সপ্তাহের পর সপ্তাহ অতিক্রম করলেও দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার তদন্ত কাজে নেই কোন অগ্রগতী। তদন্ত কাজে কোন অগ্রগতি না হলেও বিদেশিদের নিরাপদে রাখার জন্য কড়া নিরাপত্তা প্রদানের জন্যে পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সদা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায় গুলশান এবং গুলশান কুটনৈতিক পাড়া এলাকায় প্রবেশ মুখে প্রতিটি রাস্তার মোড়ে রয়েছে পুলিশ চেকপোস্ট। তবে সাধারণ মানুষদের কেউ কেউ বলছে, কাউকে ধরতে পারছে না শুধু রাস্তাঘাটেই নিরাপত্তা।

পুলিশ বলছে, কাউকে আমাদের সন্দেহ হলে আমরা তাকে তল্লাশিকরছি। সন্দেহ জনক কিছু না পেলে আমরা ছেড়ে দিচ্ছি।

বনানী ১১ নম্বর রোড দিয়ে মটর সাইকেল দিয়ে গুলশানে যাচ্ছিলেন ইমরান ও তার বন্ধু রাকিব। টাইমনিউজবিডিকে তারা বলেন, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকাতো ভালো। শুধু এখনই নিরাপত্তা দিচ্ছে তা কিন্তু না। অধিকাংশ সময়েই দেখা যায় পুলিশের নিরাপত্তা মূলক চেকপোস্ট। তারপরও তো হত্যাকাণ্ড ঘটছে। কিছুই তো করতে পারছে না।’

অনেকে গোপন ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) ব্যাপারে দ্বিমত পোষণকরছেন। প্রশ্ন করছেন এসব ক্যামেরার কাজ এবং কর্মক্ষমতা নিয়ে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র ফাহিম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ‘গুলশান এলাকা হচ্ছে ভিআইপি এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সে হিসেবে এই এলাকার প্রতিটি সড়কে এবং স্থানে গোপন ক্যামেরা রয়েছে।

এত সব ক্যামেরা থাকার পরও ওই দিনের সঠিক ফুটেজ নাকি পাচ্ছে নাপুলিশ। তাহলে আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই ক্যামেরা গুলো কি ঠিক আছে? যদি ঠিক থাকে তাহলে এটার কাজ কি?’

বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ‘কত নিরাপত্তাই তো দেখছি। শুধু সাধারণ মানষের ভোগান্তি। যা হওয়ার তা নিরাপত্তা থাকলেও হয়, আবার না থাকলেও হয়। কাউকে ধরতে পারছে না শুধু রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা। প্রবাদ আছে উপরে ঠিকঠাক নিচে সদর ঘাট।’

নিরাপত্তার ব্যাপারে বনানী ১১ নম্বর রোডে চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা বনানী থানার সহকারি উপ পরিদর্শক (এএসআই) সোহেল টাইমনিউজবিডিকে জানান, ‘আমাদের নিরাপত্তা মূলক চেকপোস্ট সব সময় থাকে। তবে বিদেশী হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আমাদের চোখে কাউকে সন্দেহ হলে আমরা তাকে তল্লাশীকরছি। কিছু না পেলে ছেড়ে দিচ্ছি।’

গত ২৮ সেপ্টেম্বর (সোমবার) রাজধানীর কুটনৈতিক পাড়া গুলশানের ২ নম্বর সেকশনের ৯০ নম্বর সড়কে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে তাভেলা সিজার (৫১) নামে ইতালির এক নাগরিক দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে স্থানীয় ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

জানাযায়, তিনি নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক এনজিও আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি সংস্থার প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে গুলশানে কর্মরত ছিলেন। প্রায় প্রতিদিনের মতো বারিধারায় সুইমিং শেষে তাভেলা হেঁটে গুলশান ২ নম্বরের বাসায় ফিরছিলেন।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পরদিন মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সচিবলায়ে সাংবাদিকদের বলেন, ইতালীয় নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করা হবে।

এদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত যুক্তরাজ্যর নাগরিকদের সতর্ক করেন। দেশটির সরকারি ওয়েবসাইট গভ ডট ইউকেতে দেওয়া এক নির্দেশনায় বাংলাদেশে সাধারণ সন্ত্রাসী হুমকির কথা বলা হয়েছে। বিদেশিদের যাতায়াতের স্থানসহ আরও বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার হামলা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে ওই নির্দেশনায়।

এতে যুক্তরাজ্য তার নাগরিকদের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত ও অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ করার পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল ও কনফারেন্স সেন্টারে নাগরিক জমায়েতে যোগদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়।

ইতালিয় নাগরিক হত্যার দাগ না যেতেই গত ৩ অক্টোবর (শনিবার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুরের মাহিগঞ্জের নাচনিয়া বিলে রফিকিনিও নামে এক জাপানি নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে।

তবে এ ঘটনায় চার সন্দেহ ভাজনকে আটক করেছে পুলিশ। রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন জানান, এ ঘটনায় পুলিশ বাড়ির মালিক জাকারিয়া বালা, ব্যবসায়িক বন্ধু হীরা, ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ির মালিক মুরাদ ও রিকশা চালক মোন্নাফকে সন্দেহ মূলক আটক করা হয়।

এদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলের ছোট ভাই স্থানীয় বিএনপি নেতা রাশিদুন্নবী খান বিপ্লব এবং নিহত জাপানি নাগরিকের বন্ধু ও সহকর্মী হুমায়ুন কবির হিরাকে দশ দিনের রিমান্ড দেয় রংপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু তালেবের আদালত।

এছাড়া কোনিও হত্যার ঘটনায় রাজশাহীতে ৮ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) রাতে ব্র্যাক ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। দু’দিন পরে জিজ্ঞাসাবদ শেষে কোন তথ্য না পাওয়ায় ১০ অক্টোবর (শনিবার) সকালে তাদেরকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

এদিকে বাংলাদেশে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার নিন্দা জানিয়ে খুনিদের খুঁজে বের করার আহবান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

মূলত এই দুটি অনাকাঙ্খিত হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিশেষ করে কুটনৈতিক পাড়া নামে খ্যাত ঢাকার গুলশান এলাকায়।

সকল নিরাপত্তা এবং বিদেশী দুই নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বিশেষ করে ইতালিয় নাগরিক তাবেলা সিজার হত্যা তদন্ত কাজের অগ্রগতির ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া এণ্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) মুনতাসিরুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ‘তাবেলা হত্যার তদন্ত কাজের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন সাফল্যের কথা শোনাতে পারছি না। কিছু থাকলে আমরা ব্রিফিং করে জানাবো। অফিসিয়ালি বলার মতো এখন কিছু নেই।’

এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কে এবং তার সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত কাজের জন্য কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সকল তদন্ত কমিটির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোঃ মনিরুল ইসলাম। তাছাড়া এটার তদন্তে একজন কর্মকর্তা নিয়ম অনুযায়ি নিয়জিত আছেন কিন্তু তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ না।’

তাবেলা সিজার হত্যার পরদিন মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে ওই ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয় যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোঃ মনিরুল ইসলাম।

তাছাড়া তদন্ত কমিটিকে সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের বাছাই করা দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠন করা হয় একটি তদন্ত সহায়তা টিম। যার প্রধান করা হয় সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোঃ রেজাউল হায়দারকে।

পরে ৩০ সেপ্টেম্বর (বুধবার) ঢাকা মহানগর পূর্বের ডিসি মাহবুব আলমকে প্রধান করে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৫ মার্চ গুলশান এক নম্বরে গুলিতে নিহত হন সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ আল আলী। তবে খালাফ আল আলীর বিচার কাজ এখনো অব্যাহত।

এমআর/এসএইচ