৭১'র সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জামায়াতের কর্ম পরিষদ সদস্য ও  দিগন্ত মিডিয়ার কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলীর মামলার রায় যে কোন দিন ঘোষণা করা হবে বলে (সিএভি)অপেক্ষমান রেখেছেন ট্রাইব্যুনাল। 
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্র) ও আসামী উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) তে রেখে দেন।
সকাল ১১টায় আদালতে মীর কাশেম আলীর পক্ষে তার আইনজীবী তানভীর আহমেদ আল আমিন আইনী পয়েন্টে তার যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন।
পরে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শেষ করা হয়। উভয় পক্ষের যুক্তি খন্ডন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখার আদেশ দেন।
গত ২৯ এপ্রিল  মঙ্গলবার ও ৩০ এপ্রিল বুধবার মীর কাশেম আলীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। এ মামলায় গত ২৭ ও ২৮ এপ্রিল যুক্তি পেশ করেন প্রসিকিউশন।
সর্বশেষ যুক্তিতে তুরিন আফরোজ বলেন, বাঙ্গালী হয়ে যে বাঙ্গালী খানের তাবেদারী করে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড কামনা করছি। তিনি বলেন ৭১ সালে যে সকল  নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে তার একটি খন্ড চিত্র তুলে ধরা হয়েছে মীর কাশেম আলীর মামলায়।
আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষে উপস্থিত ছিলেন  সুলতান মাহমুদ সিমন, তাপস কান্তি বল, রেজিয়া সুলতানা চমন ও ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।
আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, মিজানুল ইসলাম,মো. আসাদ উদ্দিন, আবুবকর সিদ্দিক, আহমেদ বিন কাসেম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মামলাটি সিএভি করার পরে জেয়াদ আল মালুম বলেন, গত ২৭ এপ্রিল থেকে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে মোট ১৪টি অভিযোগের ১০টিতে যুক্তি খন্ডন করা হয়েছে। বাকী দুটি অভিযোগে দু‘জন কিশোর মুক্তিযুদ্ধাকে হত্যার ঘটনা বাদ  দিয়ে যুক্তি খন্ডন এবং প্রসিকিউশন থেকে আরও দুটি অভিযোগ প্রমান করা যাবে না মর্মে  যুক্তি উপস্থাপন করা হয়নি। পরে তুরিন আফরোজ লিগ্যাল পয়েন্টে যুক্তি খন্ডন শেষ করেছে।
মালুম বলেন, ওই সময় মীর কাসেম আলীর পরিকল্পানায় ও নির্দেশনায় ডালিম হেটেল, সালমা মঞ্জিলসহ বেশ কিছু নির্যাতন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। এসব নির্যাতন কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বজন ও সাধারণ মানুষকে ধরে এনে  নির্যাতন করা হতো। তাদের কাউকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হতো।
তুরিন আফরোজ বলেন, সবগুলোতে ভিকটিম, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ও দালিলিক প্রমাণসহ সকল ডকুমেন্ড উপস্থাপন করেছি। সকল সাক্ষীর জবানবন্দি অনুযায়ী ডালিম হোটেলে মীর কাশেম আলীর কর্তৃত্ব ছিলো। মীর কাশেম আলী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ওই সময়ের ঘটনায় ২০ জন সাক্ষীর ১৩ জনই ভিকটিম প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিল।
তুরিন বলেন মীর কাশেম আলীর নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ভিকটিম সাক্ষীর জবানবন্দি রয়েছে। তুরিন আফরোজ বলেন, স্বাধীনতা প্রিয় মানুষগুলো শুধুমাত্র বাঙ্গালী হওয়ার কারণে তাদের কে নিঃস্ব ভাবে হত্যা করা হয়।
তিনি বলেন, আসামী পক্ষে বলা হচ্ছে ৭ নভেম্বরের পর থেকে মীর কাশেম আলী ঢাকায় ছিলেন চট্টগ্রাম এলাকায় ছিলেন না। তিনি বলেন, মীর কাশেম আলী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে জড়িত থাকার যৌথ দ্বায়বদ্ধতার দ্বায় তিনি এড়াতে পারেন না। ওই নিঃস্বতার একজন ছিলেন মীর কাশেম আলী।
অপরদিকে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউশনের দাখিল করা ডকুমেন্টে ওই অঞ্চলের আলবদর কমান্ডার হিসেবে আরও তিন জনের নাম উল্লেখ থাকলেও মীর কাসেম আলীর নাম ছিল না।
তিনি বলেন, তাদের উপস্থাপিত ডকুমেন্ট অনুযায়ী তিনি আল-বদর কমানন্ডার বা আলবদর বাহিনীতে ছিলেন। সুতরাং ওই সময় ডালিম হোটেলসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলে বদর বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা যত নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে এর দায়ভার আসামি মীর কাসেম আলীর না। কারণ তিনি ওই সময়ে ৭ নভেম্বর থেকে ঢাকায় ছিলেন।
তাজুল বলেন আমরা প্রসিকিউশনের আনিত ডকুমেন্ট অনুযায়ী অকাট্ট্য প্রমান দেখিয়েছি যে তিনি তখন চট্টগ্রামে ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক নীল নকশার কারণে তাকে জড়িয়ে মামলা দেয়া হয়েছে।
তাজুল বলেন, ডালিম হোটেলের মালিক স্বাধীনতার পরে একটি মামলা করেছিল ওই মামলাটি ছিল (মইত্ব্য) মতি ঘুন্ডার নামে। যত অভিযোগ ছিল যে মতি গুন্ডা আমার হোটেল দখল করে নিয়েছিল। আর ওই অভিযোগের মামলায় মীর কাশেম আলীর নাম ছিল না। সে অনুযায়ী বুঝা যাচ্ছে যে প্রসিকিউশন মিথ্যাভাবে ‘উদুর পিন্ডি বুদুর ঘাড়ে’ চাপানোর চেষ্টা করছে।
গত ২২ এপ্রিল কাশেম আলীর পক্ষে তার বোনসহ তিনজন সাফাই সাক্ষী তাদের জবানবন্দি পেশ করেন। তার আগে মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা নুরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশনের  ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামিপক্ষ তাদের জেরাও করেছেন।
২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ওপেনিং স্টেটমেন্ট উপস্থাপন করা হয়। পরে ১১ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। আজ মামলায় যুক্তি (আর্গুমেন্ট) সময় মীর কাশেম আলীকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
গত ৫ সেপ্টেম্বর মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল-১ ।  পরে ৩০ সেপ্টেম্বর মামলাটি দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।  গত ১৬ মে প্রসিকিউশন টিম ১৪টি অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে। পরবর্তীতে ২৬ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে  ২০১৩ সালের ৬ মে মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪ টি অভিযোগে তদন্ত চুড়ান্ত করে তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশনের জমা দেয়।
গত বছরের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-১। ওইদিন বিকেলেই মতিঝিলে দৈনিক নয়া দিগনন্ত কার্যালয়ের (দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশন) থেকে তাকে গ্রেফতার করে বিকেলে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। 
[b]ঢাকা, কেএ, ৪ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ//এসএইচ[/b]