চট্টগ্রামের রাউজানে বিয়ের ২১ দিনের মাথায় খুন হওয়া নববধু রিমা আকতার হত্যাকান্ডের রহস্যের জট অবশেষে খুলেছে। এই হত্যাকান্ডের মূল হোতা হিসেবে রিমার স্বামী আবু বক্করের মামী পারভিন আকতারকেই দায়ী করছে।

এনিয়ে স্বামী আবু বক্কর ২৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার নগরীর বিশেষ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ পারভেজের আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দী প্রদান করেন। পরে আদালত একই দিন জেল হাজতে প্রেরণ করেন। এই ঘটনাটি রিমার ভাই তৌহিদুল আলম সুজন প্রথম থেকেই পরিকল্পিত হত্যাকান্ড হিসেব দাবী করে আসছেন। একই দিন স্বামী আবু বক্কর, শাশুরী সেলিনা নাসরিন ও ভাই ইব্রাহিমকে হত্যা করার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। এজন্য ঘাতকদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তিও দাবী করেন তিনি।

রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ (পিপিএম) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস.আই খলিলুর রহমানের দক্ষতার দরুন শুক্রবার স্বামী আবু বক্কর দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে স্বামী আবু বক্কর মামী পারভিনকেই দায়ী করেছেন।

এতে আদালতে জবানবন্দির উদ্বৃতি দিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস.আই খলিলুর রহমান বলেন, স্বামী আবু বক্করকে আটকের পর থানায় নববধু রিমাকে হত্যার দায় স্বীকার করলেও বৃহস্পতিবার আদালতে এলোমেলো কথা বলেন। এতে তাকে আবারো রাউজান থানার দিকে নিয়ে আসার পথে হাটহাজারী এলাকায় পৌছলে তিনি নিজ দোষের কথা স্বীকার করবেন জানান। শুক্কুরবার স্পেশাল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ পারভেজের আদালতে হাজির করা হলে সেখানে হত্যার দায় স্বীকার করে ঘটনার বর্ণনা দেন।

জবান বন্দিতে তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই স্ত্রী রিমা আকতারের সাথে বনিবনা হচ্ছে না। এতে দুজনের মধ্য বিরোধ চলে আসছিল বিয়ের পর থেকেই। এতে স্বামী পক্ষের অভিযোগ ছিল নববধু রিমা আকতার রোগাক্রান্ত ছিল। এ বিষয়ে বিয়ের ২০ দিন পর অর্থাৎ রিমার মৃত্যুর একদিন আগে মঙ্গলবার দুপুরের আগে ছেলের (আবু বক্কর) মা সেলিনা নাসরিন ও মামী পারভিন আকতার এলাকার ইউসুফ দিঘীর পাড়ে এসে মেয়ের (রিমা) মা খালেদা আকতারকে খবর দেন। এবং এদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে মেয়ের মা রোগাক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি ঠিক হয়ে যাবে বলে আশ্বস্থ করেন। এ সময় তিনজনের মধ্য বাকবিতন্ডতা হয়।

এর এক পর্যায়ে ছেলের মামী পারভিন দেখিয়ে দিবে বলে মেয়ের মাকে হুমকি দেন। এ বিষয়ে একই দিন মঙ্গলবার রাত ১০ থেকে ১১টা পর্যন্ত আবু বক্কররের ঘরে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে রিমার স্বামী আবু বক্কর, মা সেলিনা ও মামী পারভিন ছিলেন। বৈঠকে বিভিন্ন কথা বার্তার এক পর্যায়ে সিন্ধান্ত হয় রিমাকে একেবারে দুনিয়া থেকে বিদায় দিবে।

২৪ সেপ্টেম্বর এই হত্যার নীল নকশা বাস্তবায় করায় হয়। জবানবন্দিতে বক্কর জানান, মামী পারভিন মঙ্গলবার রাতে চলে যাওয়ার পর বুধবার সকালেই ঘরে আসে। এতে তিনি প্রথমে (আনুমানিক সকাল সাড়ে ৯টা) ঘরে আসা মাত্রই বক্করের নববধু রিমা আকতারের বেডরুমের জানাল বন্ধ করে। এর পরপরই স্বামী বক্করের মা সেলিনা এসে দরজা বন্ধ করে পেলে। তখন স্বামী আবু বক্কর ও নববধু বেড রুমে অবস্থান করতেছে। সবকিছু বন্ধ করার পর রিমার মামী শ্বাশুরী বক্করের মামী পারভিন আকতার একটি ছেলোয়ার কামিজ দিয়ে রিমার দুই হাত বেধে পেলে।

এসময় রিমা চিৎকার করলে রিমার শ্বাশুরী বক্করের মা সেলিনা নারগিস রিমার মুখ চেপে ধরার সাথে সাথে স্বামী বক্কর পা লম্বা করে ছিপে ধরে। তখন রিমার মামী শাশুরী পারভিন একটি কালো ওরনা নিয়ে গলায় পেছিয়ে ধরে। এসময় রিমার মুখদিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। ছিপে ধরার ৩-৪ মিনিট পর যখন মনে হয়েছে রিমা মারা গেছে। তখন মামী পারভিন গলায় পেছানো একটি ওরনা দিয়ে রুমের উপর সিলিং ফ্যানের সাথে বেধে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার চালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে।

রিমাকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে মামী পারভিন আকতার চলে যান ফটিকছড়ির স্বামীর বাসায়, শাশুরী সেলিনা ঘরের স্বাভাবিক কাজ কর্ম করতে থাকে এবং স্বামী আবু বক্কর চলে যান ঘরের বাহিরে। স্বামী আবু বক্কর বাহিরে থাকা অবস্থায় শাশুর বাড়ী থেকে দুপুর ১২টার সময় মোবাইলে খবর আসে রিমার মোবাইল বন্ধ কেন। তখন তিনি বলে মোবাইলে চার্জ নাই। তখন তাকে বলা হয় রিমা গতকাল (মঙ্গলবার) ডিগ্রী পরীক্ষা ২য় বর্ষ থেকে ৩য় বর্ষে উত্তীর্ণ হয়। তখন স্বামী বক্কর উত্তরে বলে খুশি হলাম। আমি ঘরে গিয়ে রিমাকে মোবাইল দিচ্ছি। তখন স্বামী বক্কর ঘরে এসে শাশুরবাড়ীতে মোবাইল করে রিমা আত্মহত্যা করে বলার সাথে সাথে মোবাইল কেটে দেন। পরে এলাকাবাসি ও রাউজান থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্ত করে পরিবারের নিকট লাশ হস্তান্তর করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘটনার দিন স্বামী আবু বক্কর দীর্ঘক্ষণ বাহিরে থাকার অবস্থায় পরিবার থেকে ফোন আসে রিমা আত্মহত্যা করেছে। ঘরে এসে রিমার ঝুলন্ত লাশ দেখার পর বক্করের স্বাভাবিক আচরন ও রিমার মৃত্যুর সুরত-হাল দেখে তখন আত্মহত্যার বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তবে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার সময় স্বামী আবু বক্করকেও থানা হাজতে নিয়ে যায়। রাতে আবু বক্কর অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ সুপার আ.ফ.ম নিজাম উদ্দিন, ওসি প্রদীপ কুমার দাশ পিপিএমের কাছে রিমা ফাসিঁতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার চালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেও পরে হত্যার দায় স্বীকার করে জবান বন্দি দেন।

তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য তিনি অস্বীকৃত জানালে তাকে রাউজান থানায় ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন গত শুক্রবার তার জবানবন্দি নেয়া হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাউজান থানার উপপরিদর্শক খলিলুর রহমান জানান, প্রথমে এই ঘটনাটি ছিল রহস্যবৃত্ত হলেও স্বামী কর্তৃক নববধুকে হত্যা করে আত্মহত্যা প্রচার চালানোর ১০ ঘন্টার মধ্যেই রাউজান থানা পুলিশের কাছে স্বামী আবু বক্কর রিমাকে হত্যা করে ফাসিঁতে ঝুলানোর কথা অকপটে স্বীকার করে নেয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার আদালতে ঘটনার দায় স্বীকার করে সীকারোক্তি মুলক জবানবন্ধি দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে শুক্রবার আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম আদালতের কোর্ট পরিদর্শক উনু মং বলেন, বৃহস্পতিবার আবু বক্করকে আদালতে আনা হলে জবানবন্দি নেওয়া হয়নি। কিন্তু শুক্রবার বিশেষ আদালতে জবান বন্দি নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে রাউজান থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ পিপিএম জানান, আবু বক্কর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এই ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদে আনা (আটক) পারভিনকে এই মামলার আসামী করা হবে।

এদিকে ঘাতক স্বামী আবু বক্কর নিজে, মা এবং মামী মিলে নববধূ রিমা আকতারকে খুন করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখার কথা স্বীকার করলেও ধৃত মামী নিজের সম্পৃক্তার কথা চতুরতার সাথে এড়িয়ে চলছেন। পারভিন আকতার নামের এই মামীকে গতকাল শনিবার দুপুরে রাউজান থানা পুলিশ আদালতে হাজির করে। আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন।

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার মামী পারভিন আকতার তার সম্পৃক্ততার কথা কৌশলে এড়িয়ে চললেও তার ভাগিনা আবু বক্কর ও ভাগিনার মা সেলিনা আকতার, মামী পারভিন আকতার মিলে নববধূ রিমা আকতারকে খুন করেছে বলে স্বীকার করেছেন। ঘটনার তদন্তকারী অফিসার এসআই খলিল বলেন, ‘ঘটনার সাথে মামী পারভিনের সম্পৃক্ততার কথা স্বামী আবু বক্কর নিজেই স্বীকার করেছেন। তাছাড়া রিমা হত্যার বড় ইন্ধনদাতা মামী পারভিন।

তার স্বীকারোক্তি আমরা আদায় করার চেষ্টা করছি। তাকে রিমান্ডে আনার জন্যে আজ কালের মধ্যে আবেদন করা হবে।’ এদিকে পারভিন হত্যার মামলার অপর দুই আসামি ঘাতক স্বামী আবু বক্করের মা ঘাতক সেলিনা আকতার ও ঘটনার পরো সহায়তাকারী ভাই মো. ইব্রাহিম এখনো পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করছে বলে থানা পুলিশ জানিয়েছে।

রিমার পরিবার জানায়, রিমার শাশুড়ি ঘাতক সেলিনা আকতারকে গ্রেপ্তার করা হলে হত্যা রহস্য আরো স্পষ্ট হবে। এছাড়া ঘটনার মূল ইন্ধনদাতা ঘাতক মামী পারভিন আকতারের স্বীকারোক্তি নেয়া হলে পুরো হত্যার মোটিভ উদ্ধার হবে।

উল্লেখ্য প্রবাসি আবু বক্কর উপজেলার নোয়াজিশপুরের মুকিম তালুকদার বাড়ির বন্দর কর্তৃপক্ষের এম.এল.এস.এস হিসেবে চাকুরীরত মোহাম্মদ ইদ্রিসের পুত্র। নববধু রিমা আকতার একই উপজেলার চিকদাইর ইউনিয়নের আবদুস ছালাম সওদাগরের বাড়ির প্রবাসী আহমদ উল্লাহ ও খালেদা আকতারের দ্বিতীয় কন্যা। এই দুজনের সাথে চলতি মাসের ৪ তারিখে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেএ