সাভার এলাকা থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় পারভীন আক্তার (২৫) এসেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। কিন্ত সেখান থেকে অল্প টাকায় ভালো চিকিৎসার কথায় দালালের খপ্পরে পড়ে চলে যান একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এরপর পনেরো শ’ টাকা নিয়ে প্যাথলজী পরীক্ষা। ঘন্টাখানেক পরেই রিপোর্ট প্রদান।
অথচ খোজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির মাইক্রোস্কোপ নষ্ট এবং ব্লাড সেল কাউন্টার নেই, রক্তের স্লাইড বানানো ছাড়াই রক্তের TC, DC, WBC পরীক্ষার মনগড়া রিপোর্ট প্রদান করা হয়।
এভাবেই পরীক্ষা ছাড়া ভূয়া প্যাথলজি রিপোর্ট তৈরি ও ডাক্তারের স্বাক্ষর জাল করে প্রেসক্রিপশন প্রদান করে আসছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরস্থ ন্যাশনাল ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স এন্ড স্পেশালিস্ট কনসালটেশন সেন্টারের মালিক ও কর্মচারিরা।
বিষয়টি নজরে আসার পর ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অভিযান চালিয়ে মালিক আব্দুল বাকী বকুল(৪০) ও তার ব্যবসার সহযোগী টেকনিশিয়ান সামায়ন আলী (২২) কে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন(র্যাব)।
সোমবার র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়া পাশার নেতৃত্বে র্যাব-২ এ অভিযান পরিচালনা করে।
র্যাব-২ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসংখ্য রোগীকে ভুলভাল বুঝিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ডায়াগনেস্টিক সেন্টারে। এরপর ভুয়া প্যাথলজি টেস্ট পরীক্ষা। ডাক্তারের স্বাক্ষর জালিয়াতি, ভূয়া প্রেসক্রিপশন দিয়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা টাইমনিউজবিডিকে জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতিতে র্যাব-২ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বিপরীতে মোহাম্মদপুরের ১/৯ কলেজ গেট এলাকার ন্যাশনাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালায়।
এ সময় টেস্ট ছাড়াই প্যাথলজি রিপোর্ট তৈরি ও ডাক্তারের স্বাক্ষর জাল করে রিপোর্ট প্রদান এবং টেকনিশিয়ান ছাড়া অশিক্ষিত ব্যক্তি দিয়ে এক্স-রে করার দায়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আব্দুল বাকী বকুল এবং টেকনিশিয়ান সামায়ন আলীকে সাজা দেন।
আবদুল বাকী বকুলকে এক বছর কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা এবং টেকনিশিয়ান সামায়ন আলীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এব্যাপারে অভিযুক্ত টেকনিশিয়ান সামায়ন আলী জানান, মাসখানেক আগে মাইক্রোস্কোপটি নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এরপর আর তা ঠিক করা হয় নি বা নতুন কেনা হয়নি। অনুমানের উপর নির্ভর করে পরীক্ষা ছাড়াই মনগড়া রিপোর্ট তৈরী করে আসছেন তিনি।
তিনি বলেন, প্যাথলজি ডাক্তার সাইফুল ইসলামের সীল ব্যবহার করে তার স্বাক্ষর জাল করে ভূয়া রিপোর্ট প্রদান করেন। রোগীদের কাছ থেকে রক্ত, মুত্র ইত্যাদি লোক দেখানো সেম্পল নেয়া হলেও তা বালতিতে ফেলে দিয়ে কম্পিউটার থেকে মনগড়া রিপোর্ট প্রিন্ট করে দেয়া হয়।
ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা জানান, নিয়ম অনুযায়ী একজন প্যাথলজি ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে টেকনিশিয়ানের সহযোগীতায় প্যাথলজি পরীক্ষা বাধ্যতামুলক হলেও প্যাথলজি ডাক্তার ছাড়াই মনগড়া রিপোর্ট প্রদান করা হচ্ছে এবং উক্ত রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ডাক্তার ঔষধ প্রদান করছেন।
রোগীদের কাছ থেকে পাওয়া টাকার ভাগের কমিশন দালালরাও পেয়ে থাকেন বলে অভিযুক্ত মালিক বকুলের বরাতে জানান তিনি।
তিনি আরো জানান, সরকারি হাসপাতাল এলাকায় চার শিফটে প্রায় এক হাজার দালাল সক্রিয় আছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসলে সরকারি হাসপাতালের গেট থেকে দালালরা রাস্তার অপর পাশে বেসরকারি ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টারে নিয়ে গিয়ে নাম সর্বস্ব চিকিৎসা দিয়ে হাতিয়ে নেয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি ডা. স্বপন কুমার উপস্থিতিতে র্যাব-২-এর উপ-অধিনায়ক মেজর সৈয়দ সালাহউদ্দিন মাহমুদ এ অভিযান পরিচালনা করেন।
মেজর সৈয়দ সালাহউদ্দিন মাহমুদ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, অনেক আগে থেকেই এরকম নাম সর্বস্ব কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে সরকারি হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে। র্যাবের অভিযানে বিভিন্ন সময় এরূপ শতাধিক ভূয়া ডাক্তার ও প্যাথলজি সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এরকম অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
জেইউ/এএইচ





