন, ‘প্লটটির প্রকৃত মালিক অধ্যাপক ডা. এসএম সিদ্দিকুর রহমান। সেটি দীর্ঘদিন ধরে তাদের দখলেই ছিল। এতদিন পর টিআই ওবায়দুর রহমান ও তার সহযোগীরা কীভাবে মালিকানা দাবি করছে আমার বোধগম্য নয়।’

পুলিশ সদর দফতরের এসপি সাদিরা খাতুন বলেন, আইজিপি মহোদয়ের নির্দেশে বিষয়টির তদন্ত করছি। শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করব। প্রতিবেদন জমা দেয়ার আগে এ নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না।
সূত্র: যুগান্তর

এমএম