সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা বলেছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যেভাবে স্বাধীনতা ভোগ করে বাংলাদেশে দুদক সেই অর্থে স্বাধীন নয়।
বুধবার দুপুরে দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ-২০১৫ উদযাপন উপলক্ষে দুদকের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক সংস্কার, দুয়ে মিলে হতে পারে দুর্নীতির প্রতিকার’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
ড. শামসুল হুদা বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন প্রকৃত অর্থে স্বাধীন। তারা আর্থিক কিংবা প্রশাসনিক কোনো বিষয়ে সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু দুদক প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেভাবে স্বাধীনতা ভোগ করে যে অর্থে দুদক স্বাধীন নয়। তাই অধিক কার্যকর হতে দুদককে সরকারের অধীন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে খারাপ বিষয় হচ্ছে লিগ্যাল কাজে ঘুষ দিতে হয়। আয়কর ফাইল ধরে ধরে ঘুষ নেওয়া হয়। কারণ যে ক্লার্ক কিংবা অফিস কর্মকর্তা চাকরি নিয়েছেন সে ঘুষের বিনিময়ে চাকরি নিয়েছেন। ফলে তাদের ঘুষ নেওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।
জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাঠ লেভেলের দুর্নীতির মাত্রা অনেক বেশি। এক্ষেত্রে জনগণ সরাসরি ভুক্তভোগী। তাই মাঠ পর্যায়ের দুর্নীতি দূর করা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, জনগণের আস্থা কেউ দিবে না। এটা অর্জন করতে হয়। তাই কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জনগণের আস্থা করতে হবে।
শামসুল হুদা বলেন, দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে দেশে প্রবৃদ্ধির কোনো সংযোগ নেই। দুর্নীতি দ্বারা ধনী লোকের চেয়ে গরিব লোক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশ্চাত্যের দেশে দুর্নীতির সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে এর ব্যাপকতা রয়েছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, দুর্নীতি রোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। দরকার দুর্নীতির বিস্তার রোধ করা। মানুষ দুর্নীতি করাকে ভয় পায় না। দুর্নীতিকে ভয় পেতে হবে। সেজন্য দুদককে দৃষ্টান্তমূলক কাজ করতে হবে।
সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, যখন কোনো দুর্নীতিবাজের খবর প্রকাশ করা হয়, তখন দুর্নীতিবাজ দ্বারা সাংবাদিকরা আক্রান্ত হন। কিন্তু গণমাধ্যম আক্রান্ত হলে কেউ পাশে দাঁড়ায় না। তাই আমাদের খবর যদি সত্য হয় আশা করছি দুদক আমাদের পাশে দাঁড়াবে। গণমাধ্যমকে সহায়তার জন্য মিডিয়া সাপোর্ট সেল গঠন করা হবে।
মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব্ মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, দুর্নীতি অনেকটা রাজনৈতিক ইস্যু। আমাদের দেশে রাজনীতি নানা অপসংস্কৃত দ্বারা আক্রান্ত। যে দেশের নির্বাচন নমিনেশনে টাকাওয়ালারা অগ্রাধিকার পায় সে দেশে দুর্নীতি দূর করা খুবেই দুরূহ কাজ।
দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা দৃশ্যমান কিছু উদাহরণ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খান আলোচ্য বিষয়বস্তুর ওপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দুদক অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করছে, কারণ তাদের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কাম্য স্বাধীনতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। যদি সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক অঙ্গীকার না থাকে তাহলে এটা অনস্বীকার্য যে, বিভিন্ন আঙ্গিকে স্বাধীনতার পরিসরে পিছিয়ে থাকা দুদক কখনই এককভাবে দুর্নীতির প্রতিকার করতে পারবে না।
দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দুদক কমিশনার (তদন্ত) মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ, ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত এম. জমির, প্রাক্তন সচিব ইনাম আহমেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি প্রফেসর আব্দুল মান্নান, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সাংবাদিক রাহাত খান, অধ্যাপক মাহফুজা খানম, অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, কলামিস্ট আবুল মকসুদ প্রমুখ।
কেএইচ





